ইসলামের ইতিহাসে মদিনার মসজিদে নববী ।। ইতিহাসের পাতা থেকে
মদিনার মসজিদে নববী, যেখানে রয়েছে ইসলামের নবী ও প্রথম খলিফাদের কবর
ছবির উৎস,Getty Image,মদিনার মসজিদে নববী, ১৪৪০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থান
মসজিদে নববী বা মদিনা গ্র্যান্ড মসজিদ মুসলমানদের কাছে দ্বিতীয় পবিত্রতম স্থান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ইসলাম প্রচারের শুরুর দিকে তৎকালীন কেন্দ্র মদিনায় এই মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল। ইসলামের নবী মোহাম্মদ এই মসজিদের প্রথম ইমাম ছিলেন।
আজকের সৌদি আরবের মক্কা থেকে মদিনা-তৎকালীন ইয়াথরিবে হিজরতের পর প্রথম বছরে ইসলামের নবী এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন।
যাকে আরবি ভাষায় আল-মাসজিদ আল-নবাউইজ বলা হয়। এটি মদিনায় নির্মিত দ্বিতীয় মসজিদ।
এর আগে এখানে ক্যুবা মসজিদ ছিল, সাফিউর রাহমান আল-মুবাকারাকফুরি তার, ‘দ্য সিলড নেকটার’ বইতে এমনটা উল্লেখ করেন
এটি এমন এক স্থান যেখানে দশ লাখ বছরের পুরনো ইসলামিক স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে।
ইসলামি ঐতিহ্য অনুসারে মসজিদে নববিতে যে নামাজ আদায় করা হয়, তা আল-মসজিদ-আল-হারাম (কা’বা) ব্যতীত অন্য যেকোনো মসজিদে এক হাজার নামাজ আদায় করার চাইতেও উত্তম।

ইসলামের নবী এবং তাঁর দু’জন ঘনিষ্ঠ সহচরের (আবুবকর ও উমর) সমাধি এখানে রয়েছে। সেই সাথে নবীর অন্যান্য স্ত্রীর বাড়িঘর এবং রওদা (জান্নাতের উদ্যানের ঝর্ণা) অবশেষে মসজিদের ভেতরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শত শত বছর ধরে মসজিদটি সম্প্রসারণের কারণেই তা সম্ভব হয়েছে।
সহীহ আল বুখারীর আবু-হুরায়রার মতে, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমার বাড়ী এবং মিম্বরের মাঝে জান্নাতের বাগানের একটা অংশ আছে”।
প্রায় ১৪ শত বছর আগে অর্থাৎ ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে এই মসজিদটি ইসলামের নবীর বাড়ির কাছে নির্মাণ করা হয়।১,৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কয়েক দফায় নকশা পরিবর্তন ও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে চলে এর নির্মাণ কাজ।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় নির্মাণ কাজটি পরিচালনা করেছিলেন প্রয়াত বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ, যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। চলমান সম্প্রসারণ কাজের মধ্যেই প্রতি বছর লাখ লাখ দর্শনার্থী এবং হজযাত্রী মসজিদটিতে ভিড় করেন।ধারণা করা হয়, পুরো কাজ শেষ হওয়ার পর এই মসজিদে প্রায় ১৮ লাখ মুসল্লি একসাথে নামাজ আদায় করতে পারবেন।

ছবির উৎস,Getty Imagesমসজিদে নববী
ছবির উৎস,Getty Images,মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণে ও পরিচ্ছন্নতার কাজ চলে নিয়মিত
আশেপাশে কী রয়েছে
নবীর মসজিদকে ঘিরে থাকা কয়েকটি বড় ভবন এবং স্থাপনার মধ্যে রয়েছে; ঐতিহাসিক জান্নাতুল বাকের কবরস্থান, যেটা এখন মসজিদের পশ্চিম সীমানার বাইরে আছে। এটি নবীর শত শত উম্মতের বিশ্রামের জায়গা।মসজিদের আশেপাশের অন্যান্য স্থাপনার মধ্যে রয়েছে সৌদি সরকারি সংস্থা, সেই সঙ্গে চিকিৎসা সুবিধা, বিলাসবহুল হোটেল, শপিং মল এবং প্রধান রাস্তা।



রক্ষণাবেক্ষণ
বীর মসজিদ এবং পবিত্র মসজিদ দুটোই জেনারেল প্রেসিডেন্সি এজেন্সি দ্বারা পরিচালিত হয়।
মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কঠোরভাবে রাজপ্রাসাদ থেকে পালন হয়ে থাকে । সৌদি বাদশাহকে দুটি পবিত্র মসজিদের রক্ষক হিসাবে সম্বোধন করা হয়।ইসলামের নবী প্রথম মসজিদ নববিতে ইমামতি করেছিলেন।তাঁর মৃত্যুর পরে, তাঁর সহচর এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ইমামতি করে চলেছেন।স্পষ্টতই নবীর কোন সহকারী ইমাম ছিলেন না, তবুও মাঝে মাঝে তিনি আবুবকরকে (তাঁর নিকটতম সঙ্গী) নামাজে নেতৃত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিতেন।
তবে একদিন আবুবকর যখন নামাজে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তখন নবী মসজিদে প্রবেশ করেন। এরপর আবুবকর পিছু হটে যান এবং আল্লাহর রসূল নামাজে ইমামতি করেন।নবীর মৃত্যুর পরে আবুবকর মদিনার প্রথম খলিফা ও ইমাম হন।সেই সময় থেকে বর্তমান প্রজন্ম পর্যন্ত আরও অনেকে মসজিদে ইমামতি করেছেন।

আল-মোবারকফুরি অনুসারে, মসজিদে নববিতে, ইসলামের নবী মোহাম্মদ দ্বারা নির্ধারিত প্রথম মুয়াজ্জিন ছিলেন বিলাল বিন রাবাহ।আবদুল্লাহি ইবনে জায়েদ একদিন নবীর কাছে তার স্বপ্নের কথা বলেন। তিনি নামাজের জন্য ডাক দেয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
এরপর নবী তাকে বলেন বিলালকে এই শিক্ষা দিতে। কারণ মুয়াজ্জিন হিসাবে আজান পরিবেশন করার জন্য বিলালের কণ্ঠ ছিল বেশ জোরালো।মসজিদে নববির প্রধান মুয়াজ্জিন শেখ আবদুল রহমান খাশোগজির মতে, প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য এখন ১৭ জন মুয়াজ্জিন রয়েছেন।সৌদি গেজেটের বরাত দিয়ে আল-রিয়াদ পত্রিকা থেকে এই তথ্য জানা গেছে।প্রতিদিন তিনজন মুয়াজ্জিন “মুকাব্বাড়িয়াহ” থেকে আজান (নামাজের ডাক) দিয়ে থাকেন।”মুকাব্বাড়িয়াহ” সেই জায়গা যেখান থেকে মুয়াজ্জিনরা আযানের জন্য আওয়াজ তুলে থাকেন এবং তারা ইমামের পরে পুনরায় তাকবীর পাঠ করেন, যাতে জামাতের সবাই সব স্পষ্ট শুনতে পান।


মসজিদের গোড়াপত্তন হয়েছিল কীভাবে
মোবারকফুরির মতে, নবী মদিনায় পৌঁছে সাহল ও সুহাইল নামের দুই এতিমের কাছ থেকে ১০ দিনার দিয়ে এই জমি কিনেছিলেন।
ওই জমিটি খেজুর শুকানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। মদিনায় ওই জমিটির ওপর ইসলামের নবীর উট প্রথম এসে দাঁড়ায়।এই মসজিদের নির্মাণ কাজে ইসলামের নবী নিজে অংশ নিয়েছিলেন। পাথরের ভিত্তির ওপর মাটির দেয়াল তৈরি করা করা হয়। ছাদের কিছু অংশ ঢাকতে তিনি ব্যবহার করেন খেজুর গাছের গুড়ি ও ডাল।
এটি মসজিদ আল আকসার (দক্ষিণ) মুখোমুখি ছিল, যা ছিল তৎকালীন কিবলা এবং এই মসজিদের তিনটি দরজা ছিল।গরিব ও আগন্তুকদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য পিছনের দিকে একটি ছায়া ঘেরা জায়গাও ছিল, যেটির নাম “আল-সাফা”।কিবলা কাবার দিকে পরিবর্তিত হয়ে গেলে এই আশ্রয়স্থলটি পরবর্তীতে উত্তরে সরিয়ে নেওয়া হয়।দক্ষিণ দিকের পিছনের দরজাটি বন্ধ করে দিয়ে এর পরিবর্তে উত্তরে নতুন একটি দরজা প্রতিস্থাপন করা হয়। সহচরেরা যখন নবীকে কাদা দিয়ে ছাদটি লেপন করতে বলেন , তখন নবী তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন: “না, এটি মুসার মতো একটি ট্রেলিস ছাদ হবে (ফাঁক ফোকর-ওয়ালা ছাদ, যার ভেতরে আলো বাতাস প্রবেশ করে)। তিন বছর পর্যন্ত মসজিদের মেঝে কোন কিছু দিয়ে ঢাকা ছিল না।মসজিদটির প্রাথমিক পরিধি ১০৫০ বর্গমিটার হলেও হিজরতের সাত বছর পরে নবীর নির্দেশে সেটা বাড়িয়ে ১৪২৫ বর্গমিটার করা হয়।


সৌন্দর্য
এই ইমারতের প্রায় পুরোটা জুড়ে রয়েছে দুর্দান্ত স্থাপত্য কৌশল, প্রযুক্তি, নির্ভুলতা এবং জাঁকজমক। দূর থেকেও কোন অতিরঞ্জন ছাড়াই এটি দুর্নিবার আবেদনময়।এই মহান মসজিদের ভেতর থেকে শুরু করে বাইরের সৌন্দর্য জুড়ে রয়েছে প্রযুক্তি, স্থাপত্যশৈলী, ব্যবস্থাপনা, দক্ষতা এবং নির্ভুলতার ছাপ।
এর বাইরের প্রাঙ্গণ থেকে ভেতরের অঙ্গন এবং মেঝে থেকে ভবনের ছাদ পর্যন্ত সাজানো হয়েছে অসংখ্য আকর্ষণীয় চোখ ধাঁধানো সব অলঙ্কার দিয়ে – এর আকার ও উচ্চতা, গম্বুজ ও মিনার, উঠোন ও ছাউনি, ছাদ ও সিলিং, আলো ও শব্দ ব্যবস্থা, শীতলীকরণ ও আরামের ব্যবস্থা, দেয়াল ও মেঝে, দরজা ও সিঁড়ি, স্তম্ভ এমনকি গালিচা – মসজিদটির এমন প্রতিটি অনুষঙ্গের মানকে কোন শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করা অন্যায় হতে পারে।
নববীর মসজিদ বিষয়ক মুখপাত্র শেখ আবদুলওয়াহেদ আল-হাত্তাব বলেছেন, মসজিদের ভেতর ও বাইরের অংশের স্তম্ভগুলোতে ২৫০টি স্বয়ংক্রিয় ছাতা স্থাপন করা হয়েছে যেন মুসল্লিদের বৈরি আবহাওয়া এবং বৃষ্টিপাত থেকে রক্ষা করা যায়।
এই কাস্টমাইজড ছাতাগুলোয় নিজস্ব পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি ছাতার মাধ্যমে ৮০০ জনকে ছায়া দেয়া যায় (বৃষ্টি এবং বৈরি আবহাওয়া থেকে)। যা মোট ১৪৩ বর্গমিটার জায়গা ঢেকে রাখতে সক্ষম।
প্রেসিডেন্সি থেকে পাওয়া মসজিদের আর্কিটেকচারাল ম্যাপ অনুযায়ী মসজিদটিতে বর্তমানে ৪১টি গেট রয়েছে।প্রতিটি দরজার উপরে আরবি শিলালিপিসহ একটি প্রস্তর ফলক রয়েছে: “শান্তি ও সুরক্ষার সাথে প্রবেশ করুন”। (সূরা আল-হিজর, ১৫:৪৬)। তবে শেখ আল-হাত্তাবির হিসাব অনুসারে মোট দরজার সংখ্যা ৮৫টি।
কিছু প্রবেশদ্বারে একটি দরজা রয়েছে, আবার কিছু প্রবেশদ্বারে দুটি, তিনটি, এমনকি পাঁচটি দরজা রয়েছে। লিফট সংযুক্ত হওয়ায় নীচতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত যাওয়া যায়।

ছবির উৎস,Googleমসজিদে নববী এবং এর সংলগ্ন ভবনের মানচিত্র
মসজিদের সম্প্রসারণ
হিজরতের প্রথম বছরে ইসলামের নবীর নির্মিত মসজিদটির প্রাথমিক পরিধি ছিল ১০৫০ বর্গমিটার। পবিত্র মসজিদ এবং নবীর মসজিদের সৌদি জেনারেল প্রেসিডেন্সি এ তথ্য জানিয়েছে।জেনারেল প্রেসিডেন্সির মুখপাত্র আল-হাত্তাব, ওকাজ নিউজপেপারকে বলেছেন যে, হিজরতের সাত বছর পরে নবী, খায়বার থেকে ফিরে আসার পরে তার নির্দেশে প্রথমবারের মতো মসজিদটি ১৪২৫ বর্গমিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়।
তাঁর মৃত্যুর কয়েকশ বছর পরে, মসজিদটি বেশ কয়েক দফা পুনর্গঠন, সংস্কার ও সম্প্রসারণের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে।খলিফা উমরের শাসনামল থেকে শুরু করে উসমান পর্যন্ত এরপর উমাইয়া, আব্বাসীয়, অটোম্যান থেকে সৌদি যুগ পর্যন্ত চলেছে এই মসজিদের কাজ।নবীর একটি হাদিসে বলা হয়েছে, এই মসজিদে একবার নামাজ পড়া, মক্কার আল মাসজিদ আল হারাম (কা’বা) ব্যতীত অন্য যে কোনো মসজিদে হাজার বার নামাজ পড়ার চাইতে উত্তম।হজ ও ওমরাহর সময় লাখ লাখ মুসল্লি মসজিদে সমবেত হন।

খলিফা উমর বলেছিলেন, যতদিন এটা তার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যদি এই সম্প্রসারণ সিরিয়া পর্যন্তও বাড়ানো হয় তাতে কোনো ক্ষতি নেই।
‘নবী মুহাম্মদ (সা.) অ্যান্ড আরবানাইজেশন অব মাদিনাহ’ (হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং মদিনা নগরায়ন) শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদনে ড. স্পাহিক ওমর বলেছেন যে, মসজিদটি এখন এর মূল আকারের চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বড় এবং মদিনার প্রাচীন শহরের প্রায় পুরোটা জুড়ে ছড়িয়ে গেছে।
ড. মুহাম্মদ ওয়াজিদ আক্তার তাঁর ‘নাইন থিংগস ইউ ডিডন’ট নো অ্যাবাউট দ্য প্রফেট মস্ক’ (নবীর মসজিদ সম্পর্কে যে ৯টি জিনিস আপনি জানেন না)-এ উদ্ধৃত করেছেন যে, মসজিদের বেষ্টনীটি বর্তমানে মদিনা উপকূলে অবস্থিত বাকি কবরস্থানেরও সীমান্ত বেষ্টনী হিসেবে কাজ করছে, যেটা কিনা একসময় মদিনার আরেক প্রান্তে ছিল। মসজিদটি এখন পুরনো মদিনার ভূমিকে ঢেকে রেখেছে।
নবীর পরে ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে উমরের খিলাফতের সময় প্রথম সম্প্রসারণের কারণ ছিল অতিরিক্ত মানুষের ভিড়। খলিফা উমর পশ্চিম, দক্ষিণ ও উত্তরের পার্শ্ববর্তী জমিগুলো কিনে মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন। পূর্ব অংশে যেখানে নবীর স্ত্রীদের ঘরগুলো ছিল, সেখানে কোনো প্রভাব পড়েনি।
মসজিদটি যখন মুসল্লিদের হিসেবে ছোট হয়ে যায়, তখন খলিফা উমরের উত্তরসূরি উসমানও ২৯ হিজরি অর্থাৎ ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে তার সহচরদের সাথে পরামর্শের ভিত্তিতে মসজিদ সম্প্রসারণ ও উন্নত করেন।
আরব নিউজ অনুসারে উসমানের আমলে খোদাই করা প্লাস্টার দেয়া পাথরের দেয়াল, খোদাই করা পাথরের কলাম এবং সীসার ওপর বসানো লোহার রড এবং সেগুন কাঠের ছাদ ছিল।
মদিনার গভর্নর, ওমর বিন আবদুল আজিজ ৭০৭ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খলিফা, আল-ওয়ালিদ ইবনে আবদুল আল-মালিকের নির্দেশে মসজিদটি পুনর্গঠন ও ৬৪৪০ বর্গমিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করেন।
তিনি চার কোণে চারটি মিনার এবং একটি ফাঁপা মিহরাব নির্মাণ করেন। মসজিদের ভেতরের দেয়ালগুলো মার্বেল, সোনা এবং মোজাইক দিয়ে সাজানো হয়। ভবনে কলামের সংখ্যা বেড়ে ২৩২-এ দাঁড়ায়।

১৬১-১৬৫ হিজরি পর্যন্ত আল-মাহদী (আব্বাসি খলিফা) মসজিদের পরিসর ৮৮৯০ বর্গমিটার পর্যন্ত বাড়ান। ৬০টি জানালা এবং ২৪টি দরজা যুক্ত করেন। ৬৫৪ হিজরিতে (১২৫৭ খ্রিষ্টাব্দ ) মসজিদে অগ্নিসংযোগের পরে খলিফা আল-মু’তাসিম এটি পুনর্নির্মাণে সক্রিয় হন, তবে তাতার বাহিনী সে সময় বাগদাদ আক্রমণ করার কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। ৬৫৬ হিজরিতে তাদের পতন ঘটে।
মসজিদের সংস্কারটি মামালিক যুগে করা হয়েছিল। সে সময় পিতলের কাজ করা কাঠের চারটি প্রধান দরজা ছাড়া বেশিরভাগ দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়।
সুলতান সুলেমান গম্বুজটি মেরামত করেন এবং ৯৭৪ হিজরিতে ওই গম্বুজের উপরে নতুন অর্ধচন্দ্র স্থাপন করেন। তিনি গম্বুজ এবং মিনারগুলো থেকে মামালিক চাঁদগুলো প্রতিস্থাপন করে, তামার ওপর সোনার আস্তর দেওয়া অর্ধচন্দ্র স্থাপন করেন।
১২২৮ হিজরিতে দ্বিতীয় সুলতান মেহমুদের আমলে গম্বুজটি সবুজ রঙে রাঙানো হয়। এ কারণে এটি গ্রিন ডোম নামে পরিচিত।
১২৭৭ হিজরিতে মসজিদ ফাটল দেখা দিলে সুলতান আবদুল মাজিদ খান এটি পুনর্নির্মাণ শুরু করেন এবং ১০,৩০৩ বর্গ মিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করেন। পাঁচটি দরজা যুক্ত করা হয়, প্রাচীরটি ১১ মিটার পর্যন্ত বাড়ানো হয়, গম্বুজের সংখ্যা বেড়ে ১৭০টি হয়। এছাড়া ৬০০ টি তেল প্রদীপও যুক্ত করা হয়।
আলজাজিরার ‘গেট টু নো দ্য প্রফেটস মস্ক’ (নবীর মসজিদ সম্পর্কে জানুন) প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।১৩২৭ হিজরিতে (১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ) আরব উপদ্বীপে এই মসজিদটি ছিল প্রথম স্থান যেখানে বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়। সুলতান ঘালিব আল কোয়ায়তি তার ‘দ্য হোলি সিটিজ, দ্য পিলগ্রিমেজ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড অব ইসলাম’ (পবিত্র শহর, তীর্থযাত্রা এবং ইসলামের বিশ্ব’) শীর্ষক বইয়ে এই তথ্য দিয়েছেন।
সৌদি যুগে এসে বাদশাহ আবদুল আজিজ আল সৌদ ১৯৫০ সালে মসজিদটি ১৬ হাজার ৩২৭ বর্গমিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করেন। যেখানে ছিল ৭০৬টি স্তম্ভ এবং ১৭০টি গম্বুজ।

নবীর মিম্বর
মদিনার গ্র্যান্ড মসজিদের সবচেয়ে মূল্যবান স্থানগুলোর একটি হলো, নবীর মিম্বর যেখানে তিনি তাঁর সহচরদের খুতবা শোনাতেন।
আল-মুবারকফুরির মতে, মসজিদের প্রথম মিম্বারটি নির্মাণ করা হয়েছিল খেজুর গাছ দিয়ে, এবং তখন তিন ধাপের সিঁড়ি ছিল।
মুসলমানদের নেতৃত্বদানকারী সঠিক পথনির্দেশক খলিফারাও তাদের খুতবা দেওয়ার জন্য মিম্বরটি ব্যবহার করতেন।আবুবকর ও উমর-এর খেলাফতের সময় তারা দুজন মিম্বরের দ্বিতীয় ধাপ থেকে তাদের খুতবা প্রদান করতেন।
উসমান সিঁড়ির প্রথম ধাপ থেকে তাঁর খুতবা প্রদান করতেন, পরে তিনি নবীর মতই তৃতীয় ধাপে অর্থাৎ সবচেয়ে উঁচু ধাপে খুতবা দেওয়া শুরু করেন।তবে ৮৮৬ হিজরিতে মসজিদে ছড়িয়ে পড়া অগ্নিকাণ্ডের কারণে নবীর মিম্বারটি ধ্বংস হয়ে যায়।
এর ফলস্বরূপ শহরের লোকেরা একটি ইটের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে এবং তারপরে মামলুক সুলতান কাইতবে একটি সাদা মার্বেলের প্ল্যাটফর্ম পাঠান।

মিহরাব
মিহরাব হল সেই জায়গা, যেখান থেকে ইমাম মুসুল্লিদের নামাজের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন।নববী মসজিদে দুটি মিহরাব রয়েছে। প্রথম মিহরাব, মসজিদের মূল ভবনের এমন এক জায়গায় যেখান থেকে ইসলামের নবী নামাজের নেতৃত্ব দিতেন।এই মিহরাব নবীর মিম্বরের কাছে অবস্থিত যা বর্তমানে আযান দেয়ার স্থান মুকাব্বাড়িয়ার সাথেই রয়েছে। নবীর মিহরাব পুরো জায়গা জুড়ে রয়েছে। নবী সাধারণত যেদিকে তাঁর পা রাখতেন, সেখান থেকে নামাজের ইমামতি করতেন।
মসজিদের এক কর্মকর্তা আল-আরাবিয়াকে বলেছেন, দ্বিতীয় মিহরাবটি হল উসমানী মিহরাব, যা এখনও ইমামগণ ব্যবহার করছেন।
মসজিদটির সম্প্রসারণের সময় উসমানী খেলাফত এটা নির্মাণ করেছিল। ওইবারই সর্বশেষে উত্তর প্রান্ত থেকে মসজিদটি সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। তৃতীয় মিহরাবকে সুলায়মানি বা আহনাফ মিহরাব বলা হয়, যা সুলতান সুলাইমানের নির্দেশে নির্মাণ করা হয়েছিল। তিনি হানাফি ইমাম হিসেবে নামাজের নেতৃত্ব দিতেন, যেখানে মালেকী ইমাম নবীর মিহরাব থেকে নামাজের নেতৃত্ব দেন।

আল-রওদা
নবীর মিম্বর ও তাঁর বাড়ির মাঝামাঝি একটি জায়গা রয়েছে।আবু-হুরায়রা থেকে বর্ণিত আল বুখারীর হাদিস ইসলামের নবী মুহাম্মদ বলেছেন: “আমার ঘর এবং মিম্বরের মাঝখানে রয়েছে জান্নাতের বাগানের একটি অংশ।”
রওদা নারী ও পুরুষ দর্শনার্থীদের জন্য সবসময় খোলা থাকে তবে সেটা পৃথক সময়ে যাতে পদদলিত হওয়ার ঘটনা এড়ানো যায়।দর্শনার্থীরা সাধারণত নবীর সমাধিতে সালাম বলে যাওয়ার আগে রওদায় নফল নামাজ আদায় করেন।
নববী মসজিদটির সম্প্রসারণ ও উন্নত হওয়ার সাথে সাথে রওদা এলাকাটি গালিচা থেকে শুরু করে নানা অলংকার সামগ্রী দিয়ে সাজানো হয়।পবিত্র মসজিদ এবং নববী মসজিদের সৌদি জেনারেল প্রেসিডেন্সি, রওদার পরিধি ৩৩০ বর্গমিটার রেখেছিল, দৈর্ঘ্য ছিল ২২ মিটার এবং প্রস্থ ১৫ মিটার।এ অঞ্চলে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন চলাচল নিশ্চিত করতে সব সময় নিরাপত্তা বাহিনী নিয়োজিত রাখা হয়। অন্যান্য কর্মীদের রাখা হয় সবকিছু শৃঙ্খলায় রাখতে।
সবুজ গম্বুজ
সবুজ গম্বুজটি নবীর মসজিদের অন্যতম প্রসিদ্ধ সৌধ। ইসলামের নবী সেইসঙ্গে আবুবকর ও উমরের কবরের ওপর নির্মিত প্রকোষ্ঠের ওপর এই গম্বুজটি নির্মাণ করা হয়।’ওয়াফা আল-ওয়াফা’-তে আল সামহুদি বলেছেন যে প্রথম গম্বুজটি নবীর কবরের উপর ৬৫০ বছরেরও বেশি সময় পরে নির্মিত হয়েছিল, এর মধ্যে প্রথমটি ১২৭৯ সালে (৬৭৮ হিজরি) কাঠ দিয়ে তৈরি করেছিলেন সুলতান কালাওয়ুন।
ভেতরেও একটি গম্বুজ রয়েছে যা অনেক ছোট এবং সেখানে নবী, আবু বকর এবং উমরের নাম খোদাই করে লেখা আছে।
একে নীচ থেকে একটি বর্গক্ষেত্র মনে হলেও ওপর থেকে অষ্টভুজ দেখায়। একাধিকবার আগুন লাগার পর এটি সংস্কার করা হয় এবং অটোম্যান সুলতান গাজী মাহমুদ এটি পুনর্নির্মাণ করেছিলেন, “জাজিরা এনসাইক্লোপিডিয়া অনুসারে।

গ্রন্থাগার
মসজিদের জেনারেল প্রেসিডেন্সি বলেছে, ১৩২২ হিজরিতে মদিনায় আওকাফ, তৎকালীন ওবায়েদ মাদানির পরিচালকের পরামর্শে গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পাঠাগারটিতে পাঠকক্ষের পাশাপাশি অডিও গ্রন্থাগার বিভাগ (সেকশন ১৭) রয়েছে। যেন নবীর মসজিদের পাঠ, খুতবা ও দোয়া সংরক্ষণ করা যায়। কারিগরি বিভাগ (২২ নম্বর দরজায় অবস্থান) পাণ্ডুলিপিগুলির বাঁধাই, পুনরুদ্ধার এবং সংরক্ষণের কাজ করে থাকে।
বিরল বই বিভাগ, লাইব্রেরিতে থাকা বিরল বইগুলো মুদ্রণের তারিখ, সাজসজ্জা, আকার, ছবি ইত্যাদির হিসেবে সংরক্ষণ করে থাকে।
অন্যান্য বিভাগগুলোর মধ্যে পাণ্ডুলিপি বিভাগ, ডিজিটাল গ্রন্থাগার, গবেষণা ও অনুবাদ, সুরক্ষা এবং নিরাপত্তা বিভাগ, উপহার এবং বিনিময় বিভাগ এবং প্রচার বিভাগ রয়েছে।গ্রন্থাগারটিতে পুরুষ, নারী এবং শিশুদের জন্য যে পাঠকক্ষ রয়েছে সেটার অবস্থান বর্তমানে মসজিদের ভেতরে।
বিশ্বের বৃহত্তম মসজিদগুলোর মধ্যে একটি আল-মসজিদ আল-নববী অপূর্ব নকশায় এবং যথাযথ প্রযুক্তিতে সজ্জিত, এটির চলমান পুনর্নির্মাণ, সম্প্রসারণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনে শত শত কোটি সৌদি রিয়াল খরচ হচ্ছে।
প্রতিবছর লাখ লাখ মুসলমান হজযাত্রী এবং দর্শনার্থীদের নিয়মিত সফরের জন্য, বিশেষত রমজান এবং হজের সময়ে, সৌদি বাদশাহ এই মসজিদকে আরও আরামদায়ক এবং আকর্ষণীয় করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। এই রক্ষণাবেক্ষণ সৌদি প্রাসাদ থেকেই তদারকি করা হয়।
এই মসজিদ দর্শন কোন হজ বা ওমরাহ পালনের অংশ নাও হতে পারে, তবে বেশিরভাগ হজযাত্রী নবীর সমাধিতে সালাম জানাতে এবং মসজিদটির অনুভূতি নিতে এর ভেতরে যেতে না পারলে সন্তুষ্ট হতে পারেন না, মদিনায় এটাই সবচেয়ে বড় আকর্ষণ বলে মনে করা হয়।

তথ্যসূত্র বিবিসি বাংলা, ক্রেডিট : লেখা: সগীর সালেহ, প্রযোজক: হালিমা উমর,প্রস্তুত করেছে: এনকেচি ওগবোন্না,ছবি এবং ভিডিও: গেটি, বিবিসি, মসজিদ হারাম