কালজয়ী বাংলা গান: ভাগ্যবিড়ম্বিত শিল্পী
ড. মুন্সি আবু সাইফ


ছবি: লেখক ড. মুন্সি আবু সাইফ
১৯৪০ দশকে বাংলা গানের যে উন্মেষপর্ব সূচিত হয়েছিল তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ এর দশক বাংলা গানের স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে রইলো। নানা বাঁকবদলের মধ্য দিয়ে বাংলা গান আজ পত্র-পল্লবে বিস্তৃত। বাংলা গানের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যে সমস্ত শ্রদ্ধেয় কণ্ঠশিল্পী অপরিসীম অবদান রেখেছেন অথচ মূল্যায়ন সেভাবে তাঁরা পাননি। কিন্তু মহাকাল তাঁদের মনে রাখবেই। পশ্চিমবঙ্গের সেই সমস্ত মেঘে ঢাকা তারা অর্থাৎ মূল্যায়নবঞ্চিত কালজয়ী শিল্পীদের নিয়ে আজকে আমার দ্বিতীয় পর্বের আলোচনা।
সুধীরলাল চক্রবর্তী: (১৯১৬-১৯৫২/৫৩) বাংলা গানের কিংবদন্তি প্রতিভা। অকালপ্রয়াত (১৯৫২/৫৩) এই মহীরূহ সঙ্গীতজ্ঞের সুরারোপিত গানগুলো পঞ্চাশের দশকে বাংলা সঙ্গীতে বিপ্লব সাধন করেছিল। তাঁর গাওয়া-
(ক) মধুর আমার মায়ের হাসি চাঁদের মুখে ঝরে, মাকে মনে পড়ে আমার মাকে মনে পড়ে।
(খ) খেলাঘর মোর ভেঙে গেছে হায় নয়নেরও যমুনায়
এই গান দুটি মহান শিল্পীকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। আপনি বিস্মিত হবেন যে, তাঁর গাওয়া এমন আরো অসাধারণ কিছু গান আছে যেগুলো সম্পর্কে আজকের শ্রোতারা তেমন কিছুই জানেন না। যেমন: “আঁখি তার ভোলো যদি মন কেন ভোলে না” গানটি আজকের যেকোনো জাত রকস্টারকেও বিস্মিত করে।
সত্যরঞ্জন চৌধুরী: (১৯১৮-১৯৯৩) যিনি বাংলা সঙ্গীতজগতে সত্য চৌধুরী নামে সমধিক পরিচিত। তাঁর গাওয়া “পৃথিবী আমারে চায়, রেখ না বেঁধে আমায়” গানটি তাঁকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। কিন্তু তাঁর গাওয়া এমন অনেক গান আছে যেগুলো সম্পর্কে আজকের শ্রোতামহল তেমন অবগত নন। তিনি রবীন্দ্র এবং নজরুল সংগীতেও অসাধারণ পারদর্শী শিল্পী। গণসংগীত ছাড়াও তিনি আরো অনেক রোমান্টিক গানেরও কন্ঠদাতা। বিস্ময়ের ব্যাপার, তাঁর “পৃথিবী আমারে চাই” গানটি অধিক রিমেকের ফলে মূলশিল্পী সত্য চৌধুরী আজ শ্রোতাদের থেকে নির্বাসিত প্রায়।
গৌরীকেদার ভট্টচার্য: (১৯১৬-১৯৮৩) অপরিমেয় প্রতিভা নিয়ে এসেছিলেন। তাঁর গাওয়া -“এনেছি আমার শত জনমের প্রেম আঁখি জলে গাঁথা মালা।” গানটি তাঁকে খ্যাতির মধ্যগগনে আসীন করেছিল। পরিতাপের বিষয়, এই শিল্পীর গাওয়া আরো বেশ কিছু জনপ্রিয় গান রয়েছে। কিন্তু এই একটি গানই গৌরীবাবুকে অনন্ত অমরত্ব দান করেছে। জনপ্রিয় গানগুলো যখন তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তিনি সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন। চিরদিনের জন্য লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান- নিরুদ্দেশ হয়ে যান। আমৃত্যু এই শিল্পীর আর কোনো খোঁজ-খবর পাওয়া যায়নি।
অপরেশ লাহিড়ী: (১৯২৪-১৯৯৮) পঞ্চাশের দশকের একজন অসাধারণ শিল্পী ছিলেন। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত সংগীত পরিচালক ও গায়ক বাপ্পি লাহিড়ির পিতা। তাঁর গাওয়া “সামনে পিছে, ডাইনে-বামে
চলতি বাসে কিংবা ট্রামে, লাইন লাগাও”- এই গানটি অনন্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। শিল্পীর আরো অনেক জনপ্রিয় গান রয়েছে কিন্তু উল্লিখিত গানটি শ্রোতামহলে তাঁকে অমরত্ব দান করেছে।
রবিন মজুমদার: (১৯১৯-১৯৮৩) চল্লিশ ও পঞ্চাশের সুদর্শন গায়ক- নায়ক। এতো গুণীশিল্পী উপমহাদেশের সংগীত জগতে আর আবির্ভূত হয়নি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, তাঁর গাওয়া:
(ক) এই কি গো শেষ দান, বিরহ দিয়ে গেলে।
(খ) আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাই বা জ্বলে।
গান দুটি তাঁর অন্যন্য জনপ্রিয়তা দান করে, ফলে এই শিল্পীর প্রায় দুই শতাধিক গান কিছুটা নিরুত্তাপ হয়ে যায়।
বেচু দত্ত: একজন অসাধারণ শিল্পী। নজরুল সংগীত, গণসংগীত এবং আধুনিক বাংলা গানে তাঁর কালজয়ী কণ্ঠ আজও দর্শনশ্রোতাকে বিমোহিত করে। তাঁর গাওয়া- “মন বলে কাছে এসো আঁখি বলে কত দূরে” একটি কালজয়ী গান। তবে “এই কারখানা চলে” গণসংগীতটি একসময় শ্রম-অধিকার আদায়ে সিগনেচার টিউনের মতো অনুরণন তুলেছিল। বেচু দত্তের নামে কলকাতার উল্টোডাঙ্গায় (বিধান নগর) একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে।
শৈলেন মুখোপাধ্যায়: (১৯২৮-১৯৭৮) একজন সুরকার, অভিনেতা এবং অসাধারণ সঙ্গীত শিল্পী। অসাধারণ কিছু গানের কন্ঠদাতা তিনি। পঞ্চাশের দশকের বাঘা বাঘা শিল্পীরা তাঁর সুরারোপিত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তবে তাঁর গাওয়া:
(ক) এতো যে সোনায় গান, তবু মনে হয়, যে গান শোনাতে চাই হয়নি গাওয়া
(খ) দাড় ছব ছপ তরী বেয়ে চলেছি
গান দুটি বাংলা সংগীতে ল্যান্ডমার্ক হিসাবে পরিগণিত হয়ে থাকবে।
বিশ্বজিৎ চট্টোপাধ্যায়: (১৯৩৬-)বাঙালি নায়ক-গায়ক। তিনি সর্বভারতীয় রোমান্টিক নায়ক হিসাবে অত্যধিক পরিচিত। তিনি চমৎকার গায়ক ছিলেন। তাঁর গাওয়া:
(ক) তোমার চোখের কাজলে আমার ভালোবাসার কথা লেখা থাকবে
(খ) যায় যায় দিন, বসে বসে দিন
গান দুটি তাঁর বহুমুখী প্রতিভার পরিচায়ক।
মৃণাল মুখোপাধ্যায়: (১৯৪৪/৪৫-২০১৯) একজন অসাধারণ অভিনেতা। তপন সিনহা পরিচালিত ‘এখনই’ সিনেমার
“বন্ধু তোমার আসার আসাতে রাত হলো ভোর প্রভাতে, তবু বন্ধুর দেখা হলো না” এই গানটি সম্পর্কে আমার মায়ের কাছে শুনেছিলাম, ১৯৭১ সালে গাওয়া এই গানটি তৎকালীন প্রতিটি তরুণের মুখে মুখে গীত হয়ে থাকতো। মৃণাল বাবু, বর্তমান প্রজন্মের অত্যন্ত জনপ্রিয় গায়িকা জোজোর পিতা।
গোরাচাঁদ মুখোপাধ্যায়: প্রতিনিধিত্বশীল একজন গায়ক। অনেক চমৎকার গানের কন্ঠদাতা তিনি। তবে তাঁর গাওয়া
(ক) একটু আগে তোমাকে ভাবছিলাম
(খ) তুমি যদি সাথী হতে
এই গান দুটি গগনচুম্বী জনপ্রিয় হয়েছিল। যোগ্য সম্মান বঞ্চিত হয়ে তিনি অনেক অভিমানে বাংলা সঙ্গীতজগত
থেকে স্বেচ্ছায় নির্বাসিত হয়েছিলেন।
সুদাম বন্দ্যোপাধ্যায়: অত্যন্ত প্রতিভাবান একজন শিল্পী। বাংলা গানে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর গাওয়া
(ক) আমার বসন্তের পথ চাওয়া
(খ) তুমি ডাকবে কি ডাকবে না
এই দুটি গান তাকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছে দেয়।
সম্মানবঞ্চিত এই শিল্পী অনেক অভিমানে বাংলা সঙ্গীত জগত থেকে দূরে চলে যান।
সুধীন সরকার: মনে রাখার মতো কণ্ঠ তাঁর।
“পাইনের ছায়া মাখা আঁকাবাকা পথ ধরে” এই গানটি তাঁর পরিচয়ে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে।
তিনি সঙ্গীত পরিচালক জয় সরকারের পিতা এবং লোপামুদ্রা মিত্রের শ্বশুর মহাশয়।
অমৃক সিং অরোরা: (১৯৪৩-) কালজয়ী প্রতিভা নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর গাওয়া: “রূপসী দোহাই তোমার, তোমার ওই চোখের পাতায় আমাকে কাজল লতার কালি কর।”
এই গানটি তাঁর সঙ্গীত জীবনে মাইলস্টোন হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকবে। গানটি যখন উপমহাদেশের তারুণ্যের পালে নতুন হাওয়া বইয়ে দিচ্ছে, ঠিক তখনই এই শিল্পী ভক্তিতে মুক্তির পথ অন্বেষণে চলে গেলেন।
অমল মুখোপাধ্যায়: তিনি ছিলেন বিখ্যাত সংগীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ভাই। তাঁর গাওয়া বেশ কিছু শিশুতোষ গান অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল
সুপ্রকাশ চাকী: প্রতিভাবান শিল্পী ছিলেন। তাঁর গাওয়া অনেক জনপ্রিয় গান এখনো দর্শক শ্রোতাকে বিমোহিত করে। এক অজানা অভিমান থেকেই তিনি বাংলা সঙ্গীত জগত থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।
মাধুরী সেনগুপ্ত: চল্লিশের দশকের বাংলা গানে অনেক সম্ভাবনাময় কন্ঠ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন তিনি।
তাঁর গাওয়া এবং হিমাংশু দত্ত সুরারোপিত “তোমারি পথপানে চাহি”- এই গানটি এতোই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, গানটির মূলসুর অপরিবর্তিত রেখে, সামান্য লিরিক্স পরিবর্তন করে, অনেক শিল্পীর কণ্ঠে গানটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল।
সাবিত্রী ঘোষ: পঞ্চাশের দশকের এক স্মরণীয় নাম। তার গাওয়া -“কাঙালের অশ্রু যে ভগবান ও ভগবান, রক্ত ঝরে দেখেও তুমি দেখো না”- এই গানটি অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। যার ফলে, তাঁর গাওয়া অনন্য লিরিক্স সমৃদ্ধ চমৎকার কিছু গান শ্রোতাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে।
মাধুরী চট্টোপাধ্যায়: স্বর্ণযুগের গানে অত্যন্ত মায়াময় কন্ঠ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাঁর কন্ঠের কারুকাজ ও কণ্ঠমাধুর্য সমসাময়িক বাঙালি শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল। তাঁর গাওয়া “ওই যে সবুজ বনবীথিকা” এই গানটি এতোটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল যে, পরবর্তীতে তাঁর গাওয়া বিখ্যাত অনেক গানের জনপ্রিয়তার কিছুটা হ্রাস পায়।
আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়: (১৯৩৪-২০০৯) “ও আমার ছোট্ট পাখি চন্দনা”।
“মন বলছে আজ সন্ধ্যায় কিছু বলতে, তুমি আসবে কি?”- এ সব গান কি কোনো দিনই পুরনো হতে পারে?
স্বামী-সন্তান ও সংসার নিয়ে কালজয়ী শিল্পী একদিন অন্তরালে চলে যান। বাংলা গান হারায় এক মেলোডিয়াস কণ্ঠ। আমৃত্যু তিনি
সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের অত্যন্ত কাছের বান্ধবী হিসেবেই ছিলেন।
ইলা বসু: (১৯৩৬-১৯৯১) বাংলা সংগীতের এক অনন্য কণ্ঠের দাবিদার। তাঁর গাওয়া “কত রাজপথ জনপদ ঘুরেছি, মরুভূমি সাগরের কিনারায়”- গানটি বাংলা সঙ্গীতের স্থানী সম্পদ। এমন কালজয়ী শিল্পী আজ বিস্মৃতপ্রায়।
বিদুষী শিপ্রা বসু: (১৯৪৫-২০০৮) ক্লাসিক এবং সেমি ক্লাসিক বাংলা গানে যার ঈর্ষণীয় অবদান সর্বজনবিদিত। তবে তাঁর গাওয়া:
“মনেরও দুয়ার খুলে কে গো তুমি এলে বলোনা”।
এই গানটি এতটাই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল যে, পরবর্তীতে তার গাওয়া অসংখ্য গানের জনপ্রিয়তা ঐ একটি গানই ম্লান করে দিয়েছে।
চন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায়: বিস্মৃতপ্রায় এক শিল্পী। “সেই শান্ত ছায়ায় ঘেরা কৃষ্ণকলির দিনগুলো যদি থাকতো”- এমন নস্টালজিক গান কয়েক শতাব্দীতে এক আধটা গাওয়া হয়ে থাকে।
সুমন কল্যাণপুর: (১৯৩৭-) একজন সর্বভারতীয় শিল্পী হিসেবে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বিবেচিত হয়ে থাকেন। লতা মঙ্গেসকার এবং মোহাম্মদ রফির মধ্যে তিনটি বছরের যে Dark year রয়েছে ঠিক সেই সময় মোহাম্মদ রফির সাথে তাঁর গাওয়া দেড়শর বেশি হিন্দি গান সুপার ডুপার হিট হয়েছিল। আপনি বিস্মিত হবেন যে, এই শিল্পী অনেকগুলো বিশ্বমানের বাংলা গান রয়েছে। তাঁর সব বাংলা গানকে অতিক্রম করে যে গানটি বাংলা সংগীতের স্থায়ী সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে সে গানটি হচ্ছে “মনে করো আমি নেই, বসন্ত এসে গেছে।”
শ্রাবন্তী মজুমদার: অত্যন্ত আবেদনময়ী কন্ঠ নিয়ে বাংলা গানের জগতে এসেছিলেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে গাওয়া “আয় খুকু আয়” এবং গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এঁর সঙ্গে গাওয়া “তুমি আমার মেয়ে”- এই গান দুটি আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। তাছাড়া তাঁর গাওয়া –
(ক)মধুপুরের পাশের বাড়িতে তুমি থাকতে
(খ) নেশার কাজল চোখে দিয়েছি
গান দুটি তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায়।
কলেবর বিবেচনায় আমাকে এখানেই থামতে হচ্ছে।
সুজাতা সরকার, বাসবী নন্দী ও ললিতা ধর চৌধুরী, শক্তি ঠাকুর, মলয় মুখোপাধ্যায়, প্রবীর কুমার, মিনা মুখোপাধ্যায়- আপনাদের প্রতি রইলো অপরিসীম শ্রদ্ধা-ভালোবাসা।
* আমি গানের গ জানিনে। ওয়াশ রুমেও গান গাওয়ার দুঃসাহস আমার নেই। তবে, সঙ্গীতপাগল মানুষ আমি। প্লেটোর একটি কথা আমার ভালো লাগে “সঙ্গীত মানুষের আত্মিক পরিশুদ্ধি দান করে।” আত্মিক উৎকর্ষ সাধনে আমি এই সব হারিয়ে যাওয়া শিল্পীদের গানগুলো শুনবার চেষ্টা করি। বাংলা গানে তাঁদের অনবদ্য অবদানকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।
(নিবন্ধটি সম্পূর্ণ আমার স্মৃতি থেকে লেখা। ভুল-ত্রুটি থাকলে মার্জনা করবেন, সংযোজন করবেন। আমি সমৃদ্ধ হবো। থাকবো আপনার প্রতি কৃতজ্ঞ)।
বাংলা গানে অবিস্মরণীয় বংশপরম্পরা ২ পর্ব
বিশ্ব সংগীতের সমৃদ্ধ ধারায়, বাংলা সংগীতের অবস্থানকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই হাজার বছরের পথচলায় বাংলা গানের ব্যাপ্তি আজ বিশ্বজনবিদিত। বাংলা গানের এই সমৃদ্ধি অর্জনে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, তেমনি বিভিন্ন শিল্পীর বংশপরম্পরা রেখেছে অবিস্মরণীয় অবদান।
এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে আমি, দুই বাংলার কিছু দিকপাল সংগীত শিল্পী ও তাঁদের উত্তরাধিকার-অবদান নিয়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে আলোচনা করবো। আজকের আলোচনা পশ্চিমবঙ্গ কেন্দ্রিক। দ্বিতীয় পর্বে আমি বাংলাদেশের শিল্পীদের বংশপরম্পরা আলোচনা করবো।
১. রবিন মজুমদার- প্রখ্যাত নায়ক-গায়ক ছিলেন। তাঁর দিদি গৌরী ঘোষ, বিখ্যাত বাচিক শিল্পী।
২. হেমন্ত মুখোপাধ্যায়- এঁর স্ত্রী বেলা মুখোপাধ্যায় বেশ কিছু গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তাঁদের কন্যা শিল্পী রাণু মুখোপাধ্যায়- “পুশি ক্যাট পুশি ক্যাট” গানে তিনি উপমহাদেশে বিখ্যাত। হেমন্তের ভাই, অমল মুখোপাধ্যায়- আধুনিক বাংলা গানের একজন চমৎকার শিল্পী ছিলেন।
৩. শিল্পী অপরেশ লাহিড়ীর সুযোগ্য পুত্র, বাপ্পি লাহিড়ী-
উপমহাদেশের আধুনিক সংগীতের একজন দিকপাল।
বাপ্পি লাহিড়ীর শ্যালিকা চন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায় একজন সর্বভারতীয় গায়িকা ।
৪. শচীন দেব বর্মণের স্ত্রী মিরা দেব বর্মণ ছিলেন একজন অসাধারণ গায়িকা। এই দম্পতির বিখ্যাত পুত্র সন্তান, রাহুল দেব বর্মণ- বিখ্যাত গায়ক ও কম্পোজার
৫. শ্যামল মিত্র- এঁর ছোটো ভাই শৈলেন মিত্র, অনেক জনপ্রিয় গানের শিল্পী। শ্যামল মিত্রের পুত্র, সৈকত মিত্র বাবার সুযোগ্য উত্তরাধিকারী।
৬. মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়- এঁর কন্যা মানসী মুখোপাধ্যায়- এ প্রজন্মের একজন ঋদ্ধ শিল্পী।
৭. কৃষ্ণচন্দ্র দে (কানা কেষ্ট) মহান সংগীত সাধকের প্রাণপ্রিয় ও কিংবদন্তি ভাইপো, মান্না দে। আবার, মান্না দে’র ভাইপো সুদেব দে।
৮. সলিল চৌধুরী- উপমহাদেশ-সংগীতের একটি প্রতিষ্ঠান। সলিল চৌধুরীর স্ত্রী সবিতা চৌধুরী ছিলেন
অসাধারণ গায়িকা। তাঁদের স্বনামধন্য কন্যা, গায়িকা অন্তরা চৌধুরী।
৯. গীতশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিখ্যাত গীতিকার ও সুরকার সুধীন দাশগুপ্তের স্ত্রী।
১০. ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য- এঁর ভাই ছিলেন, অকালপ্রয়াত, বিখ্যাত ভক্তিগীতি শিল্পী পান্নালাল ভট্টাচার্য।
১১. কিশোর কুমার-এঁর স্ত্রী রুমা গুহঠাকুরতা এবং ভাই ভাই অশোক কুমার ছিলেন বিখ্যাত নায়ক ও গায়ক।
কিশোর-পুত্র অমিত কুমার, তাঁর বাবার নামের প্রতি যথেষ্ট সুবিচার করে চলেছেন।
১২. সতীনাথ মুখোপাধ্যায় ও উৎপলা সেন ছিলেন স্বামী-স্ত্রী।
১৪. শিবাজি চট্টোপাধ্যায় ও অরুন্ধতী হোম চৌধুরী স্বামী-স্ত্রী।
১৫. নচিকেতা ঘোষ- ছিলেন ডাক্তার। সংগীতকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রখ্যাত এই সুরকারের কিংবদন্তি পুত্র, সুপর্ণকান্তি ঘোষ- “কফি হাউসের সেই আড্ডা” গানের সুরকার।
১৬. কুমার শানু-এঁর পিতা পশুপতি ভট্টাচার্য, একজন শিল্পী ও সুরকার।
১৭. গায়িকা জোজো- এঁর পিতা বিখ্যাত অভিনেতা ও সংগীত শিল্পী মৃণাল মুখোপাধ্যায়।
১৮. সুধীন সরকার- এঁর সুযোগ্য পুত্র, সুরকার জয় সরকার। বিখ্যাত গায়িকা লোপামুদ্রা মিত্র হচ্ছেন, জয় সরকারের স্ত্রী।
১৯. শক্তি ঠাকুর- প্রখ্যাত অভিনেতা ও সংগীত শিল্পী।
তাঁর কন্যা মোনালী ঠাকুর- সংগীতে আজ উপমহাদেশ কাঁপাচ্ছেন।
২০. অংশুমান রায়-বিখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী। তাঁর পুত্র, ভাস্কর রায়- বাবার যোগ্য আসন নিতে পেরেছেন।
২১. সুমিতা সেন- বিখ্যাত রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী। তাঁর সুযোগ্য কন্যাদ্বয়, ইন্দ্রানী সেন ও শ্রাবণী সেন।
২২. অখিল বন্ধু ঘোষের স্ত্রী রূপালি ঘোষ। অখিল বাবুর গাওয়া কয়েকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গানের গীতিকার ও সুরস্রষ্টা রূপালি ঘোষ।
★ একসময় সারাদিনই ‘আকাশ বাণী’র অনুষ্ঠান শুনতাম। তথ্য সংগ্রহে রাখা, আমার প্রিয় সখ। সেই অতীত স্মৃতি থেকে এই প্রথম পর্বের লেখা। হয়তো আরো অনেক নাম আসতে পারে, কিন্তু আমি আনতে পারিনি। এটা আমার সীমাবদ্ধতা নয়- অজ্ঞতা। শুভানুধ্যায়ী, আপনাদের মূল্যবান সংযোজনে আমি সমৃদ্ধ হবো।