বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই স্মৃতি জাদুঘর আজ নিশ্চিহ্ন ।। ১৯৭১-২০২৫ ইতিহাসের পাতা থেকে
বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরঢাকা শহরের ধানমন্ডিতে অবস্থিত শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি সংরক্ষণার্থে স্থাপিত একটি জাদুঘর ছিল।২০২৪ সালে সংঘটিত ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সহিংসতায় এটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ২০২৫ সালে এটি ভেঙে ফেলা হয়।
ঢাকার ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় ৩২ নম্বর রোডের বাড়িতে শেখ মুজিব স্বাধীনতাপূর্ব কাল থেকেই বসবাস করতেন। ১৯৫৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী থাকাকালীন তার একান্ত সচিব নূরুজ্জামান বেগম মুজিবের অনুরোধে ধানমন্ডি এলাকার জমির জন্য গণপূর্ত বিভাগে আবেদনপত্র জমা দেন।
১৯৫৭ সালে ছয় হাজার টাকায় ধানমন্ডিতে এক বিঘা জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে প্রথমে এখানে দুই কক্ষবিশিষ্ট একতলা বাড়ি ও পরে দোতলা করা হয়। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিবার-পরিজন নিয়ে নির্মাণাধীন এই বাড়িতে ওঠেন। তখন একতলা বাড়িটিতে মাত্র দু’টি শয়নকক্ষ ছিল, যার একটি কক্ষে বঙ্গবন্ধু দম্পতি থাকতেন।
১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় তলার নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত নিচতলার এই কক্ষেই বঙ্গবন্ধু দম্পতি থাকতেন। দ্বিতীয় তলায় বসবাস শুরু হলে এই কক্ষটি তিনি গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। উত্তর পাশের লাগোয়া কক্ষে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা থাকতেন। এই কক্ষেরই একপাশে থাকতেন শেখ কামাল ও শেখ জামাল। বাড়িতে ঢুকতেই ছিল ছোট একটি কক্ষ, যা ড্রয়িং রুম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। শেখ মুজিবুর রহমান এই বাড়ি থেকে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্-কালীন সময়ে জনতার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ও জরুরি সিদ্ধান্ত দিতেন। ১৯৭১ সালের সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর এই বাড়ি থেকে যে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হতো সেই মোতাবেক দেশ পরিচালিত হতো।
তিনি যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তখন এই ভবনেই ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ সামরিক বাহিনীর একদল সশস্ত্র সদস্যের আক্রমণে সপরিবারে নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পর সরকার বাড়িটিকে সিলগালা করে দেয়। ১৯৮১ সালে বাড়িটি শেখ হাসিনার পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়। পরে বঙ্গবন্ধুর দুই জীবিত উত্তরাধিকারী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ১৯৯৪ সালের ১১ই এপ্রিল বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট গঠন করে এই বাড়িটি ট্রাস্টের হাতে অর্পণ করেন।
১৯৯৪ সালের ১৪ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের স্মৃতি বিজড়িত কিছু সামগ্রীর সংগ্রহ নিয়ে এ বাড়িতেই “জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর” নামে একটি জাদুঘর স্থাপন করা হয়। এই ট্রাস্টের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানের এই বাড়িটি ও টুঙ্গিপাড়ার বাড়িটি দেখাশোনার পাশাপাশি বর্তমানে এর অধীনে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ছাড়াও শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল এন্ড নার্সিং কলেজটিও পরিচালিত হচ্ছে।
১৯৭১ সালে হামলা ও দখল
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণার পর রাত ১টা ৩০ মিনিট তথা ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শেখ মুজিবকে গ্রেফতার করে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাস ও পরে পাকিস্তানের পাঞ্জাবের মিয়ানওয়ালি কারাগারে আটক রাখা হয়। মুজিব পরিবারকে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের ২৬ নম্বর বাড়িতে গৃহবন্দি করে রাখা হয়। বাংলাদেশ বিজয় লাভ করার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাড়িটি দখল করে রাখে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর গুলির আঘাতে ভবনটি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। ১৯৭২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর বাড়ির মেরামত কাজ শেষ হলে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে তিনি এই বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস করতে থাকেন।
১৯৭৫ সালে হত্যাকান্ড ও লুট
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর বাড়িটি লুট করা হয়। হত্যা মামলায় ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল ১২ জন সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।[৮]
১৯৮৯ সালে হামলা
১৯৮৯ সালের ১০ আগস্ট রাতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে অবস্থান কালে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ১৫/২০ জনের একদল অস্ত্রধারী ভবনটি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ ও গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এসময় নিরাপত্তারক্ষীরা পাল্টা গুলি চালায় এবং আওয়ামী লীগের উপস্থিত নেতাকর্মীরা ধাওয়া করলে অস্ত্রধারীরা বাংলাদেশ ফ্রিডম পার্টির পক্ষে স্লোগান দিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে ধানমন্ডি ২৬ নম্বরের দিকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় ধানমন্ডি থানায় দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। ২০১৭ সালের ২৯ অক্টোবর মামলার ঘোষিত রায়ে ফ্রিডম পার্টির ১১ জনের সাজা হয়।[৯]
২০২৪ সালে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুট
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালীন ৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ বাড়িটিতে অগ্নিসংযোগ করে ও লুটপাট চালায়। এতে জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রায় সকল নিদর্শন ধ্বংস হয়ে যায়। এছাড়াও জাদুঘরের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী কয়েকটি স্থাপনায়ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।পরবর্তীতে পুড়ে যাওয়া স্থাপনা থেকে অজ্ঞাত ৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।পরের দিন ভবনটি দেখতে উৎসুক জনতা ঘটনাস্থলে ভীড় করেন এবং জাদুঘরে হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। দেয়ালে প্রতিবাদী গ্রাফিতি আঁকা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর সাথে ছাত্ররাও যোগদান করে। তারা ঘটনাস্থল থেকে লুটপাট ঠেকানোর চেষ্টার পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ পরিচ্ছন্নতার কাজে অংশ নেয়। ভবনের পাঠাগার থেকে উদ্ধারকৃত বই সমূহ কেন্দ্রীয় পাঠাগারে স্থানান্তর করা হয় এবং সেনাবাহিনী ভবনটি নিয়ন্ত্রণে নেয়।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান আবদুল কাদের সিদ্দিকী বলেন,
“আজকে ৩২ এর বাড়ি যেভাবে জ্বলতে, পুড়তে, ধ্বংস হতে দেখলাম, তার আগে আমার মৃত্যু হলে অনেক ভালো হত।… আজকের এই ধ্বংস ভবিষ্যত ইতিহাসে বাঙালি জাতির জন্যে একটা কলঙ্কের হয়ে থাকবে।”
২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট, শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে কিছু মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার চেষ্টা করলে লাঠিসোঁটা হাতে একদল লোক তাদের বাধা দেয় ও আক্রমণ করে।এতে একজন নিহত ও শতাধিক আহত হন।এসময় অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচীও হামলার শিকার হন এবং কাদের সিদ্দিকীর গাড়ি ভাংচুর করা হয়।হামলাকারীরা স্থানটিতে প্রবেশের পথ অবরুদ্ধ করে রাখে এবং সাংবাদিকদের ছবি তুলতে বাধা প্রদান করে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ফেসবুক পাতায় শেখ হাসিনা ৫ ফেব্রুয়ারি রাত ৯ টায় ভাষণ দেবেন বলে জানানো হয়। ভাষণ দেওয়ার পূর্বে সন্ধ্যায় হাসনাত আবদুল্লাহ উনার ফেসবুক পাতায় “বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের তীর্থভূমি মুক্তি হবে” বলে পোস্ট দেন। একই দিনে পিনাকী ভট্টাচার্যও ফেসবুকে ভিডিও বার্তায় ধানমন্ডি-৩২ ভেঙে ফেলার জন্য মানুষকে আহ্বান করেন।ফেসবুকে অনেকে বুলডোজার মিছিল শিরোনামে পোস্ট করেন। রাত ৮ টার পরপরই ভবনটি ভাঙা শুরু হয়। শেখ হাসিনা তার ভাষণে এই হামলার সমালোচনা করেন।
৩২ নম্বরের বাড়ি ভাঙচুর নিয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে গুরুত্ব পেয়েছে ধানমন্ডিতে অবস্থিত ৩২ নম্বর বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা। বিবিসি, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, টিআরটি ওয়ার্ল্ড, আরব নিউজ, এবিসি নিউজ, আনাদোলু এজেন্সি, সিএনএন, এপিসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে উঠে এসেছে ৩২ নম্বর ভাঙচুরের খবর।
ঘোষণা অনুযায়ী বুধবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাত ৮টায় কর্মসূচি থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে সেখানে জড়ো হতে থাকে ছাত্র-জনতা। তারা স্লোগান দিতে থাকে এবং একপর্যায়ে রাত ৮টার কিছু আগে ৩২ নম্বর বাড়িতে ঢুকে পড়েন। এরপর ভাঙচুর শুরু হয়, এবং একটি সময় বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরে বুলডোজার মেশিন দিয়ে বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। শুধু ৩২ নম্বর বাড়ি নয়, শেখ মুজিব ও তার পরিবারের সদস্যদের বাড়ি এবং ম্যুরালও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় গুরুত্ব সহকারে প্রচারিত হয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন তাদের শিরোনাম করেছে, “বাংলাদেশের বিক্ষোভকারীরা নির্বাসিত সাবেক নেত্রী শেখ হাসিনার বাড়ি ধ্বংস করেছে।” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই হামলা সংঘটিত হয় যখন শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় তার সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তৃতা দেন। ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহের পর, শেখ হাসিনা ১৫ বছরের শাসন শেষ করে পালিয়ে যান। তার বিরুদ্ধে ভিন্নমত দমন করার অভিযোগ ছিল।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান শিরোনাম করেছে, “বাংলাদেশি বিক্ষোভকারীরা স্বাধীনতার প্রতীক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর পারিবারিক বাড়ি ধ্বংস করেছে।” প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই বাড়ি থেকেই শেখ হাসিনার বাবা পাকিস্তান ভাঙনের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তবে পরবর্তীতে কর্তৃত্ববাদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে বাড়িটিতে আক্রমণ করা হয়।
বিবিসি তাদের প্রতিবেদনে শিরোনাম করেছে, “বিক্ষোভকারীরা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।” তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু শেখ হাসিনাই নয়, তার পরিবার ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের বাড়িতেও আগুন দেওয়া হয়েছে।
রয়টার্স শিরোনাম করেছে, “বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাবার বাড়ি উচ্ছেদ করেছে বিক্ষোভকারীরা।” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সমর্থকদের অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বক্তৃতা দেন, যার ফলে এই হামলার সূত্রপাত হয়।
তুরস্কের টিআরটি ওয়ার্ল্ড তাদের শিরোনাম করেছে, “ভারতে থেকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ বাংলাদেশে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছে।”
এবিসি নিউজ শিরোনাম করেছে, “বাংলাদেশি বিক্ষোভকারীরা নির্বাসিত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জড়িত একটি বাড়িতে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভকারীরা শেখ হাসিনার পরিবারকে লক্ষ্য করে বাড়ি ভাঙচুর করেছে, যা দেশের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
এছাড়া সৌদি আরবের আরব নিউজসহ ভারত ও পাকিস্তানের গণমাধ্যমগুলোও এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করেছে।
কসময়ের ধানমন্ডি-৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বাড়ি। যার পরিবর্তিত ঠিকানা হয়েছিল ১০ নম্বর বাড়ি, রোড নম্বর-১১, ধানমন্ডি-ঢাকা। এর ব্যাপ্তি ছড়িয়ে ছিল ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর’ নামে। ১৯৬১ সাল থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে এখানেই থাকতেন। এ বাড়ি থেকেই পরিচালিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি ধাপ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পর ১৯৮১ সালের ১০ জুন পর্যন্ত এই বাড়িটি বাংলাদেশ সামরিক কর্তৃপক্ষের অধীনে ছিল। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর ঘাতকচক্র এই বাড়িটি সিল করে রাখে এবং বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোনো সদস্যকেই এ বাড়িতে ঢুকতে দেননি। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে হত্যাকান্ডের শিকার হওয়ার ছ’বছর পর তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালে ১৭ মে দেশে ফিরলেও তাঁকে এ বাড়িতে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। এর কিছুদিন পর হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের ঋণে নির্মিত ভবনটি নিলামে ওঠানো হয়। তৎকালীন প্রায় ১২ হাজার টাকার কিস্তি পরিশোধ না হওয়ায় নিলামে চড়ানো হয় বাড়িটি। সে টাকা পরিশোধ করে বাড়ি বুঝে পান শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালের জুন মাসের ১০ তারিখে বাড়িটি বুঝে নেওয়ার পর দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ঘোষণা করেছিলেন ঐতিহাসিক এই বাড়িটি হবে জনগণের। ১৯৯৪ সালের ১৪ আগস্ট ৩২ নম্বরের এই বাড়িটি ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে উদ্বোধন করা হয়।
১৯৬২ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন, ১৯৭১-এর শুরুতে অসহযোগ আন্দোলনসহ নানা চড়াই-উতরাইয়ের সাক্ষী এই বাড়ি। এসব আন্দোলনের পরিকল্পনা প্রণয়ন, দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়, সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা শোনা সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল ৩২ নম্বরের এই বাড়ি। এখান থেকেই ট্রাঙ্ককলে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এই বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতিকে এনে দিয়েছিলেন কাঙ্খিত স্বাধীন-সার্বভৌম ভূখন্ড ও লাল সবুজের পতাকা। এই বাড়িতেই শেখ মুজিবুর রহমান থেকে বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতায় রূপান্তরিত হয়েছেন। এই বাড়িতেই বঙ্গবন্ধু সপরিবারে জীবন উৎসর্গ করেছেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ বাঙালি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এই বাড়িতেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।
ধানমন্ডি-৩২ নম্বরের এই বাড়ি জাদুঘরে রূপান্তরিত করার কাজে যারা শেখ হাসিনাকে সহযোগিতা করেছিলেন তাদের অনেকেই বেঁচে নেই। প্রয়াত কবি সুফিয়া কামাল, সাংবাদিক বেবী মওদুদ, ভাষাসৈনিক গাজীউল হক, ফটো সাংবাদিক পাভেল রহমান প্রমুখ নানা সময়ে জাদুঘর সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িত ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী অপারেশন ‘সার্চ লাইট’ নামে নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে হত্যা ও গণহত্যা চালায়। এ খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু এই বাড়ির নিচতলায় তার ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার থেকে টেলিফোনে রাত ১২টা ৩০ মিনিটে স্বাধীনতার ঘোষণা করে যার যা কিছু আছে তা নিয়ে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তাঁর স্বাধীনতা ঘোষণার খবর ওয়্যারলেস ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়। এই বাড়ি থেকেই ২৫ মার্চ রাত ১টা ৩০ মিনিট তথা ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি জাতির পিতাকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাস ও পরে পাকিস্তানের পাঞ্জাবের মিওয়ানওয়ালি কারাগারে বন্দি করে রাখে। বাংলাদেশ বিজয় লাভ করার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাড়িটি দখল করে রাখে। অন্যদিকে ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের ২৬ নম্বর বাড়িতে মুজিব পরিবারকে বন্দি করে রাখা হয়।
১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি তাঁর প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর গুলির আঘাতে ঝাঁজরা হয়েছিল এই বাড়িটি। তাই তিনি নিজ বাড়িতে উঠতে পারেননি। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন। বাড়ির মেরামত কাজ শেষ হওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর পরিবার নিয়ে সরকারি বাসভবনে না উঠে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে এই বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন। কিন্তু এই বাড়ি ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালের ভোররাতে মুজিব আর তার পরিবারের আট সদস্যের রক্তে ভেসে যায়। ইতিহাসের এ ঘৃণ্যতম হত্যাকাণ্ডের এই দিনে বঙ্গবন্ধুর পরিবারসহ ৩৩ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। ২০১১ সালের ২০ আগস্ট মূল ভবনের উত্তরে এর সম্প্রসারিত ভবন উদ্বোধন করা হয়। এই ষষ্ঠতলা ভবনে ২৬টি পর্বে বঙ্গবন্ধুর তথ্য ও সচিত্র ঘটনাবলি তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই ঐতিহাসিক ভবনকে আজ ধূলিস্যাৎ করে দেওয়া হলো।
ইউনূস ক্ষমতা দখল করার পর যে কটি বিষয়ের উপর নজর দিয়েছেন তার অন্যতম হল মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের দল আওয়ামী লিগকে মুছে দেওয়া। তিনি ক্ষমতা দখল করার পরপরই তাঁর বাহিনী একাত্তরের সব স্মারক ধ্বংস করেছে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিষিদ্ধ করেছেন। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের সময়টাকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য যা যা করার দরকার তার সব কিছুই তিনি করেছেন। আওয়ামী লিগ বা তার কোনও অঙ্গ-সংগঠনের দূরবর্তী সম্পর্কও থাকলেও কারাগারে যেতে অথবা ইউনুসের সমর্থক গোষ্ঠীর হাতে চরম লাঞ্ছিত হয়ে মরতে হয়েছে। তাতে সহায়তা করেছে জামায়াত শিবির ও হিযবুত সদস্যরা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শগত দুটি ধারা হল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও বিরোধী শক্তি। দ্বিতীয় পক্ষ অর্থাৎ বিরোধীরা সংখ্যায় কম হলেও বৌদ্ধিক জগতে, এলিট সমাজে তাঁদেরই কদর বেশি। সেই বাংলাদেশ থেকে গত ৫ অগাস্ট হাসিনা দেশ ছাড়ার পর বাংলাদেশ জুড়ে শেখ মুজিবের কত মূর্তি ভাঙা হয়েছে, তার সঠিক হিসাব কারও কাছে নেই। সেই ধ্বংসলীলার টুকরো দৃশ্য দেখে অনুমান করা যায়, সংখ্যাটা কয়েকশো হওয়া অসম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ছয় মাস পর বুধবার রাতভর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাসভবনে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বুলডোজার দিয়ে ভবনটির একাংশ ভেঙে দেয়া হয়। যেসময় এই ভাঙচুর চলছিল তখন পূর্বনির্ধারিত এক ভার্চুয়াল ভাষণে এর সমালোচনা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। গত বছর ৫ অগাস্ট একদল মানুষ বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর এবং অগ্নিসংযোগ করে।
এরও আগে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উচ্চারিত হয়নি। ছিল না তাঁর কোনও প্রতিকৃতি। প্রথা মেনে উচ্চারিত হয়নি সে দেশের জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান, মুহাম্মদ মনসুর আলির নাম। অনুষ্ঠানের শুরুতে শুধু কোরান পাঠ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের চালু প্রথা মেনে কোরানের পর গীতা, বাইবেল, ত্রিপিটক থেকে পাঠ করা হয়নি। হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হলেও ৫ থেকে ৮ অগাস্ট রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক হিংসায় নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের বালাই ছিল না। বলার অপেক্ষা রাখে না, এ সবই আসলে শেখ মুজিবকে সরকারিভাবে মুছে ফেলার আয়োজনের অংশ।
যাদের হাত ধরে এই উল্টে পথে যাত্রা, গণ অভ্যুত্থানের দিনগুলিতে সেই ছাত্ররা আওয়াজ তুলেছিল, ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার রাজাকার’। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি রাজাকাররা শত শত খুন আর হাজার হাজার নারীর উপর যৌন নিপীড়ন চালিয়েছিল। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর বেনজির আক্রমণ চালিয়েছে। মহম্মদ ইউনুসের নানা পদক্ষেপে স্পষ্ট, রাজাকারদের অভিভাবক জামায়াতি ইসলামী তাঁর আসল উপদেষ্টা।
সমস্ত অধ্যায়ই এখন ধূলিস্যাৎ। বুধবার রাত থেকে এই ৩২ নম্বর বাড়িতে হামলা চালাচ্ছে ‘বিপ্লবী ছাত্র জনতা’-র ব্যানারে জড়ো হওয়া কয়েক হাজার মানুষ। ইতিহাসকে শেষ করতে চাওয়া এ ‘বিপ্লব’ বাংলাদেশকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা সময়ই বলবে। শেখ হাসিনা ইতিমধ্যেই মুখ খুলেছেন এই নিয়ে। বলেছেন, ‘দেশের স্বাধীনতা কয়েকজন বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলবে এই শক্তি তাদের হয়নি। তারা একটা দালান ভেঙে ফেলতে পারবে, কিন্তু ইতিহাস মুছতে পারবে না।’ – দৈনিক স্টেটসম্যান