বাংলাদেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন: আওয়ামী লীগ ব্যতীত নির্বাচনের আন্তর্জাতিক বৈধতা, আইনি জটিলতা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ
বাংলাদেশে প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (ফেব্রুয়ারি/এপ্রিল ২০২৬) যদি আওয়ামী লীগকে (AL) আইনি প্রক্রিয়ায় বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত হয়, তবে এই নির্বাচন আন্তর্জাতিকভাবে গুরুতর বৈধতা সংকটের সম্মুখীন হবে। এই পরিস্থিতি ২০১৪ বা ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের স্বেচ্ছামূলক বয়কটের চেয়েও ভিন্ন, কারণ এখানে একটি প্রধান রাজনৈতিক দলকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সংহত করার লক্ষ্যে আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাচন থেকে বিরত রাখা হয়েছে ।
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য পশ্চিমা দেশগুলির পক্ষ থেকে যে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি’ (Inclusiveness) এবং ‘অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা’র (Meaningful Political Competition) শর্ত রয়েছে , আওয়ামী লীগের মতো দেশের সবচেয়ে বড় দুটি ঐতিহ্যবাহী দলের একটির অনুপস্থিতি সেই শর্ত পূরণকে অসম্ভব করে তুলবে। এর ফলস্বরূপ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে একটি স্পষ্ট ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি হবে: পশ্চিমা গণতন্ত্র-সমর্থক দেশগুলি (যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন) এটিকে বৈধতা দিতে দ্বিধা করবে, যা বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা (বিশেষত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন) ঝুঁকিতে ফেলবে। অন্যদিকে, আঞ্চলিক শক্তি যেমন ভারত ও চীন স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার স্বার্থে নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দিতে পারে, যা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করবে । অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের (IG) জন্য বৈধতা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় অবিলম্বে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আইনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য।
গণতান্ত্রিক উত্তরণের কাঠামো: জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক এবং আইনি পরিবর্তন
১.১. অন্তর্বর্তী সরকারের ম্যান্ডেট ও নির্বাচনী সংস্কার কমিশন (ERC)
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার (IG) ক্ষমতা গ্রহণ করে । এই সরকার দেশ ও জাতির জন্য একটি “নতুন শুরু” প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাংবিধানিক, নির্বাচনী এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ব্যাপক ম্যান্ডেট নিয়ে কাজ শুরু করে । অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ১৫ বছরের দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র ও সুশাসন পুনরুদ্ধার করা ।
নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ত্রুটিমুক্ত করার জন্য সরকার একটি নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন (ERC) গঠন করেছে । এই কমিশন নির্বাচন কমিশন (EC) এবং লেজিসলেটিভ বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত, যাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ, এবং নির্বাচনী অপরাধ সংক্রান্ত আইন সংশোধনের দায়িত্ব বর্তায় । এই সংস্কারগুলির উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে একতরফা নির্বাচনের পথ রুদ্ধ করা এবং নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা।
১.২. ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি ও চ্যালেঞ্জ
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । তবে, নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক রয়েছে; যেমন বিএনপি (Bangladesh Nationalist Party) সহ অন্যান্য দল দ্রুত নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে ।
নির্বাচন কমিশন (EC) ইতোমধ্যে নির্বাচনের জন্য প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৪ তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে জাতীয় সংসদের নির্বাচনি এলাকার সীমানার পুনর্নির্ধারনি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে । এছাড়া, EC নির্বাচনের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা, ভোটকেন্দ্র স্থাপন ও ব্যবস্থাপনার নীতিমালা-২০২৫ জারি করেছে ।
তবে, গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই পর্যায়ে মূল চ্যালেঞ্জ হলো সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাব। একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি স্থাপনের জন্য গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য, কিন্তু এই সংস্কারের এজেন্ডা আসন্ন নির্বাচনের সময়সীমার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে । এছাড়াও, এক পক্ষ (বিএনপি) যখন দ্রুত নির্বাচন চাইছে, তখন অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে ।
আওয়ামী লীগের আইনি নির্বাসন এবং অংশগ্রহণমূলক নীতির চ্যালেঞ্জ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় এবং অনন্য চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের (AL) আইনি প্রক্রিয়ায় নির্বাচন থেকে বহিষ্কার। এটি পূর্বেকার স্বেচ্ছামূলক রাজনৈতিক বয়কটের চেয়ে একটি ভিন্ন ও গভীরতর আইনি প্রশ্ন তৈরি করেছে।
২.১. সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ব্যবহার ও রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার পদক্ষেপ নেয়। মে ২০২৫ সালে, অন্তর্বর্তী সরকার সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগের সকল রাজনৈতিক কার্যকলাপ (প্রকাশনা, সভা ও অনলাইন স্পিচ) সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করে । এই নিষেধাজ্ঞা ততক্ষণ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে যতক্ষণ না আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) এই দল এবং এর সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারকার্য সম্পন্ন করে রায় প্রদান করে ।
আইনি নিষেধাজ্ঞার ফলস্বরূপ, ১২ মে ২০২৫ তারিখে নির্বাচন কমিশন (EC) আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করে দেয়, যা কার্যকরভাবে দলটিকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য করে তুলেছে । সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের মতে, যদিও নিবন্ধন সরাসরি বাতিল হয়নি, কিন্তু দলের সমস্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না ।
২.২. আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রাজনৈতিক ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক
এই নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি সমালোচিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর একটি সংশোধনী অনুমোদন করেছে, যা কেবল ব্যক্তি নয়, বরং “সম্মিলিত রাজনৈতিক সংস্থাকে” বিচারের আওতায় আনার সুযোগ দিয়েছে । সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ আরও একটি সংশোধনী আনা হয়, যার ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগপত্রভুক্ত কোনো ব্যক্তি নির্বাচন করতে বা সরকারি চাকরি করতে পারবে না ।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) সহ অনেকে, এই আইনি পদক্ষেপকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন হিসেবে নিন্দা করেছে। তারা এটিকে দমনমূলক কৌশল হিসেবে অভিহিত করেছে, যা পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের নিপীড়নমূলক কৌশলকে পুনরাবৃত্তি করছে বলে অভিযোগ । সমালোচকরা বলছেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য তৈরি ICT এখন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান রাজনৈতিক শক্তিকে নির্মূল করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে । এই বিচারিক প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে চলতে পারে, যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলবে ।
২.৩. রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির অপরিহার্যতা এবং গণ-বয়কটের ঝুঁকি
আওয়ামী লীগের আইনি বহিষ্কার বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এক মৌলিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। একদিকে, গণঅভ্যুত্থানের ফলে ক্ষমতাচ্যুত একটি ফ্যাসিবাদী কাঠামোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে । অন্যদিকে, পশ্চিমা গণতন্ত্রের মানদণ্ডগুলি একটি “অন্তর্ভুক্তিমূলক” নির্বাচন প্রক্রিয়া দাবি করে ।
নির্বাসনে থাকা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে যদি তার দলকে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়, তবে কোটি কোটি আওয়ামী লীগ সমর্থক (দেশের নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ১২৬ মিলিয়নের বেশি) আগামী জাতীয় নির্বাচন বয়কট করবে । তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে এই নিষেধাজ্ঞা শুধু অন্যায় নয়, বরং আত্ম-পরাজয়মূলক, এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ ছাড়া নতুন সরকারের নির্বাচনী বৈধতা থাকবে না ।
যদি নিবন্ধিত ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, তাদের পছন্দের দলের অভাবে, ভোটদানে বিরত থাকে, তবে ভোটার উপস্থিতি মারাত্মকভাবে কমতে পারে। এর ফলে, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক আনীত সংস্কারমূলক পদক্ষেপ থাকা সত্ত্বেও, নির্বাচনটি ‘গঠনগতভাবে অ-অন্তর্ভুক্তিমূলক’ হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে বিবেচিত হবে।
Table 1: আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণের আইনি ভিত্তি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
| বিষয়বস্তু | আইনি ভিত্তি / নির্বাহী সিদ্ধান্ত | উদ্দেশ্য (IG এর দৃষ্টিকোণ) | আন্তর্জাতিক সমালোচনা / ঝুঁকি |
| আওয়ামী লীগ কার্যক্রম নিষিদ্ধ | সংশোধিত সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ (মে ২০২৫) | জুলাই অভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দলগত বিচার ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা [19, 23] | রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের অভিযোগ; মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন; ট্রাইব্যুনালের রাজনৈতিক ব্যবহার [18, 22] |
| নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন স্থগিত | গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), দলীয় কার্যক্রমের নিষেধাজ্ঞার ফল | নির্বাচন কমিশনের বিধিবদ্ধ বাধ্যবাধকতা পালন | নির্বাচনকে গঠনগতভাবে অ-অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলা, বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করা [1] |
| নেতৃত্বকে অযোগ্য ঘোষণা | ICT আইনের সংশোধন (সেপ্টেম্বর ২০২৫) | অভিযুক্তদের নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া | আইনের অপব্যবহারের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করা; বিচারিক স্বচ্ছতার অভাব |
অংশগ্রহণহীন নির্বাচনের ঐতিহাসিক বৈধতা সঙ্কট: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
বাংলাদেশে প্রধান রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ইতিহাস দুর্বল বৈধতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার নজির সৃষ্টি করেছে। ত্রয়োদশ নির্বাচনের পরিস্থিতি এই ঐতিহাসিক দুর্বলতাগুলিকে আরও জটিল মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে।
৩.১. ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন (BNP vs. AL Boycott)
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগসহ সব প্রধান বিরোধী দল কর্তৃক বয়কটের মুখে । প্রধান বিরোধী দলগুলোর দাবি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন। এই নির্বাচনে মোট ভোট গৃহীত হয়েছিল মাত্র ২১% । নির্বাচনটি ব্যাপক অনিয়ম ও সহিংসতায় কলঙ্কিত হয় ।
ঐ নির্বাচনটি অভ্যন্তরীণভাবে যেমন স্বীকৃতি পায়নি, তেমনি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও এটিকে প্রত্যাখ্যান করেন। ফলস্বরূপ, তৎকালীন বিএনপি সরকার দেশ ও বিদেশের চাপের মুখে সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করতে বাধ্য হয় (তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা) এবং মাত্র তিন মাসের মধ্যে পদত্যাগ করে । ১৯৯৬ সালের এই অভিজ্ঞতা দেখায় যে একটি অ-গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না।
৩.২. ২০১৪ সালের নির্বাচন (AL vs. BNP Boycott)
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের প্রেক্ষাপটে, যা প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বর্জন করেছিল । এই নির্বাচনের ফলাফল ছিল একটি প্রায় বিরোধী দলবিহীন সংসদ । অধিকাংশ আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন, এবং ভোটার উপস্থিতি ছিল সরকারি হিসাবে ৪১.৮%, যা বিশ্লেষকদের মতে আরও কম (প্রায় ২২.৬৬%) ।
স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ, পর্যবেক্ষক এবং দাতাগোষ্ঠী এই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর অসন্তোষ প্রকাশ করে। ruling আওয়ামী লীগ সরকার দেশ ও বিদেশে বৈধতা সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল । যদিও ২০১৪ সালের সরকার ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল, কিন্তু তা বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণতান্ত্রিক শাসন’ থেকে কার্যত ‘এক-দলীয় কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে’ পরিণত হওয়ার পথে ঠেলে দেয় ।
৩.৩. AL-বিহীন ২০২৬ নির্বাচন: ভিন্ন মাত্রা ও উচ্চতর ঝুঁকি
২০২৬ সালের নির্বাচনের পরিস্থিতি পূর্ববর্তী দুটি অ-অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনের থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন এবং সম্ভবত আরও ঝুঁকিপূর্ণ। ১৯৯৬ এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনগুলোতে, বর্জনকারী দলগুলি ছিল স্বেচ্ছায় অনুপস্থিত। দলগুলি নীতিগত অবস্থানে অনমনীয় ছিল এবং নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে প্রত্যাখ্যান করেছিল ।
তবে, ২০২৬ সালে আওয়ামী লীগ আইনিভাবে বহিষ্কৃত । অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ফ্যাসিবাদী কাঠামোর বিলোপ সাধন, কিন্তু যদি একটি প্রধান দলকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইন সংশোধন করে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হয়, তবে এটি নির্বাচনকে পদ্ধতিগতভাবে বৈধ করলেও গঠনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ করে তুলবে। এর ফলে, অন্তর্বর্তী সরকার যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ম্যান্ডেট পেয়েছে , তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
Table 2: অংশগ্রহণহীন নির্বাচনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| নির্বাচন | প্রধান অনুপস্থিত দল | অনুপস্থিতির প্রকৃতি | টার্নআউট (আনুমানিক) | অভ্যন্তরীণ বৈধতা | আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি |
| ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৬ | আওয়ামী লীগ (AL) | বয়কট (তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি) | ~২১% | অত্যন্ত কম; সরকার স্বল্পস্থায়ী | ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যান/অবৈধ |
| জানুয়ারি, ২০১৪ | বিএনপি (BNP) | বয়কট (তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবি) | ~২২.৬৬% (বিতর্কিত) [30] | দুর্বল; লেজিটিমেসি ক্রাইসিস | শর্তাধীন; পশ্চিমা দেশগুলি অসন্তুষ্ট [30] |
| প্রত্যাশিত, ২০২৬ | আওয়ামী লীগ (AL) | আইনি নিষেধাজ্ঞা ও নিবন্ধন স্থগিত | সম্ভাব্য কম (AL-এর গণ-বয়কটের হুমকিতে) [14] | বিতর্কিত; সংস্কারের ম্যান্ডেট প্রশ্নবিদ্ধ | বিভক্ত ও শর্তাধীন; পশ্চিমা দেশগুলির দ্বারা উচ্চ ঝুঁকির বৈধতা সংকট |
Section IV: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানদণ্ড: ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচনের আবশ্যকতাআন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ (UN), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (US), বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। এই অন্তর্ভুক্তির অভাবই ২০২৬ নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার পথে প্রধান বাধা।
৪.১. আন্তর্জাতিক মানদণ্ড: অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মূলসূত্র
জাতিসংঘ বারবার বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনে সব ধরনের সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । ভারতও আনুষ্ঠানিকভাবে “অবাধ, সুষ্ঠু, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক” নির্বাচনের গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছে, যা অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক বৈধতার জন্য অপরিহার্য । ইন্টারন্যাশনাল আইডিয়ার (IDEA) মতো সংস্থাগুলিও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার প্রয়োজন বলে মনে করে ।
আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র-সমর্থক প্রতিষ্ঠানগুলি মনে করে যে একটি গণতান্ত্রিক ট্রানজিনের সফল পরীক্ষা হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে সকল দলের জন্য ‘অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা’ নিশ্চিত হয় এবং ভিন্নমতকে সম্মান করা হয় । আওয়ামী লীগের মতো একটি বিশাল দল আইনিভাবে নিষিদ্ধ হলে, নির্বাচন পদ্ধতিগতভাবে যতই স্বচ্ছ হোক না কেন, এটি রাজনৈতিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হিসেবে বিবেচিত হবে না।
৪.২. আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক মিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া
আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন (EOM) যেমন EU, কার্টার সেন্টার বা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (NDI), সাধারণত তখনই পূর্ণাঙ্গ মিশন পাঠায় যখন তারা নিশ্চিত হয় যে রাজনৈতিক পরিবেশ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করছে । বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা (RPO Article 91C) আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য কমিশন কর্তৃক লিখিত অনুমতির মাধ্যমে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের অনুমতি দেয় ।
কিন্তু যদি নির্বাচনের মৌলিক কাঠামোতেই অন্তর্ভুক্তির অভাব থাকে—যেমন একটি প্রধান দলকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাদ দেওয়া হয়—তবে পশ্চিমা EOM গুলি সম্ভবত তাদের মিশন প্রেরণে বিরত থাকবে। অতীতেও (যেমন ২০০১ সালে) কার্টার সেন্টার/NDI, যখন দেখেছিল যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব রয়েছে, তখন তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিদল পাঠানো থেকে সরে এসেছিল । ২০২৬ সালের ক্ষেত্রে, যেহেতু নিষেধাজ্ঞাটি স্বেচ্ছামূলক বয়কট নয়, তাই পশ্চিমা পর্যবেক্ষকরা এই প্রক্রিয়াটিকে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখতে নারাজ হতে পারে ।
যদি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি এই নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করে বা পর্যবেক্ষণে বিরত থাকে, তবে অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক আনীত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা (যা EU রাষ্ট্রগুলো দিতে আগ্রহী ছিল) মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে, কারণ আইনি কাঠামো নিজেই অন্তর্ভুক্তির নীতিকে লঙ্ঘন করছে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং স্বীকৃতির বিভাজন
আওয়ামী লীগ-বিহীন নির্বাচনের ফলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন তৈরি হবে। এই বিভাজন আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বনাম গণতান্ত্রিক বৈধতা—এই দ্বিমুখী চাপের ফল।
৫.১. পশ্চিমা জোট (US/EU) এবং গণতান্ত্রিক অগ্রাধিকার
পশ্চিমা দেশগুলি জুলাই বিপ্লবকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের জন্য একটি ‘বিরল সুযোগ’ হিসেবে বিবেচনা করে এবং অন্তর্বর্তী সরকারের গণতান্ত্রিক সংস্কার এজেন্ডাকে সমর্থন করেছে । তাদের মূল লক্ষ্য ছিল কর্তৃত্ববাদী শাসনের পুনরাবৃত্তি রোধ করা এবং প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিশ্চিত করা ।
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশে মানবাধিকার এবং গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে । যেহেতু আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা মানবাধিকার সংস্থাগুলির কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েছে (যারা এটিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের উদাহরণ হিসেবে দেখছে) , তাই এই নিষেধাজ্ঞা বজায় থাকলে পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনকে ‘গণতান্ত্রিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত থাকবে না। তারা সম্ভবত স্বীকৃতিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া, বিশেষত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগের স্বচ্ছতার সাথে শর্তযুক্ত করবে, অথবা ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতো সীমিত স্বীকৃতি প্রদান করবে।
৫.২. আঞ্চলিক ও কৌশলগত অংশীদার (ভারত/চীন) এবং স্থিতিশীলতার অগ্রাধিকার
আঞ্চলিক শক্তিগুলির স্বার্থ পশ্চিমা দেশগুলির চেয়ে আলাদা। ভারত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং তার কৌশলগত স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয় । যদিও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচনের কথা বলেছে , তবে নতুন বিএনপি বা অন্য কোনো জোটের সরকার ক্ষমতায় এলে, ভারত দ্রুত তার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করবে যেন আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় থাকে । AL-এর অনুপস্থিতিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি নতুন ভারসাম্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবে অন্তর্বর্তী সরকার ।
অন্যদিকে, চীন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার নীতি অনুসরণ করে এবং বাংলাদেশের দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্পগুলিতে (যেমন মাতারবাড়ী বা সোনাদিয়া বন্দর নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা) আগ্রহী । চীনও সম্ভবত নতুন, কার্যকর সরকারকে দ্রুত স্বীকৃতি দেবে।
এই পরিস্থিতিতে একটি ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন অবশ্যম্ভাবী। যদি পশ্চিমা দেশগুলো নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, তবে চীন ও ভারতের দ্রুত স্বীকৃতি অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং কূটনীতিকে পশ্চিমা গণতন্ত্র থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। এটি বাংলাদেশকে একটি কঠিন কৌশলগত অবস্থানে নিয়ে যাবে, যেখানে তাকে ভূ-রাজনৈতিক ব্লকের মধ্যে আরও বেশি ঝুঁকে পড়তে হতে পারে ।
Table 3: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া (প্রত্যাশিত)
| অভিনেতা (Actor) | মূল স্বার্থ | অন্তর্ভুক্তির উপর দৃষ্টিভঙ্গি | স্বীকৃতির সম্ভাব্য রূপ | নীতিগত প্রভাব |
| মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (US) | গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল | উচ্চ (AL-এর আইনি বহিষ্কার নিয়ে গভীর উদ্বেগ) | শর্তাধীন / বিলম্বিত স্বীকৃতি | ভিসা বা GSP সুবিধার উপর কঠোর শর্ত আরোপের ঝুঁকি |
| ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) | গণতান্ত্রিক সংস্কার, RMG বাণিজ্য | উচ্চ (গণতান্ত্রিক ট্রানজিশনকে সমর্থন ) | শর্তাধীন; EOM প্রেরণে অনীহা | GSP+ সুবিধা পর্যালোচনা এবং মানবাধিকারের উপর চাপ সৃষ্টি |
| ভারত (India) | আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা | মধ্যম (স্থিতিশীলতা > প্রক্রিয়া) | দ্রুত স্বীকৃতি (যদি সরকার কার্যকর হয়) | অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে স্থিতিশীল সম্পর্ক স্থাপন; আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখা |
| চীন (China) | অর্থনৈতিক সম্পর্ক, অ-হস্তক্ষেপ নীতি | নিম্ন | দ্রুত স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি | পশ্চিমা স্বীকৃতি ছাড়া অর্থনৈতিক নির্ভরতা চীনের দিকে ঝুঁকতে পারে [6] |
স্বীকৃতি বর্জনের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিণতিযদি আন্তর্জাতিকভাবে ত্রয়োদশ নির্বাচন বৈধতা না পায়, তবে এর অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিণতি অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে।
৬.১. বাণিজ্য সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব (RMG Sector)
বাংলাদেশ বর্তমানে LDC মর্যাদা থেকে উত্তরণের (২০২৬ সাল নাগাদ) দ্বারপ্রান্তে রয়েছে । এই উত্তরণকালে পশ্চিমা বাজারের সাথে স্থিতিশীল বাণিজ্য সম্পর্ক অপরিহার্য। বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় ৮০% তৈরি পোশাক (RMG) খাত থেকে আসে, যার প্রধান গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (US) ।
পশ্চিমা দেশগুলি, বিশেষত ইইউ, GSP (Generalized System of Preferences) এবং GSP+ বাণিজ্য সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে শ্রম অধিকার, সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক মানদণ্ড কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। একটি AL-বিহীন, অ-অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে পশ্চিমা দেশগুলি রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে (যা অন্তর্বর্তী সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার নিয়ে উত্থাপিত হয়েছে ) এই বাণিজ্য সুবিধাগুলি স্থগিত করতে পারে। এই ঝুঁকি আরএমজি শিল্পকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে, যা লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের জীবিকা এবং দেশের অর্থনীতির স্থিতিশীলতা মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলবে ।
৬.২. জাতিসংঘের শান্তি মিশনে অংশগ্রহণ (UN Peacekeeping)
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে (UN Peacekeeping Missions) বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান সৈন্য প্রেরণকারী দেশ । এই ভূমিকা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মর্যাদা রক্ষা করে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম উৎস।
অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা বিতর্কিত নির্বাচনের কারণে সৃষ্ট দমন-পীড়নের ঘটনা জাতিসংঘের মানবসম্পদ যাচাই-বাছাই নীতি (HRDDP) লঙ্ঘন করতে পারে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গ্রেফতার এবং দমন-পীড়নের যে অভিযোগ তুলেছে , তা যদি অব্যাহত থাকে, তবে তা বাংলাদেশের জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে । এই ঝুঁকি দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীর বৈশ্বিক ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
উপসংহার ও নীতিগত সুপারিশ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করতে হলে, শুধুমাত্র পদ্ধতিগত সংস্কারই যথেষ্ট নয়, বরং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। আওয়ামী লীগকে আইনিভাবে নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি অভ্যন্তরীণভাবে ফ্যাসিবাদ দমনের একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হলেও, আন্তর্জাতিক গণতন্ত্রের মানদণ্ডে এটি রাজনৈতিক দমন-পীড়নের উদাহরণ হিসেবে গণ্য হওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে।
৭.১. আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন
বিশ্লেষণ থেকে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় যে, যদি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে এই নির্বাচনটি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার না করে, বরং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থেকে একটি ঐতিহ্যবাহী প্রধান দলকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে একটি নতুন রাজনৈতিক সংহতিকরণের (Political Consolidation) জন্ম দেবে। এই নির্বাচন পশ্চিমা গণতন্ত্র-সমর্থক দেশগুলির কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ বৈধতা অর্জনে ব্যর্থ হবে এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বিভক্ত হওয়ার কারণে দেশের ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।
৭.২. অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য কৌশলগত সুপারিশসমূহ
১. আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও পর্যালোচনা: আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি (বিশেষত সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং ICT-এর এখতিয়ার) অবিলম্বে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছতার সাথে পর্যালোচনা করা উচিত। মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের দ্বারা উত্থাপিত প্রক্রিয়াগত ত্রুটিগুলি (Due Process concerns) অবিলম্বে দূর করতে হবে । রাজনৈতিক দলগুলিকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিবর্তে, সুনির্দিষ্টভাবে ব্যক্তির অপরাধের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে।
২. রাজনৈতিক ঐকমত্যের জন্য সংলাপ: অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত নির্বাচনের সময়সীমা এবং মৌলিক সংস্কারের বিষয়ে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সাথে কার্যকর ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় সকল প্রধান পক্ষের বিশ্বাস অর্জন করা অপরিহার্য।
৩. জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার: গণ-বয়কটের হুমকি মোকাবিলা করতে এবং নির্বাচনকে উচ্চ ভোটার অংশগ্রহণের মাধ্যমে সফল করতে, সরকারের উচিত সকল রাজনৈতিক বন্দীর দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং একটি নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা, যা জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনবে।
৭.৩. আন্তর্জাতিক অংশীদারদের জন্য সুপারিশ
১. ঐক্যবদ্ধ কূটনৈতিক অবস্থান: যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ এবং জাতিসংঘের উচিত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণকে সমর্থন করার জন্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচনের মানদণ্ড নিয়ে একটি অভিন্ন এবং শক্তিশালী বার্তা বজায় রাখা। এই ঐক্য ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এড়াতে সাহায্য করবে।
২. শর্তসাপেক্ষ সহযোগিতা: আন্তর্জাতিক আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা শুধুমাত্র তখনই প্রদান করা উচিত যখন অন্তর্বর্তী সরকার গণতান্ত্রিক অধিকার ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রদর্শন করবে। আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা পর্যালোচনা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াজাত স্বচ্ছতার ওপর জোর দেওয়া জরুরি।
৩. শান্তি মিশন সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ: জাতিসংঘের উচিত বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বজায় রাখার স্বার্থে নিরাপত্তা বাহিনীর নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগের ক্ষেত্রে কঠোর পর্যবেক্ষণ বজায় রাখা।
বিশ্লেষণে ব্যবহৃত তথ্যসূত্র সমূহ

