ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি: পশ্চিমা সমর্থন, আঞ্চলিক মেরুকরণ ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জের কৌশলগত বিশ্লেষণ
১. সারসংক্ষেপ ও কৌশলগত মূল্যায়ন
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি একটি জটিল এবং দ্বিমুখী প্রকৃতির। একদিকে, তিনি নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে যে নৈতিক এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভোগ করেন, তা তাকে পশ্চিমা শক্তিগুলোর কাছ থেকে দ্রুত কূটনৈতিক বৈধতা ও অভূতপূর্ব সমর্থন লাভে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে, ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড, বিশেষ করে মানবাধিকার পরিস্থিতি, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দমনে কথিত পদক্ষেপ এবং আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে কৌশলগত মেরুকরণের কারণে তার ভাবমূর্তি কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে।
এই বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ড. ইউনূস সরকারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা মূল্যায়ন করা। বিশ্লেষণটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে ড. ইউনূসের ভাবমূর্তি মূলত দুটি বিপরীত স্রোতের সমন্বয়:
১. “নোবেল লরিয়েট এফেক্ট” (The Nobel Laureate Effect): আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তিনি পূর্ববর্তী সরকার কর্তৃক ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ হয়রানির শিকার ছিলেন । এই প্রেক্ষাপট তাকে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কাছ থেকে দ্রুত কূটনৈতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে, যা মূলত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সুশাসনের সংস্কারের প্রতি তাদের সমর্থনের ইঙ্গিত বহন করে ।
২. “সুশাসনের সংকট” (The Governance Deficit): ক্ষমতা গ্রহণের পর মানবাধিকার সংস্থাগুলো যেমন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW), কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) এবং রাইটস অ্যান্ড রিস্কস অ্যানালাইসিস গ্রুপ (RRAG) অভিযোগ করেছে যে অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই দমনমূলক কৌশল অবলম্বন করছে, যার ফলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকার মারাত্মকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে । এই অভ্যন্তরীণ দমনপীড়ন তার ভাবমূর্তির নৈতিক ভিত্তি ক্ষুণ্ণ করছে।
ড. ইউনূস সরকার পূর্ববর্তী ‘ভারত-কেন্দ্রিক নীতি’ থেকে সরে এসে কৌশলগত বৈচিত্র্য (Strategic Diversification) অনুসরণ করছে, বিশেষ করে চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার মাধ্যমে । এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির ইঙ্গিত দিলেও, বিতর্কিত “গ্রেটার বাংলাদেশ” মানচিত্র সংক্রান্ত ঘটনা ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নজিরবিহীন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করেছে ।
সব মিলিয়ে, ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক অবস্থান বর্তমানে স্থিতিশীল হলেও অত্যন্ত ভঙ্গুর। পশ্চিমা সমর্থন তাকে সময় দিয়েছে, কিন্তু যদি সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মৌলিক গণতান্ত্রিক সংস্কার (জুলাই জাতীয় সনদ) এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়, বিশেষত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিরসনে, তবে আন্তর্জাতিক আস্থা দ্রুত হ্রাস পেতে পারে ।
২. আন্তর্জাতিক বৈধতা ও প্রাথমিক অভ্যর্থনা
২.১. ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির উত্তরাধিকার এবং ক্ষমতা আরোহণের প্রেক্ষাপট
ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত সাফল্য এবং পূর্ববর্তী সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে চলা দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এটি তার সরকারকে দ্রুত আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে অপরিহার্য ভূমিকা রাখে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক অঙ্গসংস্থা (UNHCHR) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্পষ্টভাবে অভিযোগ করেছিল যে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আনা মামলাগুলো শ্রম আইন বা দুর্নীতির চেয়ে বরং ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধ’ বা ‘হয়রানি’র একটি রূপ । অ্যামনেস্টি দাবি করেছিল, এই প্রক্রিয়া বিচার ব্যবস্থার অপব্যবহারের চরম উদাহরণ । জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার ভলকার তুর্ক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে ড. ইউনূসকে এক দশক ধরে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে এবং উচ্চ পর্যায় থেকে তার বিরুদ্ধে মানহানিকর প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ন্যায়বিচারের সম্ভাবনাকে দূরে ঠেলে দেয় ।
এই আইনি হয়রানির আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ, যা কন্সোর্টিয়াম ফর জাস্টিসের (CFJ) ‘ট্রায়ালওয়াচ’ রিপোর্টেও উঠে এসেছে যে মামলাগুলো ‘অনুচিত উদ্দেশ্য’ নিয়ে আনা হয়েছিল , তাকে ক্ষমতায় আরোহণের পূর্বে আন্তর্জাতিকভাবে একজন নিপীড়িত ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি—যা নোবেল বিজয়ীসহ ১৭৫ জন বিশ্বনেতার খোলা চিঠির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছিল —তাকে এমন এক নৈতিক বৈধতা প্রদান করে, যা তাকে আগস্টের ছাত্র বিদ্রোহের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দ্রুত গ্রহণ করতে সহায়তা করে। পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে ইউনূস ছিলেন পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের নিপীড়নের শিকার একজন সম্মানিত ব্যক্তি, যা তার ক্ষমতা গ্রহণের আইনি ও সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কমিয়ে দেয়। ইউনূসের পূর্ববর্তী আইনি হয়রানিই তার বর্তমান পশ্চিমা কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি মূল কার্যকারণ হিসেবে কাজ করে, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলো তাকে স্বৈরাচারের হাত থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করে।
২.২. পশ্চিমা ব্লক থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সমর্থন
ড. ইউনূস সরকার পশ্চিমা শক্তিগুলোর কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই দ্রুত এবং জোরালো আনুষ্ঠানিক সমর্থন লাভ করে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির সবচেয়ে ইতিবাচক দিক।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সরাসরি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানান । হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, দুই নেতা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং শক্তিশালী দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্বের কথা নিশ্চিত করেন। প্রেসিডেন্ট বাইডেন বাংলাদেশের নতুন সংস্কার এজেন্ডা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সমর্থনের আশ্বাস দেন ।
যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকেও অনুরূপ সমর্থন আসে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব ডেভিড ল্যামি এবং হাই কমিশনার সারাহ কুক উভয়েই ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে স্বাগত জানান। তারা ‘শান্তি ও শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার,’ ‘জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা’ এবং ‘জাতীয় পুনর্মিলন’ নিশ্চিত করার জন্য পূর্ণ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেন । হাই কমিশনার কুক স্পষ্ট করেন যে প্রধানমন্ত্রী স্যার কেইর স্টারমারও ইউনূসের নিয়োগকে উষ্ণভাবে স্বাগত জানিয়েছেন ।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রতি তাদের জোরালো অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার জুলাই জাতীয় সনদকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য একটি ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ’ নথি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি ইউনূস সরকারের শ্রম আইন সংস্কার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন, এগুলোকে ‘উল্লেখযোগ্য সাফল্য’ হিসেবে অভিহিত করেন । এছাড়া, ইইউ ২০০৮ সালের পর এই প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল (১৫০ থেকে ২০০ সদস্য বিশিষ্ট) বাংলাদেশে পাঠাবে বলে ঘোষণা করেছে। এই অঙ্গীকার ইউনূস সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে ।
তবে এই সমর্থন শর্তসাপেক্ষ। পশ্চিমা শক্তিগুলোর সমর্থন কেবল ইউনূসের ব্যক্তিত্বের জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা নিরসনের প্রয়োজনীয়তার জন্য অপরিহার্য। তারা দ্রুত স্থিতিশীলতা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথ দেখতে চায়। ইইউ আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছে । ড. ইউনূসের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে (UNGA) ভাষণ এবং আন্তর্জাতিক নেতা-নেত্রীদের সাথে সাক্ষাৎ নতুন সরকারের আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জনের প্রচেষ্টাকে সুসংহত করেছে । এটি দেশের ভেতরে বিদ্যমান ‘সংবিধান স্থগিত’ বা ‘আইনি বৈধতার অভাব’ সংক্রান্ত বিতর্ককে কিছুটা আড়াল করতে সহায়তা করেছে।
৩. আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত পরিবর্তন
ড. ইউনূস সরকারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ এবং মেরুকরণ এসেছে আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্র থেকে, বিশেষত ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতির কারণে।
৩.১. ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের চরম অবনতি

কৌশলগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ড. ইউনূস সরকার পূর্ববর্তী সরকারের ‘ভারত-কেন্দ্রিক নীতি’ থেকে সরে এসে কৌশলগত বৈচিত্র্য অনুসরণ করছে । চ্যাথাম হাউসের মন্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন আর ভারতের ‘সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র’ হিসেবে থাকতে চাইছে না, বরং বিশ্বের সঙ্গে নিজস্ব শর্তে যুক্ত হচ্ছে। এটি চীন এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল পরিকাঠামো সহযোগিতার মাধ্যমে পররাষ্ট্রনীতিতে একটি সুস্পষ্ট পরিবর্তন এনেছে ।
এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাবাসন ও বিচার সংক্রান্ত কূটনৈতিক উত্তেজনা। ইউনূস সরকার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে’ বিচারের মুখোমুখি করার আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ জানিয়েছে । যেহেতু হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন, ভারত এই অনুরোধে সাড়া দেয়নি, যার ফলে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও তীব্র হয়েছে। ইউনূস স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে ভারত তাকে আশ্রয় দিতে পারে, তবে ভারতকে তার ভূখণ্ডকে ইউনূসের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেওয়া সহ্য করা হবে না । এই পরিস্থিতি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সংবেদনশীলতা বাড়িয়েছে। অতীতেও, ইউনূসের ভারতবিরোধী মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ভারত একটি ট্রানজিট চুক্তি বাতিল করেছিল, যা নেপাল, ভুটান এবং মিয়ানমারের দিকে বাংলাদেশি পণ্যের চলাচলকে প্রভাবিত করেছিল ।
৩.২. ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’ মানচিত্র বিতর্ক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া
ড. ইউনূস সরকারের আঞ্চলিক ভাবমূর্তিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’ মানচিত্র বিতর্ক।
ঢাকায় সফররত পাকিস্তানের জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান জেনারেল সাহির শামশাদ মির্জাকে ড. ইউনূস “Art of Triumph: Bangladesh’s New Dawn” নামক একটি বই উপহার দেন। এই বইয়ের কভারে ‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’ ধারণার একটি বিকৃত মানচিত্র ছিল, যেখানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো (বিশেষ করে আসাম ও অন্যান্য রাজ্য) বাংলাদেশের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে ।
এই বিতর্কিত মানচিত্রটি ঢাকা-ভিত্তিক ইসলামিস্ট গোষ্ঠী সুলতানাত-ই-বাংলা দ্বারা প্রচারিত ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা ভারতে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে । এই ঘটনা ইউনূসের পূর্ববর্তী মন্তব্যগুলির (যেমন চীন সফরে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ‘স্থলবেষ্টিত’ অঞ্চল বলা ) সঙ্গে মিলে যায়, যা তার সরকারের আঞ্চলিক মনোভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যদিও এর আগে এক উপদেষ্টা একই ধরনের মানচিত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার পর ভারত প্রতিবাদ জানিয়েছিল এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এটিকে ‘গ্রাফিটি’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল , একজন উচ্চ-পর্যায়ের সামরিক ব্যক্তিত্বকে সরকারিভাবে এই ধরনের বই উপহার দেওয়াকে ভারতের প্রতি ইচ্ছাকৃত কূটনৈতিক উস্কানি হিসেবে দেখা হয়।
এই ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত মেরুকরণ এবং মানচিত্র বিতর্ক ইঙ্গিত করে যে ইউনূসের পররাষ্ট্রনীতি কেবল কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের জন্য নয়, বরং অভ্যন্তরীণভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমর্থন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা হতে পারে । ভারতের সঙ্গে তীব্র অবিশ্বাস বাংলাদেশের বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলোকে দুর্বল করছে। ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধি পেলে বিদেশী বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
৪. আন্তর্জাতিক সংস্থার চোখে সুশাসনের মানদণ্ড ও সমালোচনা
পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনৈতিক সমর্থন সত্ত্বেও, ড. ইউনূস সরকারের অভ্যন্তরীণ সুশাসন এবং মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও মিডিয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর সমালোচনা তীব্র হয়েছে। এই সমালোচনা তার সরকারের নৈতিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
৪.১. আইনের শাসন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) সতর্ক করেছে যে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার পূর্বসূরি শেখ হাসিনার সরকারের দমনমূলক কৌশলগুলোর পুনরাবৃত্তি করছে । এই প্রশাসন, যা আগস্ট ২০২৪ এর আন্দোলনের পর ক্ষমতা গ্রহণ করে, অপরাধমূলক বিচার ব্যবস্থার সংস্কার এবং গুরুতর নির্যাতনের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পূরণের পরিবর্তে প্রাক্তন সরকারের সমর্থকদের অধিকার দমন করার চেষ্টা করছে ।
সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের (Anti-Terrorism Act) সংশোধিত বিধান ব্যবহার করে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গণ-গ্রেপ্তার করছে । মে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন প্রবর্তিত ক্ষমতা ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের ওপর ‘সাময়িক নিষেধাজ্ঞা’ জারি করে । HRW এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে এবং সতর্ক করে যে এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রাক-বিচার আটককে সাধারণ নিয়মে পরিণত করতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা জুলাই বিপ্লবের সময় এবং গত পনেরো বছরে ঘটে যাওয়া গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নির্যাতনের জন্য অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে এবং RAB-কে বিলুপ্ত করার মাধ্যমে নিরাপত্তা খাতে সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে ।
ড. ইউনূস নিজে যখন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন, তখন তিনি মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের প্রতীক ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তার সরকার পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের ব্যবহৃত দমনমূলক আইনি কাঠামো ব্যবহার করে বিরোধীদের লক্ষ্যবস্তু করছে, যা তার নৈতিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
৪.২. সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর দমন ইউনূস সরকারের ভাবমূর্তির জন্য সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক।
রাইটস অ্যান্ড রিস্কস অ্যানালাইসিস গ্রুপ (RRAG) এর একটি রিপোর্ট অনুসারে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম আট মাসে কমপক্ষে ৬৪০ জন সাংবাদিক সহিংসতা, আইনি ব্যবস্থা বা ভীতি প্রদর্শনের শিকার হয়েছেন, যা একটি ‘সুসংগঠিত দমন’ । সুহাস চাকমা, RRAG এর পরিচালক, উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে এই দমনপীড়ন সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নীরব রয়েছে ।
পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় যে ইউনূস সরকার ‘ইসলামী নতুন ব্যবস্থার জন্য খুব বেশি সেক্যুলার’ মনে করে ১,০০০ জনেরও বেশি সাংবাদিককে বরখাস্ত করেছে । বিশিষ্ট সাংবাদিক জুলফিকার আলী মানিক, যিনি নিউইয়র্ক টাইমসের জন্য রিপোর্ট করেছেন এবং ইসলামপন্থী আন্দোলনে বিশেষজ্ঞ, তিনিও এই সরকারের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন ।
কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে সরকার সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট, অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট এবং ফৌজদারি মানহানির বিধানসহ অন্যান্য দমনমূলক আইনগুলোর সংশোধন বা বাতিল করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই আইনগুলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে । গণমাধ্যমকে দমন করা এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করা অভ্যন্তরীণভাবে আরও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য, স্থিতিশীলতা, অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করবে।
৫. আইনি বৈধতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং দুর্নীতির তদন্ত
৫.১. সাংবিধানিক ও আইনি বিতর্কের চলমান বিশ্লেষণ
ড. ইউনূস সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছে, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পুনরুদ্ধার, নির্বাচনী সংস্কার বাস্তবায়ন এবং সুশাসনের প্রচারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ । প্রধান উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন যে এই সনদ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন জাতিকে অতীতের বোঝা থেকে মুক্ত করে ‘নতুন বাংলাদেশের পথ দেখাবে’ ।
তবে অন্তর্বর্তী সরকার গণ-ছাত্র বিদ্রোহের ফসল হওয়া সত্ত্বেও, এর আইনি বৈধতার স্পষ্ট পথের অভাব রয়েছে বলে রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহারের মতো সমালোচকরা যুক্তি দেন । যেহেতু ইউনূস বর্তমান সংবিধানের অধীনে, আওয়ামী লীগ শাসনামলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির অধীনে শপথ নিয়েছেন, তাই এই আইনি কাঠামো নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান। সমালোচকরা একটি ‘ফ্যাসিবাদী’ রাষ্ট্র কাঠামোর অবশিষ্টাংশকে সমর্থন করার পরিবর্তে জনগণের ইচ্ছার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি নতুন সংবিধানের খসড়া তৈরির পক্ষে, যা সরকারকে ব্যাপক সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে ।
৫.২. বিদেশে পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধার
ইউনূস সরকারের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির একটি ইতিবাচক দিক হলো পূর্ববর্তী সরকারের আমলে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ। সরকার অনুমানিক $২৩৪ বিলিয়ন ডলারের পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা করছে এবং এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিদেশী সরকারকে কাজে লাগাচ্ছে ।
ড. ইউনূস পাচার হওয়া এই অর্থকে “চুরি যাওয়া টাকা” হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং যুক্তরাজ্য কর্তৃপক্ষকে তা খুঁজে বের করতে “আইনি ও নৈতিকভাবে” সহায়তা করার আহ্বান জানিয়েছেন । এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান সুশাসনের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতির প্রমাণ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে বিবেচিত হয়। তবে এই প্রক্রিয়ায় উচ্চ-পর্যায়ের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাও রয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউকে প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমার ব্যক্তিগতভাবে ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানান । এটি ধারণা করা হয় যে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের দুর্নীতির তদন্ত সম্ভবত স্টারমারের ইউকে লেবার পার্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা স্টারমারের সাক্ষাৎ প্রত্যাখ্যানের একটি কারণ হতে পারে ।
৫.৩. ড. ইউনূসের গ্রামীণ আইনি চ্যালেঞ্জের বর্তমান অবস্থা
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে দায়ের করা মামলাগুলোর অগ্রগতি তার ক্ষমতা গ্রহণের প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক। এই মামলাগুলোর অনেকগুলো আন্তর্জাতিকভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে বিবেচিত হয়েছিল ।
আইনি চ্যালেঞ্জের বর্তমান পরিস্থিতি নির্দেশ করে যে পূর্ববর্তী সরকারের আমলে কিছু আইনি পদক্ষেপের ভিত্তি দুর্বল ছিল:
১. গ্রামীণ কল্যাণ মামলা: গ্রামীণ কল্যাণের বিরুদ্ধে ১০৬ জন শ্রমিকের করা ১০৩ কোটি টাকা পরিশোধের জন্য শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের রায় হাইকোর্ট বাতিল করে দিয়েছে। হাইকোর্ট রায়ে বলেছে যে শ্রমিকরা চাইলে শ্রম আদালতে নতুন করে মামলা করতে পারবে ।
২. শ্রম আদালতের অন্যান্য মামলা: গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান হিসেবে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা শ্রমিক বরখাস্ত সংক্রান্ত পাঁচটি মামলা হাইকোর্ট বাতিল করে দেয়। সরকার আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল ফাইল করলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখে বলে যে মামলাগুলো বাতিল করার ক্ষেত্রে ‘কোনো আইনি দুর্বলতা বা হস্তক্ষেপ’ পাওয়া যায়নি ।
৩. দুর্নীতির মামলা: জানুয়ারী ২০২৪-এ শ্রম আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৬ মাসের কারাদণ্ড হলেও , সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (ACC) সংক্রান্ত একটি মামলায় ইউনূস এবং গ্রামীণ টেলিকমের অন্যান্য কর্মকর্তারা বিশেষ আদালত কর্তৃক খালাস পেয়েছেন ।
নিম্নোক্ত সারণিটি ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আইনি হয়রানির পর্ব এবং এর আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার একটি সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করে:
ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আইনি মামলার আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ (সময়রেখা ও প্রতিক্রিয়া)
| মামলার বিষয়বস্তু | সময়কাল | ফলাফল | আন্তর্জাতিক মন্তব্য/পর্যবেক্ষণ |
|---|---|---|---|
| শ্রম আইন লঙ্ঘন (গ্রামীণ টেলিকম) | প্রাক-২০২৪ (বিচার: জানুয়ারি ২০২৪) | ৬ মাসের কারাদণ্ড (পরবর্তীতে জামিন) | রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানির অভিযোগ (জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি) |
| দুর্নীতির অভিযোগ | প্রাক-২০২৪ | কিছু মামলায় খালাস/রায় বাতিল (যেমন এসিসি মামলা) | আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহারের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা |
| গ্রামীণ কল্যাণ শ্রমিক লভ্যাংশ | ২০২৩ (রায় বাতিল) | হাইকোর্ট রায় বাতিল করে শ্রম আদালতে যাওয়ার নির্দেশ দেয় | পূর্ববর্তী সরকারের আমলে শ্রমিকদের প্রভাবিত করার অভিযোগ |
| পাঁচটি শ্রম আদালতের মামলা (শ্রমিক বরখাস্ত) | ২০২৪ (অক্টোবর) | হাইকোর্ট কর্তৃক মামলার কার্যক্রম বাতিল | আপিল বিভাগ দ্বারা সিদ্ধান্ত বহাল, আইনি দুর্বলতা নেই |
৬. আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ঝুঁকি মূল্যায়ন
ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বর্তমানে একটি অস্থায়ী ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা তীব্র ঝুঁকির মুখে। কৌশলগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, তার ভাবমূর্তি এক ‘অসুবিধাজনক কূটনৈতিক গ্রহণ (Inconvenient Diplomatic Acceptance)’-এর পর্যায়ে রয়েছে।
৬.১. দ্বিমুখী বার্তার প্রভাব
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একই সাথে ড. ইউনূসকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রতীক হিসেবে দেখছে এবং তার সরকারের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এই নৈতিক বৈপরীত্যের কারণে তার সরকার দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে পারে।
এই নৈতিক বৈপরীত্যের কারণ হলো: ড. ইউনূস যখন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন, তখন তিনি মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় এসে তার সরকার পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের ব্যবহৃত দমনমূলক আইনি কাঠামো (যেমন সন্ত্রাসবিরোধী আইন) ব্যবহার করে বিরোধীদের লক্ষ্যবস্তু করছে । এই বৈপরীত্য পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে প্রশ্ন তৈরি করছে যে তারা কি আসলে স্বৈরাচারী চেহারার নতুন একটি স্বৈরাচারকে সমর্থন করছে কিনা ।
যদি অভ্যন্তরীণ দমন অব্যাহত থাকে এবং মিডিয়া দমন (৬৪০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ ) না কমে, তাহলে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বা মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হতে পারে। পশ্চিমা দেশগুলো ট্রানজিশনাল প্রক্রিয়ায় মনোযোগ দিলেও, মানবাধিকার সংস্থাগুলো গণতন্ত্রের উপাদান (বাকস্বাধীনতা, আইনের শাসন) রক্ষার ব্যর্থতা নিয়ে উদ্বেগ জানাচ্ছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে ড. ইউনূস গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নেতা হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে যে মর্যাদা পেয়েছিলেন, তা এখন দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে।
৬.২. আঞ্চলিক অস্থিরতার পরিণতি
আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেকার তীব্র অবিশ্বাস বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক নিরপেক্ষতাকে দুর্বল করছে। ভারত সম্ভবত চীন-পাকিস্তান অক্ষের দিকে বাংলাদেশের এই ঝোঁককে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখবে ।
বিতর্কিত মানচিত্র উপহার এবং ভারত-বিরুদ্ধ ভূ-রাজনৈতিক কৌশল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে। যদি আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়, তবে বাংলাদেশের বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলো (যেমন বিমসটেক সংযোগ) মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। বিদেশী বিনিয়োগের পরিবেশও অস্থিতিশীল হতে পারে, যেমন ডেনিশ কোম্পানি AP Møller-Mærsk-এর মতো বড় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের ক্ষেত্রে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যারা চট্টগ্রামে $৮০০ মিলিয়ন বিনিয়োগ করতে চেয়েছিল ।
৭. কৌশলগত সুপারিশ ও উপসংহার
আন্তর্জাতিক আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদী ভাবমূর্তি স্থিতিশীল করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের অবিলম্বে কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
কৌশলগত সুপারিশ
১. অভ্যন্তরীণ সুশাসনের প্রমাণ নিশ্চিত করা: অবিলম্বে সাংবাদিকদের ওপর হামলা বন্ধ করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে স্বচ্ছ ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা । পূর্ববর্তী সরকারের দমনমূলক আইনগুলো (যেমন সন্ত্রাসবিরোধী আইন, সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স) রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার জন্য দ্রুত আইন সংস্কার করা।
২. সাংবিধানিক স্বচ্ছতা ও ট্রানজিশন রোডম্যাপ: অন্তর্বর্তী সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে চলমান বিতর্ক নিরসনে একটি সর্বদলীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অবাধ নির্বাচনের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করে দ্রুত বাস্তবায়ন শুরু করা।
৩. আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাস: ভারতের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি নিরসনে উচ্চ-পর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করা এবং ‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’ মানচিত্রের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক স্পষ্টীকরণ প্রদান করা। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
৪. জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা: জুলাই বিপ্লবের সময় এবং পূর্ববর্তী ১৫ বছরে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দ্রুত এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। নিরাপত্তা বাহিনীর সংস্কার (যেমন RAB বিলুপ্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক আহ্বান) বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া ।
উপসংহার
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্ব মঞ্চে তার ব্যক্তিগত নৈতিক ভাবমূর্তির কারণে এক বিশেষ সুবিধা নিয়ে শুরু করেছে। তবে, এই সুবিধাটি দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে। তার ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিকভাবে কোন পর্যায়ে থাকবে, তা নির্ভর করছে তার সরকার কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে দুটি পরস্পরবিরোধী শক্তিকে পরিচালনা করতে পারে—পশ্চিমা গণতন্ত্রের জন্য তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা এবং আঞ্চলিক শক্তি, বিশেষত ভারতের, নিরাপত্তা উদ্বেগগুলো নিরসন করা।
বর্তমানে, পশ্চিমা দেশগুলো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সংস্কার এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য তার সরকারকে সমর্থন করছে, যা তার ভাবমূর্তির ইতিবাচক দিক। তবে, অভ্যন্তরীণভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন, সংবাদমাধ্যম দমন এবং বিতর্কিত আঞ্চলিক কৌশলগুলি তার নৈতিক কর্তৃত্বকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ক্ষেত্রে এই দ্বন্দ্ব একটি গুরুতর সংকট তৈরি করেছে, যা নিরসন না হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রত্যাহার বা সমালোচনার দিকে ঝুঁকতে পারে। সংক্ষেপে, ড. ইউনূস সরকারের ভাবমূর্তি বর্তমানে অস্থায়ী পশ্চিমা অনুমোদন এবং তীব্র আঞ্চলিক বিরোধিতার মাঝে আবদ্ধ।
তথ্যসূত্র সমূহ
- Nobel laureate Muhammad Yunus convicted of violating Bangladesh’s labour laws, https://www.theguardian.com/world/2024/jan/01/nobel-laureate-muhammad-yunus-convicted-bangladesh 2. Yunus’ conviction a blatant abuse of justice system: Amnesty – Prothom Alo English, https://en.prothomalo.com/bangladesh/e4gd4fpbc5 3. ড. ইউনূসের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন জাতিসংঘ – Dhaka Post, https://www.dhakapost.com/international/220753 4. Readout of President Joe Biden’s Meeting with Chief Adviser Muhammad Yunus of Bangladesh – U.S. Embassy Dhaka, https://bd.usembassy.gov/readout-of-president-joe-bidens-meeting-with-presidentchief-adviser-muhammad-yunus-of-bangladesh-bn/ 5. British High Commissioner to Bangladesh calls on Honourable Chief Adviser H.E. Professor Muhammad Yunus – GOV.UK, https://www.gov.uk/government/news/british-high-commissioner-to-bangladesh-calls-on-honourable-chief-adviser-he-professor-muhammad-yunus 6. EU to send major observation team for Bangladesh election, ambassador says, https://thefinancialexpress.com.bd/national/eu-to-send-major-observation-team-for-bangladesh-election-ambassador-says 7. Press Freedom Under Siege in Bangladesh: A Report on Media Crackdown – YouTube, https://www.youtube.com/watch?v=8E0WlAQ8glE 8. Bangladesh: Press Freedom Throttled Under Dr Muhammad Yunus …, https://www.rightsrisks.org/by-country/bangladesh/bangladesh-press-freedom-throttled-under-dr-muhammad-yunus/ 9. Bangladesh: Review Laws and Protect Human Rights Standards, https://www.hrw.org/news/2025/05/21/bangladesh-review-laws-and-protect-human-rights-standards 10. Bangladesh’s Yunus faces mounting political, economic and security pressure, https://tomorrowsaffairs.com/bangladeshs-yunus-faces-mounting-political-economic-and-security-pressure 11. Top Pakistani military official meets Bangladesh’s interim govt chief Yunus, https://www.ptinews.com/story/international/top-pakistani-military-official-meets-bangladesh-s-interim-govt-chief-yunus/3037854 12. Muhammad Yunus sparks anti-India row again, gifts a map showing …, https://m.economictimes.com/news/india/muhammad-yunus-sparks-anti-india-row-again-gifts-a-map-showing-northeast-india-in-greater-bangladesh-to-pakistani-general/articleshow/124847378.cms 13. Northeast India under Bangladesh? Muhammad Yunus’ gift to Pakistan general stirs row | Today News – Mint, https://www.livemint.com/news/india/northeast-india-under-bangladesh-muhammad-yunus-gift-to-pakistan-general-stirs-row-11761572563663.html 14. জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নতুন বাংলাদেশের পথ দেখাবে: প্রধান উপদেষ্টা – SAMAKAL, https://samakal.com/bangladesh/article/322678/%E0%A6%9C%E0%A7%81%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%87-%E0%A6%B8%E0%A6%A8%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A7%9F%E0%A6%A8-%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A7%81%E0%A6%A8-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%AA%E0%A6%A5-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%96%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87:-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A7%E0%A6%BE%E0%A6%A8-%E0%A6%89%E0%A6%AA%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B7%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BE 15. EU urges Yunus government to uphold rule of law in Bangladesh – The Times of India, https://timesofindia.indiatimes.com/world/south-asia/eu-urges-yunus-government-to-uphold-rule-of-law-in-bangladesh/articleshow/116153779.cms 16. Amnesty condemns Dr Yunus conviction – Dhaka Tribune, https://www.dhakatribune.com/bangladesh/335568/amnesty-condemns-dr-yunus-conviction 17. Bangladesh v. Muhammad Yunus – Clooney Foundation for Justice, https://cfj.org/wp-content/uploads/2024/02/Bangladesh_Yunus-Preliminary-Report-March-2024-Final.pdf 18. Bangladesh interim government appointed: Foreign Secretary’s statement – GOV.UK, https://www.gov.uk/government/news/appointment-of-bangladesh-interim-government-foreign-secretary-statement 19. বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথ: জাতিসংঘে ড. ইউনূসের ভাষণ, আইনি বৈধতা এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য চাপ – নিউইয়র্ক | Prothom Alo New York, https://www.prothomalony.com/news/10990 20. Muhammad Yunus on picking up the pieces in Bangladesh after ‘monumental’ damage by Sheikh Hasina’s rule – The Guardian, https://www.theguardian.com/world/2025/mar/10/muhammad-yunus-on-picking-up-the-pieces-in-bangladesh-after-monumental-damage-by-sheikh-hasinas-rule 21. India’s northeast states a part of Bangladesh? Yunus’ controversial map gift to Pak General raises eyebrows, https://www.financialexpress.com/world-news/row-erupts-as-yunus-gifts-map-showing-indias-northeast-states-as-part-of-bangladesh-to-pak-general/4022785/ 22. Muhammad Yunus sparks controversy with controversial map on book presented to Pakistan military general – The Hindu, https://www.thehindu.com/news/international/muhammad-yunus-sparks-controversy-with-controversial-map-on-book-presented-to-pakistan-military-general/article70209826.ece 23. Bangladesh At Crossroads: Yunus’s Interim Government And The Need For Decisive Actions – OpEd – Eurasia Review, https://www.eurasiareview.com/15092025-bangladesh-at-crossroads-yunuss-interim-government-and-the-need-for-decisive-actions-oped/ 24. Bangladesh has limited time to choose between anarchy and democracy, https://www.aei.org/op-eds/bangladesh-has-limited-time-to-choose-between-anarchy-and-democracy/ 25. Bangladesh’s Interim Government Accused of Political Repression Under Amended Anti-Terrorism Law – Human Rights Research Center, https://www.humanrightsresearch.org/post/bangladesh-s-interim-government-accused-of-political-repression-under-amended-anti-terrorism-law 26. Joint Letter to Bangladesh Chief Adviser Yunus | Human Rights Watch, https://www.hrw.org/news/2025/10/19/joint-letter-to-bangladesh-chief-adviser-yunus 27. Why Is Bangladesh’s Nobel Peace Laureate Imprisoning Journalists?, https://www.aei.org/op-eds/why-is-bangladeshs-nobel-peace-laureate-imprisoning-journalists/ 28. CPJ, partners urge Bangladesh to protect press freedom ahead of 2026 polls, https://cpj.org/2025/10/cpj-partners-urge-bangladesh-to-protect-press-freedom-ahead-of-2026-polls/ 29. Keir Starmer declines to meet Dr Yunus: Financial Times report – DD News, https://ddnews.gov.in/en/keir-starmer-declines-to-meet-dr-yunus-financial-times-report/ 30. Keir Starmer declines to meet Yunus tracking down missing billions: Financial Times, https://en.prothomalo.com/bangladesh/r7mp3dh0o6 31. ড. ইউনূসের গ্রামীণ কল্যাণের বিরুদ্ধে মামলার রায় বাতিল – newsbangla, https://www.newsbangla24.com/news/236403/The-judgment-of-the-case-against-Dr-Yunus-Gramin-Kalyan-is-cancelled 32. No legal weakness found in scrapping 5 cases against CA Yunus: SC, https://www.tbsnews.net/bangladesh/court/no-legal-weakness-found-scrapping-5-cases-against-dr-yunus-sc-1040436 33. শ্রম আইন লঙ্ঘনের দায়ে ড. ইউনূসকে ৬ মাসের কারাদণ্ড | শিরোনাম | বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), https://www.bssnews.net/bangla/news-flash/120471 34. Muhammad Yunus acquitted in corruption case – Times of India, https://timesofindia.indiatimes.com/world/south-asia/muhammad-yunus-acquitted-in-corruption-case/articleshow/112449356.cms


