বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বহুমাত্রিক সংকট এবং রাষ্ট্রীয় ভঙ্গুরতার পথে : একটি একাডেমিক বিশ্লেষণপ্রতিবেদন
I. Executive Summary: Diagnosis and Prognosis (সারসংক্ষেপ: রোগনির্ণয় ও পূর্বাভাস)
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এক জটিল বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে, যা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদি শাসনতান্ত্রিক সক্ষমতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। এই সংকটকে চারটি আন্তঃসংযুক্ত মাত্রায় চিহ্নিত করা যায়: উচ্চ অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক সংহতির পতন, নির্বাচন-কেন্দ্রিক সহিংসতা এবং গুরুতর কূটনৈতিক দুর্বলতা। এই সমস্ত চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রে রয়েছে অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বৈধতা সংকট (Legitimacy Deficit) এবং ম্যান্ডেট বিচ্যুতি (Mandate Drift) ।
অর্থনৈতিক দিক থেকে, যদিও বাংলাদেশ কাঠামোগতভাবে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুত , উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং দুর্বল রাজস্ব ভিত্তির (Weak Tax Revenue) কারণে সামষ্টিক আর্থিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে । সামাজিক ক্ষেত্রে, আইন-শৃঙ্খলার গুরুতর অবনতি এবং রাজনৈতিকভাবে উস্কানিকৃত সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের কার্যকরী নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারতের সাথে সম্পর্কের অবনতি এবং চীনের দিকে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির সাথে এই প্রশাসনকে পরিচালিত হতে হচ্ছে, যা রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বে “বিপজ্জনক চোরাবালিতে” (treacherous quicksand) ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করছে ।
এই প্রেক্ষাপটে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে ভবিষ্যৎ গতিপথের পূর্বাভাস দেওয়া অপরিহার্য। যদিও বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার (State Failure) বিপদ তাৎক্ষণিক এবং সরাসরি নয় , বিশ্লেষণ ইঙ্গিত করে যে, অন্তর্বর্তী সরকার যদি অবিলম্বে তার মূল ম্যান্ডেটে (অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন) ফিরে না যায় এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না আনে, তবে সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি হলো Scenario 2: Prolonged Gridlock and Institutional Decay (দীর্ঘায়িত অচলাবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক পতন)। এই গতিপথ দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় ভঙ্গুরতাকে স্থায়ী করবে এবং কার্যকর গণতন্ত্রে উত্তরণকে বাধা দেবে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দিক হলো, সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে ব্যর্থতা এবং আঞ্চলিক অংশীদারদের (বিশেষত ভারত) সাথে কূটনৈতিক ফাটল মেরামত করতে না পারা। এই ব্যর্থতা Scenario 3: Authority Breakdown/Near-Failure (কর্তৃত্বের পতন/নিকট-ব্যর্থতা) -এর ঝুঁকিকে দ্রুত বাড়িয়ে তুলবে, যা যেকোনো বাহ্যিক অর্থনৈতিক ধাক্কা বা সমন্বিত রাজনৈতিক সহিংসতার মাধ্যমে উদ্দীপ্ত হতে পারে ।
II. Introduction: Conceptualizing the Legitimacy Deficit and Mandate Drift (পরিচিতি: বৈধতা সংকট ও ম্যান্ডেট বিচ্যুতি)
A. The Context of Transition (রূপান্তরের প্রেক্ষাপট)
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনতান্ত্রিক কর্তৃত্বের অবসান ঘটে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত । এই রূপান্তরের কাঠামো তৈরি হয়েছিল একটি অরাজনৈতিক অন্তর্বর্তী সরকারের মাধ্যমে, যার প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং বিগত সরকারের দুর্নীতি ও নিপীড়নের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা । অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায়, দেশে ও বিদেশে তাঁর প্রতি থাকা সম্মান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক বৈধতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হয়েছিল । অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের এই প্রক্রিয়াটিকে কোনো দলীয় সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং ছাত্র আন্দোলন, প্রধান রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের নেতাদের সম্মিলিত ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল, যা ‘জনগণের কল্যাণই সর্বোচ্চ আইন’ (the well-being of the people is the supreme law) এই ধারণার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ ।
B. Defining the Mandate (ম্যান্ডেটের সংজ্ঞা)
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক এবং একচেটিয়া ম্যান্ডেট হলো শান্তিপূর্ণভাবে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ তৈরি করা এবং অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা । এই ম্যান্ডেট কঠোরভাবে একটি তত্ত্বাবধায়ক বা ট্রানজিশনাল ভূমিকায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত, যাতে স্থায়ী নীতিগত পরিবর্তন আনার কোনো অবকাশ না থাকে, যা কেবল নির্বাচিত সরকারের এখতিয়ার ।
C. The Challenge of Mandate Drift (ম্যান্ডেট বিচ্যুতির চ্যালেঞ্জ)
সাম্প্রতিককালে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রমে ম্যান্ডেট বিচ্যুতির লক্ষণ দেখা দিয়েছে, যা তার বৈধতার ভিত্তি ক্ষুণ্ণ করছে।
১. স্থায়ী ভূমিকা গ্রহণের প্রবণতা: প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর (CAO) নিজেকে কেবল অন্তর্বর্তী প্রশাসন হিসেবে নয়, বরং “অফিস অফ দ্য হেড অফ দ্য গভর্নমেন্ট অফ দ্য পিপলস রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ” (Head of the Government of the People’s Republic of Bangladesh) হিসেবে আখ্যায়িত করছে, যা একটি অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক ভূমিকার চেয়ে স্থায়ী ক্ষমতার ইঙ্গিত দেয় ।
২. নীতির গভীর পরিবর্তন: অন্তর্বর্তী সরকার একাধিক মৌলিক নীতি সংস্কারে হাত দিয়েছে, যা সাধারণত নির্বাচিত সরকারের কাজ। উদাহরণস্বরূপ, তারা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (NBR) নীতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে । এই সংস্কারের লক্ষ্য হলো কর-জিডিপি অনুপাত ৭.৪% থেকে ১০% এ উন্নীত করা এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা । একই সাথে, তারা সিভিল সার্ভিসের শৃঙ্খলামূলক পদক্ষেপ ত্বরান্বিত করার জন্য জনসেবা (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ প্রণয়ন করেছে ।
বিশ্লেষণাত্মক তাৎপর্য (The Paradox of Necessary Reform): বিগত সরকারের আমলে জমে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক পচন (Institutional Decay) দূর করতে এই ধরনের গভীর কাঠামোগত সংস্কার (যেমন: NBR বিভক্তিকরণ) দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। তবে, অন্তর্বর্তী সরকারের মূল শক্তি নিহিত তার নিরপেক্ষতা এবং সীমিত ম্যান্ডেটের মধ্যে। একটি অনির্বাচিত সংস্থা যখন এমন গভীর নীতিগত সংস্কার সম্পাদন করে, তখন রাজনৈতিক বিরোধীরা এটিকে ম্যান্ডেট লঙ্ঘন হিসেবে দেখে, যা নিরপেক্ষতার নীতিকে আঘাত করে ।
এই পরিস্থিতি একটি তীব্র রাজনৈতিক দ্বৈততার সৃষ্টি করে। একদিকে, দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্য (deep reform) নিশ্চিত করা দরকার; অন্যদিকে, স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য কঠোরভাবে ম্যান্ডেট মেনে চলা উচিত। এই ম্যান্ডেট বিচ্যুতি মূল রাজনৈতিক শক্তি এবং সুশীল সমাজকে সরকারের প্রতি সন্দিহান করে তোলে, যা রূপান্তর প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ঐকমত্যকে দুর্বল করে। ফলস্বরূপ, অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা দ্রুত ক্ষয় হতে শুরু করে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সময়কালকে সংকীর্ণ করে তোলে ।
III. Analysis of Macro-Financial Stress and Economic Resilience (সামষ্টিক আর্থিক চাপ ও অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা বিশ্লেষণ)
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের সক্ষমতা (Fastest Growing Economy) এবং অভ্যন্তরীণ সামষ্টিক আর্থিক দুর্বলতার (Macro-financial Challenges) মধ্যে এক টানাপোড়েন অবস্থার সম্মুখীন। অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার একটি মূল চ্যালেঞ্জ ।
A. Acute Inflation and Social Fallout (তীব্র মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক প্রভাব)
মূল্যস্ফীতি বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য একটি প্রধান নীতিগত চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার পর থেকে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, যা ২০২৪ সালে ১০.৮ শতাংশে পৌঁছেছিল । যদিও ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা কিছুটা কমে ৯.৩ শতাংশ হয়েছে, তবে তা এখনও উচ্চ মাত্রায় রয়ে গেছে ।
এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত গভীর:
-
দারিদ্র্য বৃদ্ধি: দীর্ঘায়িত মূল্যস্ফীতি ক্রয়ক্ষমতাকে ক্ষুণ্ণ করেছে, দারিদ্র্যকে গভীর করেছে এবং আর্থ-সামাজিক দুর্বলতা বাড়িয়েছে ।
-
নতুন দরিদ্রের সৃষ্টি: সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে অনুমান করা হয় যে, মূল্যবৃদ্ধি ও মজুরি সমন্বয়ের প্রভাব বিবেচনা করলে প্রায় ৭.৯ মিলিয়ন অতিরিক্ত মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের কবলে পড়েছে। এছাড়াও, ১০ মিলিয়ন মানুষের একটি বিশাল অংশ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে (যারা দারিদ্র্যসীমার ২৫% ওপরে বাস করে) ।
-
জন-অসন্তোষ: মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান অপরাধের হার (spiking crime rates) জনসাধারণের অসন্তোষের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে ।
তুলনামূলক রাজনৈতিক অর্থনীতি থেকে দেখা যায় যে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি (যেমন ১৫% এর বেশি বার্ষিক হার) রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের জন্য একটি শক্তিশালী গুণক (multiplier) হিসেবে কাজ করে । এই অর্থনৈতিক সংকট সরকারকে দ্রুত জন-সমর্থন হারাতে বাধ্য করে।
B. Structural Weaknesses and Reform Efforts (কাঠামোগত দুর্বলতা ও সংস্কারের উদ্যোগ)
অর্থনীতি দুর্বল ট্যাক্স রাজস্ব, আর্থিক খাতের ঝুঁকি এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সামষ্টিক-আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে । দুর্বল রাজস্ব সংগ্রহ ক্ষমতা (Tax Revenue) রাষ্ট্রের কার্যকারিতা সীমিত করে।
সরকার এই কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবেলায় সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (NBR) বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে রাজস্ব নীতি বিভাগ (RPD) এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে (RMD) । এই সংস্কারের উদ্দেশ্য হলো নীতিনির্ধারক ও নীতি প্রয়োগকারীদের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত দূর করা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা উন্নত করা এবং করের ভিত্তি প্রসারিত করা । এই উদ্যোগগুলো OECD দেশগুলোর সর্বোত্তম অনুশীলনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
C. LDC Graduation Risks and Structural Resilience (স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের ঝুঁকি ও কাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতা)
২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) মর্যাদা থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণ বহিরাগত চ্যালেঞ্জগুলির একটি নতুন সেট উপস্থাপন করে । এই রূপান্তর শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারানোর ঝুঁকি সৃষ্টি করবে এবং কমপ্লায়েন্স খরচ বাড়াবে, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে । এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কৌশলগত পরিকল্পনার জরুরি প্রয়োজন রয়েছে।
তবে, বাংলাদেশের কাঠামোগত তথ্য একটি অন্তর্নিহিত দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিস্থাপকতা নির্দেশ করে:
-
মানব সম্পদ সূচক (HAI): বাংলাদেশের HAI স্কোর ক্রমাগত বেড়ে ৭৯.৮ এ পৌঁছেছে, যা LDC উত্তরণের থ্রেশহোল্ড (৬৬) থেকে অনেক উপরে ।
-
অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ভঙ্গুরতা সূচক (EVI): EVI স্কোর ২২.১৩, যা থ্রেশহোল্ড (৩২) এর নিচে, স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয় ।
-
উৎপাদনশীল সক্ষমতা সূচক (PCI): এটি ধীরে ধীরে বেড়ে ৪০.৭ এ স্থিতিশীল রয়েছে ।
বিশ্লেষণাত্মক সংযোজন (Political Instability as an Impediment to Resilience): বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং কাঠামোগত স্থিতিস্থাপকতা থাকা সত্ত্বেও (যেমন উচ্চ HAI এবং কম EVI), চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা এই সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে দিচ্ছে না। নির্বাচনের অনিশ্চয়তা, সহিংসতা এবং রাজনৈতিক ধর্মঘট (hartals) অর্থনৈতিক কার্যকলাপ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে । এই রাজনৈতিক সংকটই উচ্চ মূল্যস্ফীতি মোকাবেলা এবং LDC উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার (যেমন রাজস্ব বৃদ্ধি) বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটাচ্ছে। এর ফলে, রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক সক্ষমতা বর্তমানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জালে আটকা পড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্থবিরতা বা stagflation-এর ঝুঁকি সৃষ্টি করছে । এই পরিপ্রেক্ষিতে, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য রাজনৈতিক উত্তরণকে (নির্বাচন) কার্যকর অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নের প্রাথমিক পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা অপরিহার্য।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক এবং স্থিতিস্থাপকতা ম্যাট্রিক্স নিম্নরূপ:
Table 1: Key Macroeconomic Indicators and State Resilience Metrics (2024-2026 Forecast)
| সূচক (Indicator) | একক (Unit) | ২০২৪ (বাস্তব/প্রাক্কলিত) | ২০২৫ (প্রাক্কলিত) | বিশ্লেষণাত্মক মন্তব্য |
| মূল্যস্ফীতি (Inflation) | শতাংশ (%) | ১০.২ – ১০.৮ | ৮.৫ |
সামাজিক অসন্তোষের প্রধান কারণ, স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও উচ্চ |
| কর-থেকে-জিডিপি অনুপাত (Tax-to-GDP Ratio) | শতাংশ (%) | ৭.৪ |
লক্ষ্যমাত্রা ১০.০ |
কাঠামোগত দুর্বলতা, যা রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে সীমিত করে |
| মানব সম্পদ সূচক (HAI) | স্কোর | ৭৭.৮ |
৭৯.৮ |
LDC উত্তরণের জন্য উচ্চ কাঠামোগত সক্ষমতা |
| অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক (EVI) | স্কোর | ২২.১৩ | ২২.১৩ |
LDC উত্তরণের থ্রেশহোল্ডের নিচে (৩২), ঝুঁকি কম |
IV. Breakdown of Social Cohesion and State Authority (সামাজিক সংহতি ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের পতন)
রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখা। অভ্যুত্থানের পর যে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের (State Authority) কার্যকরী প্রয়োগকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
A. The Security Vacuum and Crisis of Public Order (নিরাপত্তা শূন্যতা ও জনশৃঙ্খলার সংকট)
আইন-শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য প্রাথমিক উদ্বেগের বিষয় । জুলাই মাসের সংঘর্ষের পরে পুলিশ বাহিনীর মনোবলে চরম আঘাত হেনেছে, যার ফলে একটি গুরুতর নিরাপত্তা শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে । এই শূন্যতা উগ্রবাদী এবং অন্যান্য অ-রাষ্ট্রীয় অভিনেতাদের দ্বারা শোষিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার সেনাবাহিনীকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে মোতায়েন করেছে। যদিও এটি আইন-শৃঙ্খলা ফেরাতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা, তবে বিশ্লেষণে এটিকে “অবাঞ্ছনীয়” (inadvisable) হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সামরিক বাহিনীকে দীর্ঘকাল ধরে নাগরিক দায়িত্বে রাখা সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব দুর্বল করে, দুর্নীতি বাড়ায় এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ঝুঁকি তৈরি করে ।
এই দুর্বলতাগুলো প্রকাশ্যে এসেছে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের মতো গোষ্ঠীগুলোর প্রকাশ্য জনসভা করার প্রচেষ্টার মাধ্যমে, যা “দুর্বল গোয়েন্দা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার” ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয় । যখন একটি রাষ্ট্র কার্যকরভাবে তার অঞ্চলের ওপর নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারে না, তখন আঞ্চলিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকে ।
B. Communal Tensions and Political Weaponization (সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও রাজনৈতিক অস্ত্রায়ন)
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে “নতুন বাংলাদেশে” ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের (বিশেষত হিন্দুরা, যারা জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ) বিরুদ্ধে সহিংসতা বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে । অভিযোগ রয়েছে যে সরকার ইসলামপন্থী শক্তিগুলোর প্রভাবকে উপেক্ষা করছে বা উৎসাহিত করছে ।
অভিযোগের উৎস ও বাস্তবতা: এই ধরনের অভিযোগ প্রধানত সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং ভারতের পক্ষ থেকে এসেছে, যারা এই রূপান্তরকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে । যদিও হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রথম কয়েক দিনে হামলা হয়েছিল (যখন পুলিশ তাদের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছিল), তবে বিশ্লেষণে দেখা যায় যে অধিকাংশ শিকার তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য নয়, বরং পূর্ববর্তী সরকারের সাথে তাদের কথিত সম্পর্কের কারণে লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল । সমালোচকরা দাবি করেন যে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরোধীরা এই সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
এই সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার রাজনৈতিক ব্যবহার ট্রানজিশন প্রক্রিয়াকে অস্থিতিশীল করে তোলে, বিশেষ করে যখন সমালোচকরা দাবি করে যে বাংলাদেশ “তালেবান-নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের মতো বিশৃঙ্খলার” দিকে ঝুঁকছে । এই ধরনের বিবৃতি আন্তর্জাতিক সমর্থনকে দুর্বল করার জন্য তৈরি করা হয়েছে।
C. Political Fragmentation and Historical Violence (রাজনৈতিক বিভাজন ও ঐতিহাসিক সহিংসতা)
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ঐতিহাসিকভাবেই সংঘাতপূর্ণ এবং সহিংস । আওয়ামী লীগ (AL) এবং বিএনপি (BNP) দ্বারা আবর্তিত শাসন ব্যবস্থার ইতিহাস দলীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, যা দুর্নীতি এবং নির্বাচনী কারচুপির জন্ম দিয়েছে, জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ করেছে । অতীতে, রাজনৈতিক বিরোধগুলি hartals (রাজনৈতিক ধর্মঘট) এর মাধ্যমে ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং সহিংসতা সৃষ্টি করেছে । ছোট প্রতিষ্ঠানগুলি এই ধর্মঘটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কারণ তারা স্বল্প মেয়াদে খরচ কমাতে পারে না ।
বর্তমানে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ঐক্যবদ্ধ নেতার অভাবে বিশৃঙ্খল অবস্থায় রয়েছে । অন্যদিকে, সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের কর্মীদের উপর হামলা এবং দলের প্রতীক ধ্বংস করার মাধ্যমে তাদেরকে কোণঠাসা করা হয়েছে । এই রাজনৈতিক বিভাজন ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি নির্বাচন-কেন্দ্রিক সহিংসতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।
গভীর বিশ্লেষণ (Erosion of Institutional Monopolies): একটি কার্যকরী রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য হলো বলপ্রয়োগের ওপর একক কর্তৃত্ব (Monopoly on Force) বজায় রাখা এবং নাগরিকদের জন্য মৌলিক নিরাপত্তা প্রদান করা । বর্তমান পরিস্থিতিতে পুলিশের মনোবল ভেঙ্গে যাওয়া , সামরিক বাহিনীর উপর নির্ভরতা এবং অ-রাষ্ট্রীয় অভিনেতাদের (Non-state Actors) ক্ষমতা বৃদ্ধি — এই সবই সম্মিলিতভাবে বেসামরিক রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের গুরুতর কার্যকরী পতনকে নির্দেশ করে। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, তখন সেই শূন্যতা পূরণ হয় চরমপন্থী বা স্ব-আরোপিত গোষ্ঠীর মাধ্যমে । এই প্রাতিষ্ঠানিক পচন যদি অবিলম্বে একটি বৈধ, নির্বাচিত সরকার দ্বারা মেরামত না করা হয়, তবে এটি নিরাপত্তা শূন্যতাকে স্থায়ী করবে, যা রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার ঝুঁকির সবচেয়ে শক্তিশালী ভবিষ্যদ্বাণীগুলির মধ্যে একটি।
Table 2: Vectors of Political and Social Fragility
| ভঙ্গুরতার মাত্রা (Fragility Vector) | প্রাসঙ্গিক তথ্য (Data Points) | দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব (Long-Term Impact) |
| কর্তৃত্বের পতন (Authority Breakdown) |
সামরিক বাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা বৃদ্ধি , পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়া |
বেসামরিক শাসন কাঠামো দুর্বল হওয়া, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বৃদ্ধি |
| সামাজিক সংহতি পতন (Social Cohesion Decline) |
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা, অভিযোগের রাজনৈতিক অস্ত্রায়ন |
আন্তর্জাতিক বৈধতা ক্ষুণ্ণ হওয়া, সমাজে বিভেদ স্থায়ী হওয়া |
| রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা (Political Instability) |
Hartals এবং রাজনৈতিক বিক্ষোভের ইতিহাস |
জিডিপি ক্ষতি, বিনিয়োগে বাধা, নির্বাচনের পূর্বে সহিংসতা বৃদ্ধি |
| উগ্রবাদী প্রভাব (Extremist Influence) |
নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রকাশ্য তৎপরতা |
নিরাপত্তা শূন্যতা পূরণ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি |
V. Geopolitical Reorientation and Diplomatic Fragility (ভূ-রাজনৈতিক পুনঃবিন্যাস ও কূটনৈতিক ভঙ্গুরতা)
অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটকে আরও তীব্র করছে। অনির্বাচিত সরকারের দ্বারা পররাষ্ট্র নীতির মৌলিক পরিবর্তন দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে তুলেছে।
A. Strategic Fracture with India (ভারতের সাথে কৌশলগত ফাটল)
সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক সমর্থক ছিল ভারত। রূপান্তরের পর থেকে ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘চাপযুক্ত’ এবং ‘সংঘাতমূলক’ হয়ে উঠেছে । এই পটপরিবর্তনের অন্যতম কারণ হলো অভ্যুত্থানের পর থেকে ক্রমবর্ধমান ভারত-বিরোধী মনোভাব । ভারত সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে এবং সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে নিয়মিত সমালোচনা করেছে, যা সম্পর্ককে আরও তিক্ত করেছে ।
অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব উপেক্ষা করে ‘সংঘাতের পথ’ বেছে নিয়েছে বলে মনে করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, প্রধান উপদেষ্টা চীন সফরকালে চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে উৎপাদন করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (North East) সরবরাহের আহ্বান জানান, যা অঞ্চলটিকে ‘স্থলবেষ্টিত’ (landlocked) হিসেবে অভিহিত করে । এই মন্তব্যের সরাসরি প্রতিক্রিয়ায় ভারত তার সীমান্ত দিয়ে তৃতীয় দেশের জন্য বাংলাদেশের রপ্তানি কার্গোর ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করে দিয়েছে। এই ভারতীয় পদক্ষেপ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে আঘাত করতে পারে ।
এই গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অংশীদারের সমর্থন হারানো আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং বাণিজ্যকে ঝুঁকিতে ফেলে, যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
B. The China Tilt and the Geopolitical Quick-Sand (চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া ও ভূ-রাজনৈতিক চোরাবালি)
অন্তর্বর্তী সরকার চীন ও পাকিস্তানের সাথে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকছে । চীনের জন্য, বাংলাদেশ তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এবং ‘মুক্তার মালা’ (String of Pearls) উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা ভারতের পেছনের উঠোনে একটি কৌশলগত অবস্থান তৈরি করে ।
এই কূটনৈতিক কৌশলগত ভারসাম্যহীনতা বাংলাদেশকে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত করার ঝুঁকি সৃষ্টি করে, যা “বিপজ্জনক চোরাবালি” হিসেবে বিবেচিত ।
গভীর বিশ্লেষণ (Geopolitical Risk Acceleration through Mandate Overreach): পররাষ্ট্র নীতির মৌলিক পরিবর্তন (যেমন, ভারতের সাথে বাণিজ্য নিয়ে সরাসরি সংঘাত বা চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা ) সার্বভৌম ক্ষমতার স্থায়ী কাজ। যখন একটি অনির্বাচিত, বৈধতা সংকটে থাকা প্রশাসন এই ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তখন রাষ্ট্রটি সর্বোচ্চ বাহ্যিক চাপ এবং হস্তক্ষেপের ঝুঁকিতে পড়ে। বহিরাগত অভিনেতারা (ভারত, চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) দুর্বল রাষ্ট্রকে প্রতিযোগী শক্তিগুলির প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে দেখে। এই কূটনৈতিক ভারসাম্যের অভাব দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তা এবং সরকারের স্থিতিশীলতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে । দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশকে অবশ্যই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন (Strategic Autonomy) বজায় রাখতে হবে, যাতে কোনো একটি পরাশক্তির চাপে না পড়ে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায় ।
C. International Accountability and Western Pressure (আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা ও পশ্চিমা চাপ)
আন্তর্জাতিক মহলে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জাতিসংঘ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে প্রাক্তন সরকারের আমলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে এবং নিরাপত্তা খাত সংস্কারের আহ্বান জানানো হয়েছে । জাতিসংঘ এই সময়ের (১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট) সমস্ত ঘটনা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) রেফার করার বিষয়টি বিবেচনা করার সুপারিশ করেছে ।
এই আন্তর্জাতিক চাপ অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ উভয়ই। একদিকে, এটি পূর্ববর্তী সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করে, যা রূপান্তরের জন্য জনসমর্থন ধরে রাখে। অন্যদিকে, এই সরকারকে অবশ্যই জাতিসংঘের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে সুষ্ঠু বিচারের নিশ্চয়তা এবং কঠোর আইন বাতিল করা । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় আগ্রহী এবং তাদের অব্যাহত অংশগ্রহণ দেশের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) সংস্কার এবং সংখ্যালঘু অধিকার সুরক্ষার শর্তে অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তার জন্য উৎসাহিত করেছে ।
Table 3: Geopolitical Risk Matrix: Strategic Alignment under the Interim Government
| অংশীদার (Partner) | সম্পর্কের অবস্থা (Status) | কৌশলগত ঝুঁকি (Strategic Risk) | প্রভাব (Impact) |
| ভারত |
সংঘাতমূলক এবং দুর্বল |
আঞ্চলিক সহযোগিতা হ্রাস, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (ট্রানশিপমেন্ট) |
আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নতা, অভ্যন্তরীণ সামরিক অস্থিরতা (পারস্পরিক অবিশ্বাস) |
| চীন |
উষ্ণায়নের প্রবণতা |
ঋণ ফাঁদের ঝুঁকি (Debt Leverage), ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হওয়া |
ভূ-রাজনৈতিক চাপ বৃদ্ধি, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন হারানো |
| মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র/ইউরোপীয় ইউনিয়ন |
শর্তাধীন সমর্থন (Conditional Support) |
মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের শর্ত পূরণে ব্যর্থতা হলে অর্থনৈতিক সহায়তার ঝুঁকি | অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সংস্কার কার্যকারিতার ওপর সরাসরি প্রভাব |
VI. Comparative Analysis: Lessons from Failed Transitions (তুলনামূলক বিশ্লেষণ: ব্যর্থ রূপান্তর থেকে শিক্ষা)
বাংলাদেশের বর্তমান রূপান্তর প্রক্রিয়া তুলনামূলক রাজনীতির ক্ষেত্রে বিরল নয়, যেখানে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার বহুমাত্রিক সংকটের মুখে ক্ষমতা ধরে রাখতে বা শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে ব্যর্থ হয়।
A. Transitional Failure Mechanisms (রূপান্তর ব্যর্থতার প্রক্রিয়া)
অন্তর্বর্তী সরকারগুলি ব্যর্থ হওয়ার বেশ কয়েকটি সাধারণ প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রথমত, যদি তারা দলীয় সংঘাত পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তবে রূপান্তর প্রক্রিয়া স্থায়ীভাবে অচলাবস্থায় পড়ে । বাংলাদেশের ইতিহাসে শূন্য-সমষ্টির রাজনীতি (zero-sum politics), যেখানে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি পালাক্রমে ক্ষমতায় এসে দলীয় আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তা এই উচ্চ ঝুঁকির পূর্বসূচক হিসেবে কাজ করে ।
দ্বিতীয়ত, যদি অর্থনৈতিক সংকট (যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ঋণ) রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সাথে একত্রিত হয়, তবে রূপান্তর ব্যর্থ হয় । যদিও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট সবসময় সরাসরি শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন ঘটায় না , তবে উদীয়মান অর্থনীতিগুলি (emerging economies) আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ধাক্কার প্রতি বিশেষভাবে দুর্বল । অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ (যেমন দুর্বল মুদ্রা, ঋণ) এই ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।
B. Crisis and Power Recentralization (সংকট এবং ক্ষমতার পুনঃকেন্দ্রিকতা)
তুলনামূলক রাজনৈতিক ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, যখন কোনো দেশে একাধিক সংকট (যেমন মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ) দেখা দেয়, তখন অনির্বাচিত সংস্থাগুলোর অধীনে আর্থিক এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা পুনঃকেন্দ্রিক হওয়ার প্রবণতা দেখা যায় । একটি সংকটকালীন সময়ে, কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় সরকারগুলোর ক্ষমতা কমাতে পারে ।
বিশ্লেষণাত্মক সংযোজন: বাংলাদেশে সামরিক বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে দীর্ঘ সময় মোতায়েন রাখা হলো এই ক্ষমতা পুনঃকেন্দ্রিকতার একটি বাস্তব উদাহরণ। যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়, তবে এই সামরিক বা নিরাপত্তা-কেন্দ্রিক কাঠামোটি একটি স্থায়ী কর্তৃত্ববাদী গঠনে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা গণতান্ত্রিক একত্রীকরণকে বাধা দেবে। অনির্বাচিত সরকার এবং অ-গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখে প্রায়শই আক্রমণাত্মক এবং রক্ষণশীল নীতি গ্রহণ করে ।
C. The Risk of Authoritarian Enclavement (কর্তৃত্ববাদী ঘেরাও-এর ঝুঁকি)
সুদান এবং আফগানিস্তানের মতো রূপান্তর ব্যর্থতার তুলনামূলক উদাহরণগুলি দেখায় যে যখন একটি গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয় বা স্থবির হয়ে পড়ে, তখন রাজনৈতিক শূন্যতা নিরাপত্তা অভিজাত বা দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক দলগুলির দ্বারা পূরণ হয় ।
বাংলাদেশেও সেই ঝুঁকি বিদ্যমান। অন্তর্বর্তী সরকার যদি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থ হয় এবং সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে (যেমন সামরিক বাহিনীর মধ্যে অভ্যুত্থানের অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ) তবে ক্ষমতা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে না গিয়ে নিরাপত্তা বলয়ের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই “কর্তৃত্ববাদী ঘেরাও” গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনে স্থায়ীভাবে বাধা দিতে পারে ।
VII. Consequence Mapping: Trajectories toward State Fragility (ফলাফল ম্যাপিং: রাষ্ট্রীয় ভঙ্গুরতার পথে গতিপথ)
বাংলাদেশের বর্তমান বহুমাত্রিক সংকটের মুখে রাষ্ট্রীয় পরিণতি নির্ধারণের জন্য, বিভিন্ন সম্ভাব্য গতিপথের (Scenarios) বিশ্লেষণ প্রয়োজন, যা রাষ্ট্রীয় ভঙ্গুরতা সূচকের (Fragile State Index – FSI) ওপর ভিত্তি করে তৈরি। FSI স্কোর ০ থেকে ১২০ এর মধ্যে থাকে, এবং বাংলাদেশের স্কোর ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ (২০০৭-২০২৪ এর মধ্যে গড় ৯১.০১) । একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র (Failed State) বলতে বোঝায় যে রাষ্ট্র তার মৌলিক নিরাপত্তা এবং উন্নয়নমূলক কার্যাবলী পূরণ করার সক্ষমতা হারিয়েছে এবং তার অঞ্চল ও সীমানার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই ।
A. Conceptualizing State Fragility and Near-Failure (রাষ্ট্রীয় ভঙ্গুরতা এবং নিকট-ব্যর্থতার ধারণা)
যদিও একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা (যেমন সোমালিয়া বা সিরিয়া) বর্তমানে “অসম্ভাব্য” , চলমান বহু-সংকট রাষ্ট্রকে “ব্যর্থতার কাছাকাছি” (Near-Failure) অবস্থার দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই অবস্থায় রাষ্ট্র দুর্বল হতে থাকে এবং তার সীমানার বাইরে অস্থিতিশীলতা ছড়িয়ে দেয় । অন্তর্বর্তী প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে (আইন-শৃঙ্খলা, ভারত সম্পর্ক) ব্যর্থতা ভবিষ্যতের জন্য খারাপ লক্ষণ ।
B. Scenario 1: Stabilization through Elections (Low Probability) – (নির্বাচনের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা: নিম্ন সম্ভাবনা)
এই গতিপথের সাফল্যের সংজ্ঞা হলো: অন্তর্বর্তী সরকার সময়মতো, শান্তিপূর্ণ এবং ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়। নবনির্বাচিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথে আমলাতান্ত্রিক শৃঙ্খলা এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করে ।
-
পূর্বশর্ত: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য, সামরিক হস্তক্ষেপের অনুপস্থিতি, এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার স্থিতিশীলতা।
-
বাস্তবতার সাথে সংঘর্ষ: বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর চরম মেরুকরণ এই দৃশ্যকল্পের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দিয়েছে।
C. Scenario 2: Prolonged Gridlock and Institutional Decay (Most Probable Trajectory) – (দীর্ঘায়িত অচলাবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক পতন: সবচেয়ে সম্ভাব্য গতিপথ)
এই গতিপথটি হলো বর্তমান প্রবণতার যৌক্তিক সম্প্রসারণ। অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনের তফসিল চূড়ান্ত করতে ব্যর্থ হয় অথবা নির্বাচন হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপক বয়কট ও সহিংসতার কারণে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
-
কার্যকারণ:
-
নির্বাচনী অচলাবস্থা: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশ্বাসের অভাবের কারণে নির্বাচন বয়কট বা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
-
দীর্ঘায়িত অস্থিরতা: রাজনৈতিক দলগুলো কর্তৃক অব্যাহত hartals এবং সহিংস আন্দোলন (যেমনটি ১৯৯৬ সালের আগে দেখা গিয়েছিল ), যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে অসম্ভব করে তোলে ।
-
সামরিক ও বেসামরিক কর্তৃপক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন: অন্তর্বর্তী সরকার তার বৈধতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হলে, বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা নষ্ট হয় ।
-
-
পরিণতি: দীর্ঘস্থায়ী উচ্চমাত্রার ভঙ্গুরতা। শাসনের ব্যর্থতা, উচ্চ অপরাধের হার, দুর্নীতি স্থায়ীভাবে গেড়ে বসা এবং বৈশ্বিক সুনাম কমে যাওয়া। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যায় এবং দেশ LDC উত্তরণের ধাক্কা সামলাতে ব্যর্থ হয়। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে না গেলেও, কার্যকরী শাসন ক্ষমতা হারায় (institutional decay) ।
D. Scenario 3: Authority Breakdown/Near-Failure (High-Impact Risk) – (কর্তৃত্বের পতন/নিকট-ব্যর্থতা: উচ্চ প্রভাবের ঝুঁকি)
এটি হলো সবচেয়ে গুরুতর এবং উচ্চ-প্রভাবের ঝুঁকি। এই গতিপথ হঠাৎ করেই ত্বরান্বিত হয়, যা একটি আকস্মিক ধাক্কার (Shock) মাধ্যমে শুরু হতে পারে।
-
কার্যকারণ:
-
সামরিক-বেসামরিক ফাটল: সামরিক বাহিনীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বা অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টার মতো ঘটনা, যা বেসামরিক সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় ।
-
ভূ-রাজনৈতিক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা: ভারতের ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা বাতিলের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংকোচন বৃদ্ধি, বা চীনের ঋণের ফাঁদ থেকে সৃষ্ট আর্থিক পতন।
-
সমন্বিত ব্যাপক সহিংসতা: নির্বাচনের ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক, সমন্বিত রাজনৈতিক সহিংসতা।
-
-
পরিণতি: রাষ্ট্র কার্যকরভাবে তার অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারায়, বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির সংলগ্ন বা সীমান্তবর্তী এলাকায় । জনগণের জন্য অপরিহার্য জনসেবা প্রদানে রাষ্ট্র সম্পূর্ণরূপে অক্ষম হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশ আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার উৎস হয়ে উঠতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে । এটি হলো পূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নিকটবর্তী বিন্দু।
VIII. Policy Recommendations for State Resilience (রাষ্ট্রীয় স্থিতিস্থাপকতার জন্য নীতিগত সুপারিশ)
অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং সংকটময় এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে অবশ্যই তার কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলি পুনর্বিন্যাস করতে হবে এবং দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।
A. Prioritizing Transitional Mandate Fidelity and Accountability (রূপান্তরের ম্যান্ডেট এবং জবাবদিহিতার প্রতি অগ্রাধিকার)
১. কঠোরভাবে নির্বাচনী সময়সূচি অনুসরণ: অন্তর্বর্তী প্রশাসনের প্রধান কাজ হলো শান্তিপূর্ণ ও সময়মতো নির্বাচন নিশ্চিত করা। নির্বাচনকালীন সময়ে কঠোরভাবে ম্যান্ডেট মেনে চলতে হবে এবং স্থায়ী নীতিগত পরিবর্তন আনার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। এই ম্যান্ডেট ফিডেলিটি (Mandate Fidelity) রাজনৈতিক বৈধতা পুনরুদ্ধারের মূল ভিত্তি।
২. আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে বিচারিক সংস্কার: জাতিসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং ন্যায্য বিচারের নিশ্চয়তা (guarantees of fair trial) নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক। প্রাক্তন সরকারের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে প্রক্রিয়াগত ত্রুটি পরিহার করতে হবে। এই ধরনের সংস্কার পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থন ধরে রাখতে সাহায্য করবে ।
B. Re-establishing Civilian State Authority (বেসামরিক রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা)
১. সামরিক বাহিনীর ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রত্যাহার: রাজনৈতিক ঝুঁকি কমাতে এবং সামরিক বাহিনীর পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে অবিলম্বে সামরিক কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রত্যাহার করা উচিত । নিরাপত্তা বাহিনীকে বেসামরিক নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনা এবং তাদের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।
২. নিরাপত্তা খাত সংস্কার ও জনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার: পুলিশ বাহিনীর মনোবল পুনরুদ্ধার এবং নিরাপত্তা খাতে সংস্কার প্রয়োজন, যাতে তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছাড়া জনশৃঙ্খলার দায়িত্ব পালন করতে পারে । একটি নির্বাচিত সরকার যা তৃণমূলের সমর্থন নিয়ে আসে, তারাই কেবল জন-আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে সচল করতে পারে ।
C. Strategic Diplomatic Recalibration (কৌশলগত কূটনৈতিক পুনর্বিন্যাস)
১. ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ: ভারতের সাথে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চ-পর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য ট্রানশিপমেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বিষয়গুলি স্বাভাবিক করতে হবে। ভারতকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে ।
২. চীনের সাথে সতর্ক সম্পর্ক: চীনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, তবে ঋণের ঝুঁকি (debt leverage) এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝুঁকি এড়াতে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা আবশ্যক । অবকাঠামো প্রকল্পে স্বচ্ছতা এবং ঋণের টেকসইতা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রোটোকল গ্রহণ করা উচিত।
D. Economic Shock Mitigation (অর্থনৈতিক ধাক্কা প্রশমন)
১. রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি: রাজস্ব সংগ্রহ ক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর জন্য NBR-কে বিভক্ত করার মতো সংস্কারগুলি (Revenue Policy Division এবং Revenue Management Division) ত্বরান্বিত করতে হবে । এই সংস্কারগুলি বাস্তবায়নে গতি আনা প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্রীয় আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং আইএমএফ (IMF) এর চাহিদা পূরণে সহায়তা হয় ।
২. সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ: উচ্চ মূল্যস্ফীতির শিকার হওয়া নতুন দরিদ্র এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্য সুনির্দিষ্ট, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমের আওতা বাড়ানো আবশ্যক। এতে প্রায় ৭.৯ মিলিয়ন নতুন দরিদ্র এবং ১০ মিলিয়ন ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা যেতে পারে । এই ব্যবস্থা সামাজিক অস্থিরতা প্রশমিত করতে সহায়ক।
তথ্যসূত্র :

