বাংলাদেশ কি বর্বর যুগে অগ্রসর হচ্ছে ? নতুন বাংলাদেশে আইনের শাসন বনাম মব জাস্টিসের উত্থান: ময়মনসিংহের ভালুকা হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও রাষ্ট্রীয় গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার ভালুকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী একজন পোশাক শ্রমিককে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে দলবদ্ধ হয়ে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় ‘ধর্ম অবমাননার’ কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব।

পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস হত্যাকাণ্ডের সময়রেখা ও ঘটনাক্রমসময় (আনুমানিক)ঘটনার বিবরণসংশ্লিষ্ট পক্ষবিকেল ৪:৩০কারখানার ভেতরে দীপুর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়ানো হয়।শ্রমিক ও অভ্যন্তরীণ কুচক্রী মহল 10বিকেল ৫:০০শ্রমিকরা দীপুর বরখাস্তের দাবি জানিয়ে কাজ বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করে।উত্তেজিত শ্রমিকরা 12সন্ধ্যা ৭:০০কারখানার বাইরে স্থানীয় বাসিন্দারা জড়ো হতে শুরু করে এবং গেট ভাঙার চেষ্টা করে।বহিরাগত মব ও স্থানীয় জনতা 11রাত ৮:০০ফ্লোর ইনচার্জ দীপুকে ইস্তফাপত্রে সই করিয়ে কারখানার বাইরে বের করে দেন।কারখানা কর্তৃপক্ষ ও ইনচার্জগণ 10রাত ৮:৪৫জনতা দীপুকে ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে এবং মহাসড়কে নিয়ে যায়।উত্তেজিত মব 12রাত ৯:০০দীপুর মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।মব ও উগ্রপন্থী উপাদান 7রাত ১০:৪৫পুলিশ ও সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং দেহ উদ্ধার করে।আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেনাবাহিনী 7এই নৃশংসতা কেবল একটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়নি, বরং এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা কতটা তলানিতে পৌঁছেছে। দীপুর পরিবারের দাবি, তিনি একজন উচ্চশিক্ষিত এবং সচেতন মানুষ ছিলেন এবং পদোন্নতি নিয়ে সহকর্মীদের সাথে বিরোধের জেরেই তাকে এই মিথ্যা অপবাদে জীবন দিতে হয়েছে ।
মব জাস্টিস’ বা মব-নিয়ন্ত্রিত বিচারব্যবস্থা এক নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে । দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয়, বরং এটি একটি অকার্যকর আইনি কাঠামোর মধ্যে বেড়ে ওঠা সামাজিক অসহিষ্ণুতা এবং গুজব-নির্ভর সহিংসতার বহিঃপ্রকাশ । র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ‘ধর্ম অবমাননার’ কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ না পাওয়া গেলেও, একদল উত্তেজিত মানুষের জিঘাংসা কীভাবে একজন নিরীহ শ্রমিককে জীবন্ত পুড়িয়ে মারতে পারে, তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ করছে বাংলাদেশের সভ্য রাষ্ট্র হিসেবে অগ্রযাত্রাকে । এই প্রতিবেদনটি ভালুকা হত্যাকাণ্ডের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি, আইনের শাসনের সংকট এবং সামাজিক পরিবর্তনের জটিল দিকগুলো উন্মোচন করার প্রয়াস রাখবে।
ভালুকা হত্যাকাণ্ড: গুজব থেকে নৃশংসতার পূর্ণাঙ্গ চিত্র
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় অবস্থিত পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানায় যা ঘটেছিল, তা ছিল এক পরিকল্পিত উন্মাদনার চরম পর্যায় । দীপু চন্দ্র দাস (২৭), যিনি ওই কারখানায় গত তিন বছর ধরে কর্মরত ছিলেন এবং সম্প্রতি পদোন্নতির প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন, তাকে লক্ষ্য করে এক সুদূরপ্রসারী গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় । অভিযোগ তোলা হয় যে, তিনি ইসলাম ধর্ম এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন । তবে পরবর্তীতে র্যাব-১৪-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নাইমূল হাসান সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে জানান যে, দীপু কী বলেছিলেন বা কোথায় বলেছিলেন, তার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ বা সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যায়নি ।
র্যাব-১৪-এর তদন্তে উঠে এসেছে যে, কারখানা কর্তৃপক্ষ দীপুকে নিরাপত্তা দেওয়ার বদলে তাকে উত্তেজিত জনতার কাছে সমর্পণ করেছে । কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ আলমগীর হোসেন এবং কোয়ালিটি ইনচার্জ মিরাজ হোসেন আকনসহ মোট ১২ জনকে এ ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে । র্যাবের মতে, ধর্ম অবমাননার বিষয়টি ছিল অস্পষ্ট এবং এটি হয়তো ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে উদ্ভূত একটি ছক ছিল ।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা
বর্তমান পরিস্থিতিতে কিছু উদ্বেগজনক লক্ষণ স্পষ্ট:
আইনের শাসনের অবক্ষয়
বিচারহীনতা, নির্বাচনী সহিংসতা, “মব জাস্টিস”-এর প্রবণতা
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার রাজনৈতিক ব্যবহার
বুদ্ধিবৃত্তিক ও মতপ্রকাশের সংকট
সাংবাদিক, শিক্ষক, বিশ্লেষকদের কণ্ঠ রুদ্ধ করা
সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করা
নৈতিক রাজনীতির পতন
আদর্শের বদলে প্রতিশোধ ও দখলদারিত্ব
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতার অভাব
সামাজিক কাঠামোর ভাঙন
সহিংস ভাষা, ঘৃণার রাজনীতি
নাগরিকত্বের বদলে দলীয় পরিচয় প্রধান হয়ে ওঠা
বাংলাদেশ একটি “প্রি-বার্বারিক ট্রানজিশন” বা সভ্যতা–পিছু হটার ঝুঁকিপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে।
এই পর্যায়ে দেশ হয়—
গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের দিকে যাবে,
অথবা
শক্তিনির্ভর, সহিংস ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হবে
বাংলাদেশ বর্বর যুগে “প্রবেশ করেছে” কিনা—এ প্রশ্নের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো:
আমরা কি এখনো সেই পথে যাত্রা থামানোর রাজনৈতিক ও নৈতিক সক্ষমতা ধরে রেখেছি?
বাংলাদেশ এখনো সেই পথে যাত্রা থামানোর রাজনৈতিক ও নৈতিক সক্ষমতা পুরোপুরি হারায়নি,
কিন্তু সেই সক্ষমতা দ্রুত ক্ষয়মান—এবং সময়সীমা খুব সীমিত।
নিচে বিষয়টি স্পষ্টভাবে ভেঙে বলা হলো।
১. রাজনৈতিক সক্ষমতা: আছে, কিন্তু বিভক্ত ও দুর্বল
কেন এখনো আছে?
রাজনৈতিক সমাজ পুরোপুরি বিলুপ্ত নয়—বিরোধী দল, ভিন্নমত, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখনো টিকে আছে
ক্ষমতার কেন্দ্র একক নয়—রাষ্ট্র, দল, প্রশাসন, নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে টানাপোড়েন রয়েছে
ইতিহাসগত নজির—বাংলাদেশ অতীতেও গভীর সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে
কেন দুর্বল?
রাজনীতি নীতিনির্ভর নয়, প্রতিশোধনির্ভর
নির্বাচনকে সমাধানের বদলে সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে
নেতৃত্বে নৈতিক কল্পনার অভাব
ফলাফল:
রাজনৈতিক সক্ষমতা আছে, কিন্তু তা সমন্বিত নয়—এটাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।
২. নৈতিক সক্ষমতা: সমাজে আছে, রাষ্ট্রে কমে গেছে
সমাজে কেন আছে?
নাগরিক সমাজ, শিক্ষক, সাংবাদিক, তরুণদের মধ্যে নৈতিক অস্বস্তি স্পষ্ট
অন্যায়কে এখনও সবাই “স্বাভাবিক” বলে মেনে নিচ্ছে না
সামাজিক মাধ্যমে ভিন্নমতের উপস্থিতি টিকে আছে
রাষ্ট্রে কেন কম?
অন্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক জবাব নেই
বিচার ও জবাবদিহির পরিবর্তে ভয় ও দমন প্রধান হাতিয়ার
নৈতিকতা রাষ্ট্রীয় ভাষা থেকে কার্যত বাদ পড়েছে
ফলাফল:
নৈতিক শক্তি আছে, কিন্তু তা রাষ্ট্রক্ষমতায় রূপ নিতে পারছে না।
৩. যাত্রা থামানোর জন্য কী অনুপস্থিত?
তিনটি জিনিস সবচেয়ে ঘাটতি:
নৈতিক নেতৃত্ব (Moral Leadership)
— যে নেতা ক্ষমতা নয়, সীমা স্বীকার করতে জানেন
রাজনৈতিক সাহস (Political Courage)
— স্বল্পমেয়াদি সুবিধা ছেড়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা বেছে নেওয়ার ক্ষমতা
প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাস (Institutional Trust)
— নির্বাচন, আদালত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি ন্যূনতম আস্থা
৪. এখন প্রশ্ন বদলে যায়
প্রশ্ন আর এটা নয়—
“বাংলাদেশ বর্বর যুগে ঢুকে গেছে কি না”
বরং প্রশ্ন হচ্ছে—
এই সীমিত সময়ে কি আমরা রাষ্ট্রকে আবার নৈতিক সীমার ভেতরে ফেরাতে পারব?
৫. শেষ কথা (সারসংক্ষেপ)
✔ সক্ষমতা পুরোপুরি হারায়নি
⚠ কিন্তু তা দ্রুত ক্ষয়মান
⏳ ২০২৫–২৬ হলো শেষ সতর্কতা পর্যায়
❌ এই সময় পার হলে, বর্বরতা আর ব্যতিক্রম থাকবে না—স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হবে
সভ্যতা ধ্বংস হয় না একদিনে—
ধ্বংস হয় যখন সমাজ অন্যায় দেখেও বলে: “এটাই বাস্তবতা।”
সভ্যতার শেষ সীমায় বাংলাদেশ?
বাংলাদেশ কি বর্বর যুগে প্রবেশ করেছে—এই প্রশ্নটি যতটা না ভীতিকর, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন আজ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে: আমরা কি এখনো সেই পথে যাত্রা থামানোর রাজনৈতিক ও নৈতিক সক্ষমতা ধরে রেখেছি?
এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দেওয়া কঠিন। তবে বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি ভুল সিদ্ধান্ত সভ্যতাকে আরও পেছনে ঠেলে দিতে পারে, আবার একটি সঠিক ও সাহসী সিদ্ধান্ত দেশকে ফিরিয়ে আনতে পারে নৈতিক রাষ্ট্রের পথে।
সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যা দেখছি, তা কোনো সুস্থ রাষ্ট্রের লক্ষণ নয়। বিচারহীনতা ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে, সহিংসতা রাজনৈতিক ভাষার অংশে পরিণত হয়েছে, আর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমশ সংকুচিত। আইন যেখানে ন্যায়ের রক্ষক হওয়ার কথা, সেখানে তা অনেক সময় ভয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এসবই সভ্য রাষ্ট্রের নয়—এগুলো রাষ্ট্রীয় অবক্ষয়ের পরিচিত লক্ষণ।
তবু বলা যাবে না যে বাংলাদেশ সবকিছু হারিয়ে ফেলেছে। এখনো এই সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব অস্বস্তি আছে। শিক্ষক, সাংবাদিক, তরুণ সমাজ—অনেকে এখনো প্রশ্ন করছেন, প্রতিবাদ করছেন, যদিও সে কণ্ঠস্বর দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন। রাজনৈতিক ব্যবস্থাও পুরোপুরি জমাট বাঁধেনি; ক্ষমতার ভেতরেই দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েন রয়েছে। অর্থাৎ পরিবর্তনের সম্ভাবনা এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি।
সমস্যা হলো—নৈতিক শক্তি সমাজে থাকলেও তা রাষ্ট্রের ভাষা হয়ে উঠছে না। রাষ্ট্র আজ নৈতিকতার বদলে ক্ষমতার ভাষায় কথা বলছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষমতা ধরে রাখাকে স্থিতিশীলতা হিসেবে উপস্থাপন করছে, আর স্থিতিশীলতার নামে নাগরিক অধিকারকে সংকুচিত করা হচ্ছে। এভাবেই বর্বরতা একদিনে আসে না—বরং ধীরে ধীরে “স্বাভাবিক” হয়ে ওঠে।
ইতিহাস বলে, কোনো জাতি তখনই প্রকৃত বিপদের মুখে পড়ে, যখন সে অন্যায়কে মেনে নিতে শেখে এবং ভয়কে বাস্তবতা বলে স্বীকার করে নেয়। বাংলাদেশ আজ সেই পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি এখনো সাহস করে বলব যে আইন আইনের মতো চলবে, নির্বাচন সমাধান হবে সংকটের নয়, আর রাষ্ট্র নাগরিকের বিরুদ্ধে নয়—নাগরিকের পক্ষেই থাকবে?
২০২৫–২৬ সময়কাল তাই কেবল একটি রাজনৈতিক পর্ব নয়; এটি একটি নৈতিক সময়সীমা। এই সময়ে যদি রাষ্ট্র নিজেকে সংশোধন না করে, যদি রাজনৈতিক নেতৃত্ব সীমা মানতে না শেখে, তবে বর্বরতা আর ব্যতিক্রম থাকবে না—তা হয়ে উঠবে নিয়ম।
বাংলাদেশ বর্বর যুগে ঢুকে গেছে কি না—এই বিতর্ক হয়তো চলতেই থাকবে। কিন্তু ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না, যদি আমরা এই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েও দায়িত্ব এড়িয়ে যাই।
মব জাস্টিসের প্রধান কারণসমূহ (২০২৪-২০২৫ প্রেক্ষাপট)১. রাজনৈতিক শূন্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক পঙ্গুত্ব: শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে এক ধরণের জড়তা কাজ করছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত বলে চিহ্নিত অনেক পুলিশ সদস্যের নিষ্ক্রিয়তা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলেছে 1।২. গুজব ও ভুল তথ্য: বাংলাদেশে ডিজিটাল লিটারেসি বা ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব থাকায় মানুষ খুব সহজেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়। দীপু চন্দ্র দাসের ক্ষেত্রেও একটি গুজবই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল 1।৩. ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা: ধর্মকে রক্ষার নামে বা দেশের শত্রুকে দমনের নামে মব ভায়োলেন্সকে অনেক সময় মহিমান্বিত করা হয়। জনপ্রিয় বক্তৃতায় ‘বিচারের বাণীর’ বদলে ‘তাৎক্ষণিক বিচার’ বা ‘ভোরবেলা’ বিচারের ধারণাকে উস্কে দেওয়া হচ্ছে 1।৪. বিচারহীনতার সংস্কৃতি: বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিদের অপরাধের বিচার না হওয়া সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করেছে যে, আইন নিজের হাতে না নিলে বিচার পাওয়া সম্ভব নয় 19।পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ: মানবাধিকারের অবনতি ও মব কিলিংআইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের প্রথম দশ মাসের যে পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক 20। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে মব ভায়োলেন্সের ঘটনা পূর্ববর্তী পাঁচ বছরের গড় হারের তিন গুণ বেশি ছিল 22। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১২৮ জন থেকে ১৭৩ জন মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন 20।২০২৪-২০২৫ সালে মব জাস্টিস ও বিচারবহির্ভূত মৃত্যুর পরিসংখ্যানসময়কালমব লিঞ্চিং/গণপিটুনিতে মৃত্যুবিচারবহির্ভূত হত্যা (রাষ্ট্রীয় বাহিনী)সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা (উল্লেখযোগ্য)জানুয়ারি – জুলাই ২০২৪৩২ – ৪৩৯(উপাত্ত অস্পষ্ট)আগস্ট – ডিসেম্বর ২০২৪৯৬ – ১২৮১২২,০১০ টি হামলা (হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর) 24জানুয়ারি – অক্টোবর ২০২৫১৬৫৩৫৩৯ টি হামলা 22এই পরিসংখ্যানগুলো থেকে প্রতীয়মান হয় যে, মব জাস্টিস কেবল একটি অস্থির সময়ের উপজাত নয়, বরং এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে । বিশেষ করে ঢাকা বিভাগে গণপিটুনির হার সবচেয়ে বেশি, যা নগর জীবনে মানুষের মধ্যে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার অভাবকে প্রতিফলিত করে ।সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক উত্তাপদীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা জাগিয়ে তুলেছে ।
৫ আগস্টের পর থেকে সারা দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের এক ঢেউ আছড়ে পড়েছিল। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মতে, ৪৫টি জেলায় হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে অন্তত ২,০১০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে 24। এই হামলাগুলোর পেছনে অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকলেও, ভালুকার মতো ঘটনাগুলো নিখাদ ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও গুজব দ্বারা চালিত ।ভালুকার ঘটনার সময় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সারা দেশে এমনিতেই উত্তেজনা বিরাজ করছিল । হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো ভারতীয় প্রভাব ও হিন্দুদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার শুরু করে, যা দীপু দাসের হত্যাকাণ্ডে একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন 13। এই ধরণের ঘটনাগুলো কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি নষ্ট করছে না, বরং প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন সৃষ্টি করছে ।
সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক ও গোষ্ঠীগত সহিংসতার চিত্রতারিখ/সময়কালস্থানের নামঘটনার প্রকৃতিপ্রধান কারণআগস্ট ২০২৪সারা বাংলাদেশ২,০১০ টি হামলা, ১৫২ টি মন্দির ভাঙচুররাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ধর্মীয় ঘৃণা 24নভেম্বর ২০২৪হাজারী লেন, চট্টগ্রামইসকন বিরোধী ফেসবুক পোস্টের জেরে হামলা ও এসিড নিক্ষেপডিজিটাল গুজব ও সাম্প্রদায়িক উস্কানি 1
সেপ্টেম্বর ২০২৪পার্বত্য চট্টগ্রামআদিবাসী জুম্ম সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও অগ্নিসংযোগচুরির অভিযোগ ও জাতিগত বিরোধ 21মার্চ ২০২৫ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেনকে চুরির অভিযোগে হত্যামব জাস্টিস ও প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা 20ডিসেম্বর ২০২৫ভালুকা, ময়মনসিংহদীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পুড়িয়ে হত্যামিথ্যা গুজব ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব 3এই প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, বর্তমানে বাংলাদেশে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের নির্দোষিতা প্রমাণ করার আগেই মব বা উন্মত্ত জনতার রায়ের শিকার হচ্ছেন ।
সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণবাংলাদেশের বর্তমান অস্থিরতা কেবল ব্যক্তিদের জীবনই নয়, বরং দীর্ঘদিনের অর্জিত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও ধ্বংস করছে । ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর উত্তেজিত জনতা ঢাকার প্রথম সারির সংবাদপত্র ‘প্রথম আলো’ এবং ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর কার্যালয়ে হামলা চালায় এবং অগ্নিসংযোগ করে 13। সাংবাদিকদের ওপর এই হামলাকে ‘সত্যের ওপর হামলা’ হিসেবে অভিহিত করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার 1
একই সাথে বাংলাদেশের প্রগতিশীল সংস্কৃতির ধারক ছায়ানট এবং উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়েও হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয় । এই আক্রমণগুলোকে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো ‘সাংস্কৃতিক সংগ্রাম’ হিসেবে অভিহিত করলেও, এটি আসলে বাংলাদেশের বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিচয়ের মূলে কুঠারাঘাত । এমনকি ভাস্কর্য, মাজার এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোও এই মব ভায়োলেন্সের হাত থেকে রেহাই পায়নি ।ক্ষতিগ্রস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা (২০২৪-২০২৫)প্রতিষ্ঠানের নামক্ষতির প্রকৃতিসংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রেক্ষাপটপ্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারভবন ভাঙচুর, নথি ও আসবাবপত্রে অগ্নিসংযোগ, সাংবাদিকদের ওপর হামলাশরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর প্রতিবাদ ছায়ানট সংস্কৃতি ভবন৫৫ বছরের সংগ্রহশালা ধ্বংস, শ্রেণীকক্ষে অগ্নিসংযোগ’ভারতীয় সংস্কৃতির প্রচারক’ তকমা দিয়ে হামলা
সুপ্রিম কোর্টের ন্যায়বিচার ভাস্কর্যসম্পূর্ণ ধ্বংস ও অপসারণধর্মীয় মৌলবাদী আন্দোলন আবাহনী লিমিটেড ও শেখ জামাল ক্লাব৫০০ ট্রফি চুরি, অফিস ও আসবাবপত্র লুটপাটআওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে হামলা 24৪০টি সুফি মাজার ও কবরকবরের ওপর হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞধর্মীয় ভিন্নমতের বিরুদ্ধে সহিংসতা এই ঘটনাগুলো নির্দেশ করে যে, মব জাস্টিস এখন কেবল বিচারব্যবস্থার বিকল্প নয়, বরং এটি একটি আদর্শিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে 1 একদিকে তারা দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক শাসনের ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে তারা নতুন নতুন সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার মুখোমুখি হচ্ছে
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করেছে যে, যদি সরকার দ্রুত মব জাস্টিস বন্ধ করতে না পারে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনতে না পারে, তবে গণতান্ত্রিক উত্তরণ বাধাগ্রস্ত হবে
সরকার যদিও বেশ কিছু সংস্কার কমিশন গঠন করেছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে 31। বিশেষ করে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এর মতো নিরাপত্তা অভিযানে ১১,০০০ মানুষকে গ্রেপ্তার করা এবং সামরিক বাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা প্রদান নিয়ে নাগরিক সমাজের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে 1।অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার ও নিরাপত্তা উদ্যোগের প্রভাবউদ্যোগউদ্দেশ্যসম্ভাব্য ঝুঁকিআন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) সংস্কারজুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করামৃত্যুদণ্ডের বিধান ও রাজনৈতিক ব্যবহারের সম্ভাবনা
সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা প্রদানআইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাবেসামরিক প্রশাসনের ওপর সামরিক প্রভাব ও মানবাধিকার লঙ্ঘন
ইনডিপেনডেন্ট ট্রুথ কমিশন গঠনবিচারবহির্ভূত হত্যার দীর্ঘমেয়াদী তদন্তআমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ধীরগতি 1অপারেশন ডেভিল হান্টমব ও ডিজিটাল উস্কানিদাতাদের দমনগণগ্রেপ্তার ও ভিন্নমত দমনের অভিযোগ 1সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে না নেয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগে যে শিথিলতা দৃশ্যমান, তা সাধারণ মানুষের মনে আস্থার সংকট তৈরি করছে
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটবাংলাদেশের মব জাস্টিস এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাগুলো বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে
জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন বারবার মানবাধিকার সুরক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং টিম জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় ১,৪০০ জনের মৃত্যুর প্রমাণ পেয়েছে এবং বর্তমান সরকারকে সব ধরণের প্রতিশোধমূলক হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে
ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমানে এক কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দাবি এবং বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগগুলো দুই দেশের মধ্যকার আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে । ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অব্যাহত হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থায়িত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে
বাংলাদেশ কি বর্বর যুগে ফিরে যাচ্ছে?
ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে এক রূঢ় সত্য উন্মোচন করেছে। একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তখনই ব্যর্থ হয় যখন সেখানে আইনের শাসনের বদলে ভিড়ের শাসন বা মব-রুল প্রতিষ্ঠিত হয় 1। দীপু দাসের ঘটনায় র্যাবের তদন্তে ‘ধর্ম অবমাননার’ প্রমাণ না পাওয়া এবং সহকর্মীদের ব্যক্তিগত বিরোধের ইঙ্গিত পাওয়া আমাদের সমাজকে এক গভীর নৈতিক সংকটের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ।বাংলাদেশ কি বর্বর যুগে ফিরে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে রাষ্ট্র ও সমাজের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। যদি মব জাস্টিসকে ‘বিপ্লবের স্পিরিট’ বা ‘জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ’ হিসেবে বৈধতা দেওয়া হতে থাকে, তবে বাংলাদেশ এক অন্তহীন আইনি অরাজকতার দিকে ধাবিত হবে 1। কিন্তু যদি রাষ্ট্র তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করে এবং প্রতিটি নাগরিকের (ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে) জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারে, তবেই এই ‘বর্বরতার’ তকমা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

