বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির জীবনের মোড় পরিবর্তন করে না; সেগুলো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথ, জনগণের প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ইতিহাসচর্চাকেও প্রভাবিত করে। শেখ হাসিনার ১৯৮১ সালের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন তেমনই একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। আর ২০২৬ সালে তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন কিংবা ভারত থেকে প্রত্যর্পণের প্রশ্নটি বাংলাদেশের সামনে নতুন কিছু রাজনৈতিক, সাংবিধানিক, বিচারিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে।
তবে দুটি সময়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছিলেন দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শেষে, আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি এখন জড়িয়ে আছে ফৌজদারি মামলা, আদালতের রায়, রাজনৈতিক অধিকার, বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা এবং ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের সঙ্গে।
প্রশ্ন হচ্ছে—শেখ হাসিনার দেশে ফেরা কি বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও গভীর করবে?
১৯৭৫ পরবর্তী ১৯৮১ সালের ১৭ মে দুপুর ১২টায় বোন পুতুলকে নিয়ে ঢাকায় আসেন শেখ হাসিনা
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কণ্যার অবতরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক প্রজাতন্ত্রটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘পাকিস্তানের সংবিধান ও গণতন্ত্র সমুন্নত’ রাখতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও নিপীড়নের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিল হাজার হাজার আলবদর, রাজাকার। জামায়াতে ইসলামীসহ অনেক অতিবাম রাজনৈতিক দল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতা করে পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে নেমেছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দুনিয়ার অধিকাংশ দেশই আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিরোধিতাকে পরাজিত করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ জাতি বিজয় অর্জন করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। পরাজিত হয় ৫২, ৫৪, ৬১, ৬৬, ৬৯, ৭০-এর বাঙালি চেতনার বিরুদ্ধাবলম্বনকারী শক্তি।
কিছুদিনের জন্য পরাজিত শক্তি চুপচাপই ছিল, কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে পুনরায় ক্ষমতাসীন হয় দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের বিরোধীপক্ষ ৭১-এর পরাজিত শক্তি। আসলে ওই দিন যারা রাষ্ট্রক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে তারা মূলত আবার পূর্ব পাকিস্তানকেই কায়েম করে।
পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার প্রায় ছয় বছর পর দেশে ফেরার সেই দিনটির স্মৃতিচারণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনেক বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে দেশে পা রেখে তিনি দেখেছিলেন প্রকৃতিও বিরূপ; ঝড় হচ্ছে ৬০ মাইল বেগে। বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যেও পাশে পেয়েছিলেন হাজার হাজার সমর্থককে।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘তখনকার সরকার কিছুতেই আমাকে আসতে দেবে না। আমার বিরুদ্ধে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র, আমাকে চিঠিপত্র পাঠানো, বিভ্রান্ত করার চেষ্টা, অনেক কিছুই করা হয়েছিল।
‘আসার পর অনেক ঝড়ঝাপটা পার হতে হয়েছে এতে কোনো সন্দেহ নাই। তবে এসেছি তো ঝড় মাথায় নিয়েই। সেদিন ৬০ মাইল বেগে ঝড় হচ্ছিল, তখন আমি ট্রাকে। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়।’
সে সময়ের আওয়ামী লীগের সব নেতা-কর্মীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দলটির প্রধান বলেন, ‘আমি কৃতজ্ঞতা জানাই আওয়ামী লীগের সে সময়ের সব নেতা-কর্মীকে। আমার অবর্তমানে আমাকে সভাপতি নির্বাচিত করে, যেটা আমি জানতাম না আসলে। তারপর থেকে যারা আমার সাথে ছিল এবং এ দেশের জনগণ।’
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে আক্রমণ করে যখন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়, তখন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছিলেন বেলজিয়াম। সেখান থেকে তাকে জার্মানি নেয়ার ব্যবস্থা করেন সে সময়ের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। সেখান থেকে তাকে পাঠানো হয় ভারতে।
ইন্দিরা গান্ধীর সরকার বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়। তবে নিরাপত্তার শঙ্কায় তাদের প্রকাশ্যে আনা হয়নি। গোপনে একটি ফ্ল্যাটে রাখা হয়।
ছয় বছর পর ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে সভাপতি করা হয়। এরপর ১৭ মে তিনি দেশে ফেরেন।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে নির্মমভাবে হত্যার সময় দুই বোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় (জার্মানি) ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। এক রাতে নিমিষেই তাদের ভাগ্যাকাশে নেমে আসে ঘন কালো মেঘ, সব কিছু মুহূর্তে পাল্টে যায়, রাষ্ট্রপতির কন্যা থেকে তারা এতিম হয়ে যান। তাদের আশপাশ, পরিবেশ, পরিচিতজন সবই কেমন অচেনা হয়ে যায়। কাছের অনেকে পাল্টে ফেলে তাদের রূপ, যেন বেঁচে যাওয়া দুই বোন তাদের জন্য হয়ে ওঠেন বোঝা। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে শোকে মুহ্যমান হয়েও জীবন বাঁচাতে তাদের ছুটতে হয়েছে এখানে-সেখানে। আশ্রয় পান ভারতের দিল্লিতে, সেখানেও তাদের কড়া নিয়ম, ভয়, আতঙ্ক ও সরকারি বিধিনিষেধের মধ্যে জীবন কাটাতে হয়। সেখান থেকে শেখ রেহানা অনেক কষ্ট করে এক সময় লন্ডন যান। শুরু করেন জীবনের আরেক সংগ্রাম। নির্বাসিত জীবনের সেই দিনগুলোর দুঃসহ স্মৃতি এখনও তাদের কাছে অম্লান। ৬ বছর অনেকটা উদ্বাস্তু হয়ে তাদের দিল্লিতে থাকতে হয়েছে। অনেকে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও তাদের পরিবারের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করেন, আবার অনেকে কোনও যোগাযোগ করেনি।
২০২৪ প্রেক্ষাপট
- সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি পুনর্বহালের প্রতিবাদে ২০২৪ সালের ১ জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাত ধরে এই আন্দোলন শুরু হয়।
- সহিংসতা ও রূপান্তর: ১৫ জুলাই থেকে আন্দোলন সহিংস রূপ নেয় এবং পরবর্তীতে এটি ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের লক্ষ্যে এক দফার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
- পতন: টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করে দেশ ছেড়ে জীবন রক্ষায় ভারতে আশয় গ্রহন করেন সেই দিল্লিতে।
আওয়ামীলীগের রাজনীতির ইতিহাসে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ১৯৮১
১৯৮১ সালের ১৭ মে দুপুর ১২টায় পুতুলকে নিয়ে ঢাকায় আসেন শেখ হাসিনা। কিছুটা হলেও ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণের মতো। ওই দিন বঙ্গবন্ধুর অবতরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক প্রজাতন্ত্রটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল। শেখ হাসিনার ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণের মধ্য দিয়ে যে ভিত্তিকে উপড়ে ফেলার চেষ্টায় নড়বড়ে করে ফেলা হয়েছিল তা পুনঃগ্রথিত হওয়ার যাত্রার শুভসূচনা।
বাঙালির স্বাধীন জাতিসত্তা তথা পৃথক জাতি রাষ্ট্রের চেতনার অন্যতম ভিত্তি যদি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনকে ধরে নেওয়া হয় তাহলেও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় বাঙালির রাষ্ট্রভাষা বাংলা হবে। তবে, এর বিরোধীদের মধ্যে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যাও কম ছিল না। তাদের অনেকে আমাদের রাজনীতিতে নেতৃত্বস্থানীয়ও ছিলেন। খাজা নাজিমউদ্দিন ও নুরুল আমিনের নাম সবাই জানলেও ভেতরে ভেতরে তাদের সংখ্যা ছিল প্রচুর। তাদের ধারণা ছিল, সমগ্র পাকিস্তানে উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে তা ইসলাম আর ভূগোলের বিভ্রান্তি নিয়ে সৃষ্ট পাকিস্তানের অখণ্ডতার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
তারা বাংলা ও বাঙালিত্বের মধ্যে হিন্দুয়ানির গন্ধ সবসময়ই পেত। যার ফলে দেখা যায়, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রসংগীত ও রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ করা হয় পূর্ব পাকিস্তানে। তারও আগে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময়ও বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধেও এ দেশে প্রচুর লোকের অবস্থান ছিল। ১৯৬৬ সালে যখন ছয় দফা ঘোষণা করা হয় তখনও ছয় দফাকে ভারতীয়দের প্ররোচনায় ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করার লোক এ দেশে প্রচুর ছিল। পরবর্তী সময়ে ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়ও আইয়ুবশাহীর পক্ষে এবং ৭০-এর নির্বাচনে বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের বিপক্ষে প্রচুর বাঙালি অবস্থান নিয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘পাকিস্তানের সংবিধান ও গণতন্ত্র সমুন্নত’ রাখতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন ও নিপীড়নের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছিল হাজার হাজার আলবদর, রাজাকার। জামায়াতে ইসলামীসহ অনেক অতিবাম রাজনৈতিক দল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি বিরোধিতা করে পাকিস্তানের পক্ষে যুদ্ধে নেমেছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দুনিয়ার অধিকাংশ দেশই আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিরোধিতাকে পরাজিত করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এ জাতি বিজয় অর্জন করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। পরাজিত হয় ৫২, ৫৪, ৬১, ৬৬, ৬৯, ৭০-এর বাঙালি চেতনার বিরুদ্ধাবলম্বনকারী শক্তি।
কিছুদিনের জন্য পরাজিত শক্তি চুপচাপই ছিল, কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনককে হত্যার মধ্য দিয়ে পুনরায় ক্ষমতাসীন হয় দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের বিরোধীপক্ষ ৭১-এর পরাজিত শক্তি। আসলে ওই দিন যারা রাষ্ট্রক্ষমতাকে কুক্ষিগত করে তারা মূলত আবার পূর্ব পাকিস্তানকেই কায়েম করে। মোশতাক, জিয়ার নেতৃত্বে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন হয় আজীবন বাঙালিত্বের বিরোধিতাকারী অপশক্তি। ইতিহাসের চাকা ঘুরতে থাকে পেছনের দিকে। ১৯৭৬ সালের ৩ মে এক ফরমান জারি করে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নিষিদ্ধ সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলগুলোকে পুনর্বাসিত করেন। রাজনীতিতে নিয়ে আসা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীকে।
১৯৭৬ সালের ২১ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সায়েমের কাছ থেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ কেড়ে নিয়ে কিছুদিন পর স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। ১৯৭৭ সালের ৩০ মে আইয়ুবীয় কায়দায় হ্যাঁ-না ভোটে ৮৮.৫ শতাংশ ভোটারের উপস্থিতিতে ৯৮.৮৮ শতাংশ ভোট তার পক্ষে দিয়েছে বলে প্রচার করেন। ১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই পিপিআর ঘোষিত হওয়ার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হয়। যদিও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার পৃষ্ঠপোষকতায় আরও দুটি আওয়ামী লীগ তৈরির চেষ্টা করা হয়। আওয়ামী লীগে একাধিক বিভাজন সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু সময়ের পরীক্ষায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শের মূল আওয়ামী লীগই টিকে যায়।
সামরিক শাসনের মধ্যে সেনানিবাসে বসে রাষ্ট্রীয় অর্থে উচ্চাভিলাসী ও ক্ষমতালিপ্সু সামরিক-বেসামরিক পাকিস্তানপন্থি দালাল ও সুবিধাবাদী দলছুট রাজনীতিকদের নিয়ে প্রথমে ‘জাগো দল’ পরে ‘বিএনপি’ গঠন করা হয়। ১৯৭৭ সালের ৯ এপ্রিল সেনাপ্রধান ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকা অবস্থায় জিয়াউর রহমান জাগো দলে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালের ১ মে থেকে উন্মুক্ত রাজনীতি শুরু হয়। জিয়া নির্বাচন সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে কেবল সেনাবাহিনী প্রধানের রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ব্যবস্থা করেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন ব্যাপক কারচুপিমূলক নির্বাচনে ৭৮.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জিয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
‘রাজনীতি রাজনীতিকদের জন্য ডিফিকাল্ট’ করার রাজনীতির প্রবর্তক ও ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ অর্থনীতির জনক জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের ব্যাপক জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনে ২০৭টি আসন পেয়ে ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত বিএনপি সংসদ দখল করে। প্রথমে মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে সিনিয়র মন্ত্রী এবং পরে ১৯৭৯ সালের ১২ মার্চ তিনি মারা গেলে পাকিস্তানপন্থি মুসলিম লীগ নেতা শাহ্ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। বাংলাদেশকে পাকিস্তানিকরণের ষোলকলা পূর্ণ করলেন জিয়াউর রহমান। পুরো দেশ চলে গেল পাকিস্তানি ভাবধারার লোকদের দখলে। বাকি থাকল কেবল পতাকা আর মানচিত্রটি, জাতীয় সংগীতটি বদলানোর চেষ্টার ধৃষ্টতাও দেখালেন তারা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বলবৎ হওয়া সামরিক আইন ও সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করা হয় ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল।
১৯৮১ সালের ১৩-১৪ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সময় ভাগ্যক্রমে বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন দিল্লিতে। সভাপতি পদ গ্রহণে শেখ হাসিনাকে রাজি করানো এবং দেশে ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগের অংশ হিসেবে দিল্লিতে একাধিক বৈঠকে বসেন আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। তাদের মধ্যে ছিলেন আবুল মালেক উকিল, ড. কামাল হোসেন, জিল্লুর রহমান, আবদুল মান্নান, আবদুস সামাদ আজাদ, এম কোরবান আলী, জোহরা তাজউদ্দীন, সাজেদা চৌধুরী, ডা. এস এ মালেক, আমির হোসেন আমু, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ।
২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দিল্লিতে কয়েক দফা বৈঠক হয় আওয়ামী লীগ নেতবৃন্দের। ইতোমধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা প্রতিরোধের জন্য পাকিস্তানপন্থি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বিএনপি দেশব্যাপী প্রচারণা শুরু করে। তারা সারাদেশে প্রচুর লিফলেট ও হ্যান্ডবিল বিতরণ করে। জয় ও পুতুল জলবসন্তে আক্রান্ত হওয়ায় শেখ হাসিনার ঢাকা প্রত্যাবর্তন কয়েকদিন বিলম্বিত হয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দুপুর ১২টায় পুতুলকে নিয়ে ঢাকায় আসেন শেখ হাসিনা। কিছুটা হলেও ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণের মতো। ওই দিন বঙ্গবন্ধুর অবতরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামক প্রজাতন্ত্রটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল। শেখ হাসিনার ঢাকা বিমানবন্দরে অবতরণের মধ্য দিয়ে যে ভিত্তিকে উপড়ে ফেলার চেষ্টায় নড়বড়ে করে ফেলা হয়েছিল তা পুনঃগ্রথিত হওয়ার যাত্রার শুভসূচনা।
শেখ হাসিনাকে পেয়ে বাঙালি তার ‘বাঙালিত্ব’ ও ‘বাংলাদেশকে’ ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বাঁধল। আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয় ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে। জনস্রোতে কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল। অনেক ঝুঁকি নিয়েই অবতরণ করেছিল শেখ হাসিনাকে বহনকারী ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ৭০৭ বোয়িং বিমানটি। লাখো লাখো মানুষ রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়েছিল। গগনবিদারী স্লোগানের মধ্যে বেরিয়ে আসেন সাদা রংয়ের ওপর কালো ডোরাকাটা তাঁতের মোটা শাড়ি পরা প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তখন কাঁদছিলেন, প্রকৃতিও একই পথ ধরল। চারদিক অন্ধকার হয়ে বৃষ্টি শুরু হল, সঙ্গে ঝড়। ট্রাক ও মিছিল চলছিল খুব ধীরগতিতে।
তিনি বলেন, ‘বাংলার মানুষের পাশে থেকে মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেয়ার জন্য আমি এসেছি। আমি আওয়ামী লীগের নেত্রী হওয়ার জন্য আসিনি। আপনাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে আমি আপনাদের পাশে থাকতে চাই।’
শেখ হাসিনার আগমন গণজোয়ার নিয়ে আসে সারাদেশে। হতাশাগ্রস্ত আওয়ামী লীগ কর্মীরা সুসংগঠিত হতে শুরু করে। বিপন্ন যে জাতি দীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রামের সব অর্জন হারাতে বসেছিল, তাদের মনে আবারও হারানো মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ফিরে পাওয়ার আশা ফিরে আসে। শুরু হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের পথ চলা।
এরই মধ্যে ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনী অভ্যুত্থানে নিহত হন। অবশ্য এটি ছিল জিয়ার আমলে অনেক সামরিক অভ্যুত্থানের একটি। ৭৫ থেকে ৮১ সাল পর্যন্ত সময়ে সেনাবাহিনীতে বহু অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানে প্রাণ দিতে হয় হাজার হাজার সেনাসদস্যকে।
১৯৮৭ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে কয়েকবার গৃহবন্দি করা হয়। ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার সমাবেশমুখী মিছিলে গুলি চালিয়ে এরশাদের পেটোয়া বাহিনী ৩৮ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করে। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। শুরু হল শেখ হাসিনাকে হত্যার আনুষ্ঠানিক মহড়া, যা ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পায়।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এরশাদবিরোধী আন্দোলন এত বেগবান হয় যে জরুরি অবস্থা জারি করেও এরশাদ ব্যর্থ হন। সামরিক-বেসামরিক আমলারা পক্ষ ত্যাগ করতে শুরু করেন। আ স ম রব ও মওদুদরা পিছুটান দিতে থাকেন। ১৯৯০-এর ৬ নভেম্বর শেখ হাসিনা পান্থপথের জনসভায় সাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ দেখান। ৬ ডিসেম্বর সেই রূপরেখা অনুযায়ী এরশাদ শাসনের অবসান হয়।
তারপরও ষড়যন্ত্রকারীরা দমে যায়নি। ১৯৯১ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সূক্ষ্ম কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে ক্যান্টনমেন্টবাসী। ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানকারী খালেদা জিয়ার দল ৩০ শতাংশ ভোট পেয়ে জামায়াতের সহযোগিতায় ক্ষমতাসীন হয়। ৩৮ শতাংশ ভোট পেয়েও আসনসংখ্যার হিসাবে আওয়ামী লীগ আবারও রাজপথে। ক্যান্টনমেন্ট নিবাসী খালেদা জিয়া তার উত্তরসূরি ক্যান্টনমেন্টবাসী জিয়া-এরশাদের মতোই নির্যাতন, নিপীড়ন, লুণ্ঠন, সীমাহীন দুঃশাসনের রাজত্ব কায়েম করেন।
১৯৯২ সালে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন ও পুনর্বিন্যাসে উদ্যোগী হন। বিভিন্ন কমিটি ও উপ-কমিটি গঠন করে দলীয় রাজনীতিতে আধুনিক ব্যবস্থাপনায় মেধার সমাবেশ ঘটান। আওয়ামী লীগ তার ঐতিহ্যকে অক্ষুন্ন রেখে আধুনিক মানসিকতার দলে রূপান্তরিত হয়। ঘাতক-দালাল নির্মূল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনও বেগবান করা হয়। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রহসনের এক নির্বাচন করে বিএনপি, কিন্তু ক্ষমতায় টিকতে পারেনি। ৩০ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন।
২১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে অংশ নেন। শেখ হাসিনার বিজয় আঁচ করতে পেরে ক্যান্টনমেন্টবাসী অন্ধকারের শক্তি আবারও অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালায়, জাগ্রত জনতার প্রতিরোধের ভয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিচক্ষণতায় তা ব্যর্থ হয়। ২৩ জুন সংখ্যাগরিষ্ঠ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। বাংলার জনগণ তাদের হৃত মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ আবার ফিরে পায়।
তবে আবার সক্রিয় হয় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা। ২০০১ সালে পাকিস্তানপন্থিদের আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা হয়। এবার জামায়াতে ইসলামী চলে আসে ক্ষমতার কেন্দ্রে, মন্ত্রিসভায় ঠাঁই করে নেয় তারা, জঙ্গি উত্থানের সকল পৃষ্ঠপোষকতা শুরু হয় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে, সামরিক গোয়েন্দারা হাওয়া ভবনের সঙ্গে মিলেমিশে শুরু করে অস্ত্র এবং মাদকের ব্যবসা, দশ ট্রাক অস্ত্র এরই অংশ। শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য গ্রেনেড হামলাসহ পরিচালনা করা হয় একাধিক হত্যাপ্রচেষ্টা।
একই ধারায় দেশ চলে ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত। এমনকি ২০০৭-০৮ সালে আবারও দেশকে দখলে নেয় পাকিস্তানি মানসিকতার সামরিক গোয়েন্দা ব্রিগ্রেডিয়ার বারী ও আমিনরা।
১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হলে দেশে ফেরার তাগিদ যেন আরও বেড়ে যায়। তখন স্বৈরশাসক জিয়া ক্ষমতায়। শেখ হাসিনাকে ফিরতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাধা দেওয়ার সব প্রক্রিয়া চালানো হয়। শেখ হাসিনার দেশে ফেরা ঠেকাতে প্রতিরোধ কমিটিও করা হয়েছিল, যেন তিনি আর দেশে ফিরতে না পারেন। অথচ শাসকগোষ্ঠী ভুলে গিয়েছিল তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কন্যা, কখনও মাথা নত করার নন, পরাভব মানবার নন। মাথা উঁচু করে ঝড়-ঝঞ্ঝা মোকাবিলা করে চলার সাহস রাখেন তিনি। শেখ হাসিনার দেশের প্রতি, স্বাধীন বাংলাদেশের মাটির প্রতি, প্রিয় জন্মভূমির প্রতি টান সব বাধাকে ব্যর্থ করে দিয়েছিল। কোনও বাধা, ষড়যন্ত্র, অপশক্তি তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ঠেকাতে পারেনি। জাতির পিতার মতোই তিনি অবিচল ও স্বীয় সিদ্ধান্তে দৃঢ় থেকে স্বদেশের মাটিতে ফিরে এসেছিলেন।
তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেই এমন বিরূপ পরিস্থিতিতে দেশে ফিরে এসেছিলেন, প্রিয়জনদের হারিয়েও প্রিয় মাতৃভূমির জন্য, দেশের মানুষের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও দেশের গতিপথ পরিবর্তনে একটি অনন্য অধ্যায়। যা গভীর বিশ্লেষণ ও গবেষণার দাবি রাখে। সেদিন হয়তো মনে হয়েছিল তিনি শুধু সশরীরে দেশে ফিরে এসেছেন, কিন্তু দেশের ইতিহাস বলে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দেশের সমাজ, রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।
শেখ হাসিনার ফিরে আসার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজেদের প্রতি পুনরায় বিশ্বাস ফিরে পেতে শুরু করে। জাতির পিতা শেখ মুজিবকে হত্যার পর অবৈধ স্বৈরশাসকরা দেশের গণতন্ত্র, ভোট ও ভাতের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। শেখ হাসিনার দেশে ফিরে এসে মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নবসূচনা করেন। সে সময়কার কারফিউ গণতন্ত্রকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনতে শেখ হাসিনা আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করেন। শেখ হাসিনার ফিরে আসার মধ্য দিয়ে দেশে স্বৈরশাসকদের মননে চিড় ধরে যায়, অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা ক্ষমতা ত্যাগে বাধ্য হয়। দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে পুনরায় উজ্জীবিত হয়েছিল।
প্রেক্ষাপট ২০২৬
রয়টার্সকে দেওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোন সাক্ষাৎকারটি ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
২০২৬ সালের ১০ জুলাই আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি ও মন্তব্য করেন:
- দেশে ফেরার ঘোষণা: শেখ হাসিনা জানান যে, তিনি ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আসবেন।
- আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি: দেশে ফিরে তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর মুখোমুখি হতে তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে উল্লেখ করেন।
‘আমাকে হত্যা করা হলেও ফিরতে হবে’: মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি সত্ত্বেও বাংলাদেশে ফেরার অঙ্গীকার শেখ হাসিনার
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর মাতৃভূমিতে ফিরে আসার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। কারাবাস কিংবা মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা থাকলেও তিনি দেশে ফিরতে চান বলে জানিয়েছেন। দুই বছরেরও বেশি আগে যে দেশ ছেড়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন, সেখানে ফেরার পথে জীবনের ঝুঁকি তাঁকে থামাতে পারবে না বলেও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। ২০২৪ সালের আগস্টে তাঁর সরকারের পতনের পর থেকে তিনি ভারতে বসবাস করছেন। বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার পরিণতি মোকাবিলা করতেও তিনি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, “ফিরে যাওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা নিয়ে আমি পরোয়া করি না। আমাকে ফিরতেই হবে।”
তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সরকার ভারত থেকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দমন-পীড়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ২০২৫ সালে শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে এই রায় ও অভিযোগ তিনি প্রত্যাখ্যান করে আসছেন।
দেশে ফেরার ইচ্ছা পুনর্ব্যক্ত করলেও ওয়াশিংটনের ওই সংবাদ সম্মেলনে ফেরার নতুন কোনো তারিখ ঘোষণা করেননি শেখ হাসিনা। পরে তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় সাংবাদিকদের জানান, দেশে ফেরার সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এর আগে, গত আগস্টে নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময়ের সময় শেখ হাসিনা ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, “ভারত সরকার ও জনগণকে ধন্যবাদ। সব দলের মানুষ আমাকে ১৯৭৫ সালের মতোই গ্রহণ করেছিলেন।”
বিদেশে কয়েক বছর কাটানোর পর ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসার ঘটনাও স্মরণ করেন তিনি। একই সঙ্গে ২০০৭ সালের রাজনৈতিক জরুরি অবস্থার সময় ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাঁর এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করতে আইনি প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করছে। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা ফৌজদারি অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে হবে ন্যায়সংগত ও নিরপেক্ষ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনার পাশাপাশি শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন দেশটি কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে সমর্থন করে।
তিনি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের জনজীবনে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
তাঁর এই বক্তব্য এমন এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এসেছে, যখন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে দেওয়া হয়নি। ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসে।
‘প্রতিশোধ নয়, সমঝোতার ভিত্তিতে গড়ে উঠুক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শেখ হাসিনা জাতীয় সমঝোতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর বক্তব্য, তাঁর সাবেক সরকারের বিরোধিতা করার কারণে কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার কেড়ে নেওয়া উচিত নয়।
তিনি বলেন, “একইভাবে, যারা আমার সরকারের বিরোধিতা করেন, তাঁরাও নাগরিক; তাঁদের অধিকারও সম্মান করতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিশোধের ভিত্তিতে নয়, সমঝোতার ভিত্তিতে গড়ে তুলতে হবে।”
শেখ হাসিনা স্বীকার করেন, তাঁর সরকারের শাসনামল নিয়ে এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আন্দোলন এবং এর পরবর্তী ঘটনাবলি নিয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “আমার সরকারের ভূমিকা, ২০২৪ সালের ঘটনাবলি এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে যেসব কঠিন প্রশ্ন রয়েছে, আমি সেগুলো স্বীকার করছি।”
তবে তাঁর বক্তব্য, তাঁর নিজেরসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি হতে হবে স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।
ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্কের আহ্বান
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জাপানের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশ যেন বৃহৎ শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হয়ে না ওঠে। বরং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার পক্ষেও মত দেন। এ ক্ষেত্রে মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে কীভাবে ফিরতে পারেন?
এখানে তিনটি সম্ভাব্য পথ আলাদা করে দেখা দরকার।
পথ এক: স্বেচ্ছায় প্রত্যাবর্তন
শেখ হাসিনা ভারত থেকে নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার অভিপ্রায় প্রকাশের কথা ইন্ডিয়া টুডে–এর ৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করলেই তিনি নিরাপদে প্রবেশ করতে পারবেন বা গ্রেপ্তার এড়াতে পারবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর গ্রেপ্তারি ব্যবস্থা ও আদালতের রায় থাকলে সেগুলোর আইনি পরিণতি বিবেচনায় নিতে হবে।
পথ দুই: ভারত থেকে প্রত্যর্পণ
বাংলাদেশের সরকার ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়েছে। ২০১৩ সালের ভারত–বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু চুক্তি থাকলেই প্রত্যর্পণ স্বয়ংক্রিয় হয় না। চুক্তির শর্ত, সংশ্লিষ্ট অপরাধের প্রকৃতি, প্রযোজ্য ব্যতিক্রম, প্রমাণপত্র এবং ভারতের আইনি প্রক্রিয়া বিবেচিত হতে পারে।
পথ তিন: কূটনৈতিক সমঝোতা ও আইনি নিশ্চয়তার ভিত্তিতে প্রত্যাবর্তন
দুই দেশ প্রত্যর্পণ নিয়ে আলোচনা করতে পারে এবং একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়া, আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ, কারাব্যবস্থা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন নিয়ে যোগাযোগ করতে পারে।
তবে কূটনৈতিক সমঝোতা নিজে থেকে আদালতের রায় বাতিল করে না, গ্রেপ্তারি ব্যবস্থা স্থগিত করে না কিংবা প্রত্যর্পণের আইনি শর্ত মওকুফ করে না। এসবের জন্য প্রযোজ্য আইনি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও প্রত্যর্পণ—দুটিই আলোচনার মধ্যে রয়েছে; কিন্তু কোন পথে, কখন এবং কী শর্তে বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বা প্রত্যর্পণ কি বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় তৈরি করবে, নাকি পুরোনো রাজনৈতিক সংঘাতের নতুন অধ্যায় খুলবে?

২০২৬ সালের ১০ জুলাই রয়টার্সকে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করতে চান। অন্যদিকে, ৪ অক্টোবর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ভারতকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার আহ্বান জানান। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবেচিত হচ্ছে।
এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে নতুন ইতিহাসের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা যায়, তবে তার রূপ কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
ইতিহাসের মোড় ঘোরাতে পারে এমন তিনটি বিষয় এখানে রয়েছে:
- আইনের শাসন: দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয়, তা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
- রাজনৈতিক সহাবস্থান: আওয়ামী লীগ ও অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন কীভাবে নিষ্পত্তি হয়, তা ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
- ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক: প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই দেশের সিদ্ধান্ত ও আলোচনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে নতুন ইতিহাস মানেই যে সংঘাত, প্রতিশোধ বা রাজনৈতিক সমঝোতা—এর কোনো একটি ঘটবে, তা নয়। নির্ভরযোগ্য নথি, স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার ভিত্তিতে পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, সেটিই হবে মূল বিবেচ্য।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বা প্রত্যর্পণ—যে পথেই হোক—এটি শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ঘটনা হবে না। এটি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং পররাষ্ট্রনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
যদি অভিযোগের বিচার হয় স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায়, যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ পান, যদি রাজনৈতিক বিরোধীদের অধিকার রক্ষা করা হয় এবং যদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করতে পারে, তাহলে এই ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরির সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, যদি বিচার ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রতিশোধ, পক্ষপাত কিংবা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সঙ্গে মিশে যায়, তাহলে তা দেশের বিভাজন আরও গভীর করতে পারে।
ইতিহাস কাউকে স্থায়ীভাবে নায়ক কিংবা খলনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নয়; ইতিহাসের কাজ হলো ঘটনা, প্রমাণ, সিদ্ধান্ত ও পরিণতি বিশ্লেষণ করা।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন বা প্রত্যর্পণকে বাংলাদেশ কি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্য নির্ধারণের ঘটনা হিসেবে দেখবে, নাকি এমন একটি সুযোগ হিসেবে দেখবে, যেখানে আইনের শাসন, রাজনৈতিক জবাবদিহি ও সব নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে নতুন করে ঐকমত্য গড়ে তোলা সম্ভব?

