44
আইনের চোখে সমতা, নাকি ক্ষমতার কাছে ভিন্ন বাস্তবতা?
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, ঘুষের অভিযোগ, দেশত্যাগ ও বিমানবন্দরে বাধা—জবাবদিহির প্রশ্নে নতুন বিতর্ক
আলাপচারিতা | সময়ের কথনবিশ্লেষণী প্রতিবেদন | ৪ নভেম্বর ২০২৬
বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও জন-আস্থার সংকট

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) হয়ে ওঠে বিচার, জবাবদিহি এবং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিষ্পত্তির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। এই ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে জনসাধারণের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী—যেখানে কেবল অপরাধীদের বিচারই হবে না, বরং প্রতিষ্ঠিত হবে স্বচ্ছ ও প্রশ্নাতীত এক বিচারিক সংস্কৃতি।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে কয়েকটি ঘটনা জনমনে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একদিকে কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক প্রসিকিউটরের নির্বিঘ্নে দেশত্যাগ, অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন সাবেক নেতাকে বিমানবন্দরে আটকে দেওয়ার ঘটনা—এই দুই বিপরীতমুখী বাস্তবতা একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে: আইনের শাসন কি সবার জন্য সমান, নাকি ব্যক্তির পরিচয়, অবস্থান ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে আইনের প্রয়োগ পরিবর্তিত হয়?
আবেগ কিংবা রাজনৈতিক প্রচারণার ঊর্ধ্বে উঠে ঘটনাগুলোকে তথ্য, বিদ্যমান আইন এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির আলোকে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
১. কোটি টাকা ঘুষের অভিযোগ: তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই দেশত্যাগ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারকে ঘিরে কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অডিও রেকর্ডিংয়ের সূত্র ধরে অভিযোগ ওঠে, চট্টগ্রামের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের কাছ থেকে মামলায় জামিনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার বিনিময়ে এক কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল।
অভিযোগটি সামনে আসার পর সাইমুম রেজা পদত্যাগ করেন এবং কর্তৃপক্ষ তা গ্রহণ করে। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পাঁচ সদস্যের একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হয়। ১১ মার্চ ২০২৬ তারিখে সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ২৪ নিশ্চিত করে যে, কমিটি তাদের তদন্তকাজ শুরু করেছে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ৩ নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সেই তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখেনি।
এরই মধ্যে ৩ নভেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাইমুম রেজা তালুকদার গত ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ ত্যাগ করে ইতালি চলে গেছেন। প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, সাইমুমের বিদেশযাত্রায় কোনো আদালতের নিষেধাজ্ঞা না থাকায় তাঁর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার ট্রাইব্যুনাল কর্তৃপক্ষের ছিল না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, তদন্ত কমিটির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং তাঁরা প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছেন।
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্লেষণ: আইনের দৃষ্টিতে কোনো অভিযোগ তদন্তাধীন থাকা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। চূড়ান্ত প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না। কিন্তু প্রশ্নটি ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা ও গতিশীলতা নিয়ে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের একজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও প্রায় আট মাসে কেন তদন্ত শেষ হলো না? তদন্তের এই দীর্ঘসূত্রতা এবং এরই ফাঁকে অভিযুক্ত ব্যক্তির দেশত্যাগ স্বাভাবিকভাবেই জনমনে সংশয় তৈরি করে।
২. সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের বিদেশ সফর: তথ্য বনাম প্রচারণা
আলোচনার সমান্তরালে সাবেক প্রধান প্রসিকিউটর মুহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিদেশযাত্রার বিষয়টিও জনপরিসরে উঠে এসেছে। তবে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার খাতিরে এখানে তথ্যগত স্পষ্টতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
সরকারি নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর আইন ও বিচার বিভাগ থেকে মুহাম্মদ তাজুল ইসলামকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা সফরের জন্য আনুষ্ঠানিক সরকারি অনুমতি (জিও) প্রদান করা হয়েছিল। ওই আদেশে ২০ অক্টোবর থেকে ৯ নভেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত অথবা যাত্রার তারিখ থেকে ২১ দিনের অনুমোদিত সফরের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। সুতরাং, তাঁর সেই সফরটি ছিল সম্পূর্ণ দাপ্তরিক ও সরকার অনুমোদিত—এটিকে সাম্প্রতিক অননুমোদিত দেশত্যাগের ঘটনা কে পলায়ন বলছেন।
৩. মাহদী হাসানকে বিমানবন্দরে বাধা: জামিন কি বিদেশযাত্রার নিশ্চয়তা?

মুদ্রার অপর পিঠে দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। গত ৮ অক্টোবর ২০২৬ রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিদেশযাত্রার সময় বাধাপ্রাপ্ত হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাবেক সদস্যসচিব মাহদী হাসান। ঢাকা ট্রিবিউন ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর জ্যামাইকা যাওয়ার কথা থাকলেও পাসপোর্টে ‘স্টপ-লিস্ট’ চিহ্নিত থাকায় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাঁকে আটকে দেয়।
মাহদী হাসানের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোতে তিনি আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন। তা সত্ত্বেও তাঁকে যেতে দেওয়া হয়নি এবং পুলিশ তাঁকে বিদেশযাত্রার জন্য আদালতের বিশেষ অনুমতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
আইনি ব্যাখ্যা: এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন সামনে আসে—মামলায় জামিনে থাকলেই কি একজন নাগরিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদেশে যাওয়ার অধিকার পান? আইনগত উত্তর হলো—সব ক্ষেত্রে নয়। জামিন অর্থ কেবল বিচারাধীন মামলায় নির্দিষ্ট শর্তে কারাগারের বাইরে মুক্ত থাকা। কিন্তু কোনো ব্যক্তির বিদেশযাত্রার ওপর আদালতের পৃথক নিষেধাজ্ঞা, পাসপোর্ট-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কিংবা আইনসম্মত প্রশাসনিক আদেশ থাকলে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁকে আটকাতে পারে। তবে আইনের শাসনের মূল শর্ত হলো, এই ধরনের বাধার পেছনে সুনির্দিষ্ট বৈধ কারণ এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের লিখিত আদেশ থাকতে হবে। মাহদী হাসানের ক্ষেত্রে ঠিক কোন আইনি বা প্রশাসনিক আদেশের ভিত্তিতে ‘স্টপ-লিস্ট’ কার্যকর করা হয়েছিল, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা গণমাধ্যমে আসেনি।
৪. দুই ঘটনার তুলনামূলক চিত্র: প্রশ্নটি কি দ্বৈত মানদণ্ডের?
সাইমুম রেজা তালুকদারের নির্বিঘ্ন দেশত্যাগ এবং মাহদী হাসানের বিমানবন্দরে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার ঘটনা দুটি পাশাপাশি রাখলে প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
| তুলনার ক্ষেত্র | সাইমুম রেজা তালুকদার | মাহদী হাসান |
| পরিচয় | সাবেক প্রসিকিউটর, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল | সাবেক নেতা, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন |
| সংশ্লিষ্ট অভিযোগ/মামলা | এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ (তদন্তাধীন) | বিচারাধীন মামলা (জামিনে থাকার দাবি) |
| বিদেশযাত্রার পরিস্থিতি | ৩১ অক্টোবর ইতালি গমন | ৮ অক্টোবর জ্যামাইকা যাওয়ার পথে বিমানবন্দরে বাধা |
| কর্তৃপক্ষের অবস্থান | বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ছিল না | আদালতের অনুমতি নেওয়ার পরামর্শ প্রদান |
| প্রকাশিত তথ্যের ঘাটতি | ৮ মাসেও তদন্ত প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ | স্টপ-লিস্টে রাখার সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি অস্পষ্ট |
এই তুলনা থেকে সরাসরি এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন হবে না যে, কেবল রাজনৈতিক কারণেই একজনকে যেতে দেওয়া হয়েছে এবং অন্যজনকে আটকানো হয়েছে। কিন্তু নীতিগত প্রশ্নটি অত্যন্ত জোরালো: একজন সাধারণ নাগরিক বা আন্দোলনকারীর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নজরদারি ও ‘স্টপ-লিস্ট’ যতটা তৎপর, খোদ ট্রাইব্যুনালের মতো প্রতিষ্ঠানের একজন সাবেক কর্মকর্তার গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে সেই তৎপরতা অনুপস্থিত কেন?
৫. দুই বছরের শাসনামল: পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। গত দুই বছরে জন-আকাঙ্ক্ষার মূল কেন্দ্রে ছিল এমন এক রাষ্ট্রীয় কাঠামো, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষমতার মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজস্ব আইনি শক্তিতে কাজ করবে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ওপর দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। কারণ এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল অতীতের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করছে না, বরং বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার পুনর্জন্ম ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রতীক হিসেবে কাজ করছে। যখন এমন একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ তদন্ত ঝুলে থাকে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারেন, তখন তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকে না—পুরো বিচারপ্রক্রিয়ার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
রাষ্ট্রে আইনের শাসন সুসংহত করতে তিনটি মৌলিক স্তম্ভ অপরিহার্য:
-
সময়সীমাবদ্ধ জবাবদিহি: বিচারিক বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তার তদন্ত হতে হবে দ্রুত, স্বাধীন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে। অনির্দিষ্টকালের তদন্ত মূলত বিচারহীনতারই নামান্তর।
-
আইনের সমান প্রয়োগ: অভিযুক্ত ব্যক্তি ট্রাইব্যুনালের সাবেক কর্মকর্তা হোন কিংবা প্রান্তিক কোনো রাজনৈতিক কর্মী—আইনের ছাঁকনি সবার জন্য একই হতে হবে।
-
প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা: বিমানবন্দরে কাউকে আটকানো হলে তার সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি যেমন প্রকাশ করা জরুরি, তেমনি গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির ক্ষেত্রে কেন দেশত্যাগের নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হলো না, তারও যৌক্তিক ব্যাখ্যা জনগণের সামনে আসা উচিত।
৬. বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় করণীয়
জনমনে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
১. তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ: সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে গঠিত ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ করা। ২. ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ: তদন্তে ঘুষ দাবির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে কেবল পদত্যাগেই সীমাবদ্ধ না থেকে প্রচলিত আইনে ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা। ৩. সহযোগীদের চিহ্নিতকরণ: এই প্রক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনালের ভেতরের বা বাইরের অন্য কোনো কর্মকর্তা বা মধ্যস্থতাকারীর সংশ্লিষ্টতা থাকলে তাঁদের নাম ও ভূমিকা প্রকাশ করা। ৪. স্টপ-লিস্টের নীতিমালা স্পষ্টকরণ: বিমানবন্দরে নাগরিকদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন কর্তৃপক্ষ, কোন আইনি প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে—তার একটি স্বচ্ছ ও লিখিত মানদণ্ড নিশ্চিত করা। ৫. স্বাধীন নজরদারি: প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি স্থায়ী ও স্বাধীন অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা (ওভারসাইট) ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
রাষ্ট্রের শক্তি প্রতিশোধে নয়, ন্যায়বিচারে
বাংলাদেশের গত দুই বছরের রাজনৈতিক রূপান্তর নাগরিকদের সামনে একটি গভীর দর্শনগত প্রশ্ন রেখে গেছে—আমরা কি কেবল শাসকের পরিবর্তন চেয়েছিলাম, নাকি শাসনতান্ত্রিক সংস্কৃতির পরিবর্তন চেয়েছিলাম?
যদি ক্ষমতার পালাবদলের পরও তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা, প্রাতিষ্ঠানিক অস্বচ্ছতা এবং ব্যক্তিভেদে আইনের ভিন্ন প্রয়োগ অব্যাহত থাকে, তবে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। কোনো সন্দেহ নেই যে, কেবল অভিযোগ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবির ভিত্তিতে কাউকে দণ্ডিত করা যায় না; আবার একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা ব্যক্তিদের দায়মুক্তির সুযোগও দেওয়া যায় না।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার ডান্ডাবেড়ি বা স্টপ-লিস্টে নয়, বরং তার নৈতিক ও বিচারিক স্বচ্ছতায়। অপরাধী যে-ই হোক তাকে আইনের আওতায় আনা, নির্দোষের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো—এই ত্রিবিধ নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।
তথ্যসূত্র: ১. Ex-ICT prosecutor leaves country as bribery probe remains incomplete — প্রকাশিত প্রতিবেদন, ৩ নভেম্বর ২০২৬। ২. Sacked ICT prosecutor Saimum leaves Bangladesh for Italy — জাগো নিউজ, ৩ নভেম্বর ২০২৬। ৩. ICT fact-finding committee starts probing bribe allegation against former prosecutor — বিডিনিউজ২৪.কম, ১১ মার্চ ২০২৬। ৪. Ex-student movement leader Mahdi Hasan stopped at Dhaka airport — ঢাকা ট্রিবিউন, ৯ অক্টোবর ২০২৬। ৫. Habiganj student leader Mahdi stopped at Dhaka airport over travel ban — দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ৯ অক্টোবর ২০২৬। ৬. মুহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিদেশ সফরের সরকারি মঞ্জুরি আদেশ (জিও) — আইন ও বিচার বিভাগ, বাংলাদেশ সরকার, ২৯ অক্টোবর ২০২৪।
(সম্পাদকীয় নোট: এই বিশ্লেষণী প্রতিবেদনটি প্রকাশিত সংবাদ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এবং সরকারি নথির তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।)

