ইতিহাসের স্মৃতিভ্রম ও ক্ষমতার মেরুকরণ: ‘কাফের-ই-আজম’ থেকে জিন্নাহর রাজনৈতিক পুনর্বাসন- ইতিহাসের পাতা থেকে


“আপনারা স্বাধীন; আপনারা স্বাধীন আপনাদের মসজিদে, মন্দিরে বা অন্য যেকোনো উপাসনালয়ে যেতে… রাষ্ট্রের কাজের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই।”
রাজনৈতিক সুবিধা বনাম ঐতিহাসিক সত্য
যাঁরা একসময় জিন্নাহকে ধর্মহীন আখ্যা দিয়েছিলেন, আজ তাঁদের ভাবাদর্শের উত্তরসূরিরা যদি জিন্নাহকে ধর্মের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তবে তা ইতিহাসের সঙ্গে স্পষ্ট দ্বিচারিতা।
এটি মূলত এক ধরনের ‘Selective Amnesia’ বা সুবিধাজনক বিস্মৃতি—যেখানে নিজের নেতার ব্যর্থ বা বিতর্কিত অবস্থান আড়াল করতে শত্রুকেও মরণোত্তরভাবে নিজের শিবিরের লোক বানিয়ে তোলা হয়। জিন্নাহ কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্র চাননি, আবার মওদুদীও কোনো আধুনিক গণতান্ত্রিক পাকিস্তান চাননি। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে জিন্নাহর ‘চেহারা’ আর মওদুদীর ‘কাঠামো’ এক করে এক অদ্ভুত ঐতিহাসিক মিশ্রণ তৈরি করা হয়েছে।
বর্তমানের রাজনৈতিক বয়ান ও ইতিহাস
আজকে যখন জিন্নাহকে ধর্মীয় বীর বা মুসলমানদের ‘একমাত্র অবিসংবাদিত নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন মূলত তাঁর জটিল রাজনৈতিক রূপান্তর এবং সেক্যুলার ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে আড়াল করা হয়।
-
যারা তাঁকে কট্টর ধর্মীয় আইকন বানান, তারা ভুলে যান যে সমসাময়িক রক্ষণশীল ইসলামি নেতারা (যেমন আবুল আ’লা মওদুদী কিংবা জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ) জিন্নাহর রাজনীতি ও জীবনযাত্রাকে ইসলামসম্মত মনে করতেন না।
-
আবার যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষার প্রশ্নে জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভুল এবং পূর্ব বাংলার ওপর চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক বৈষম্যকে মুছে ফেলে তাঁকে নতুন করে আদর্শায়িত করতে চান, তারা ইতিহাসের বস্তনিষ্ঠ বাস্তবতার চেয়ে সাময়িক রাজনৈতিক মেরুকরণকেই বেশি প্রশ্রয় দেন।
জিন্নাহকে মূল্যায়ন করতে হবে একজন দক্ষ ও চতুর সাংবিধানিক আইনজীবী হিসেবে, যিনি ধর্মতত্ত্ববিদ না হয়েও সংখ্যালঘু রাজনীতির দাবায় ধর্মীয় পরিচিতিকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন।
-
ধর্মীয় স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে:“You are free; you are free to go to your temples, you are free to go to your mosques or to any other place of worship in this State of Pakistan. You may belong to any religion or caste or creed — that has nothing to do with the business of the State.”(অনুবাদ: আপনারা স্বাধীন; আপনারা আপনাদের মন্দিরে যেতে স্বাধীন, আপনারা আপনাদের মসজিদে কিংবা এই পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভেতরে অন্য যেকোনো উপাসনালয়ে যেতে স্বাধীন। আপনারা যে কোনো ধর্ম, বর্ণ বা বিশ্বাসের অনুসারী হতে পারেন—রাষ্ট্রের কাজের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।)
-
নাগরিক সমতা ও রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে:“We are starting with this fundamental principle that we are all citizens and equal citizens of one State… Now, I think we should keep that in front of us as our ideal and you will find that in course of time Hindus would cease to be Hindus and Muslims would cease to be Muslims, not in the religious sense, because that is the personal faith of each individual, but in the political sense as citizens of the State.”(অনুবাদ: আমরা এই মৌলিক নীতি নিয়ে শুরু করছি যে আমরা সবাই একই রাষ্ট্রের নাগরিক এবং সমান নাগরিক… সময়ের আবর্তে হিন্দু আর হিন্দু থাকবে না এবং মুসলমান আর মুসলমান থাকবে না—ধর্মীয় অর্থে নয়, কারণ সেটা প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়, বরং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে রাজনৈতিক অর্থে।)
-
দলিল উৎস:
-
Constituent Assembly of Pakistan Debates, Volume 1, No. 2, 11 August 1947.
-
Speeches and Statements of Quaid-i-Azam Mohammad Ali Jinnah (1947–1948), Government of Pakistan.
-
-
জিন্নাহ ও মুসলিম লীগের নেতৃত্ব প্রসঙ্গে:“মুসলিম লীগের বড় নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ কর্মী পর্যন্ত কারোরই চিন্তা বা মানসিকতা ইসলামি ধাঁচের নয়… সমগ্র বিশ্ব জানে যে প্রথম ভদ্রলোকের (জিন্নাহর) ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। তাঁর সমস্ত জ্ঞান পশ্চিমা আইন ও উৎস থেকে আহরিত।”— তরজমানুল কোরআন, নভেম্বর ১৯৩৯, পৃষ্ঠা ৭৯।
-
‘মুসলিমদের কাফের সরকার’ ও নাপাকিস্থান প্রসঙ্গে:“এমন এক পাকিস্তান তৈরি হতে যাচ্ছে যা মূলত ‘মুসলিমদের কাফের সরকার’ (Kafir government of Muslims) প্রতিষ্ঠা করবে… যে ভূখণ্ডের পরিকল্পনা আপনারা করছেন তা স্রষ্টার দৃষ্টিতে আরও অপবিত্র এবং অভিশাপের যোগ্য, কারণ সেখানে মুসলিমরা অবিকল অমুসলিমদের মতোই কাজ করছে। এটি পাকিস্তান নয়, ‘না-পাকি-স্তান’।”— তরজমানুল কোরআন, মার্চ ১৯৪১ (পৃষ্ঠা ২৯) এবং মে-জুন ১৯৪০ (পৃষ্ঠা ১১)।
-
জাতীয়তাবাদকে ‘শিরক’ আখ্যা প্রসঙ্গে:“ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদ একটি পাশ্চাত্য ধারণা, যা ইসলামের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। জাতীয় গণতন্ত্র গ্রহণ করা মানে মক্কার প্রাচীন জাহেলি যুগের এক মূর্তির বদলে আরেক মূর্তির পূজা করা।”— মাসয়ালা-ই-কওমিয়্যাত (জাতীয়তাবাদের সমস্যা), ১৯৩৯।
-
মুসলিম লীগকে ‘জামায়াতে জাহেলিয়াত’ ও নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার আহ্বান:“মুসলিম লীগ মূলত ‘ইসলামের হুকুমত’ চায় না, তারা চায় ‘মুসলিমের হুকুমত’। এটি কোনো ইসলামি আন্দোলন নয়, বরং একটি ‘জামায়াতে জাহেলিয়াত’। ধর্মনিরপেক্ষ কোনো দলের পক্ষে ভোট দেওয়া মানে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের পরিপন্থী অবস্থান নেওয়া।”— তরজমানুল কোরআন, জুলাই ১৯৩৯ (পৃষ্ঠা ৫) এবং রাসায়েল ও মাসায়েল (খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩০৪–৩০৬)।
-
দলিল উৎস:
-
মাসিক তরজমানুল কোরআন (১৯৩৯–১৯৪৬ সংকলন)।
-
সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী, মুসলমান আওর মওজুদা সিয়াছি কশমকশ (Muslims and the Present Political Struggle), খণ্ড ১–৩, পাঠানভোট/লাহোর।
-
সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী, রাসায়েল ও মাসায়েল (Rasa’il wo Masa’il), খণ্ড ১, মার্কাজি মাকতাবা, দিল্লি।
-

