পাসপোর্ট বাতিল বনাম নাগরিকত্বের অধিকার: শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক আইনের ব্যবচ্ছেদ
আলাপচারিতা
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরছেন? রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের পাশাপাশি বিষয়টি এখন নিছক রাজনৈতিক তর্কে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি একটি গভীর সাংবিধানিক, আইনি ও কূটনৈতিক প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে, পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট ছাড়া কিংবা কেবল ‘আসামি হিসেবে প্রত্যর্পণ’ ছাড়া তিনি দেশে ফিরতে পারবেন না—এমন দাবির বিপরীতে বাংলাদেশের সংবিধান, উচ্চ আদালতের নজির এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন আসলে কী বলছে, তা নির্মোহভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বিষয়টিকে রাজনৈতিক বাগ্যুদ্ধের বাইরে এনে সাংবিধানিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ এবং কূটনৈতিক প্রটোকলের নিরিখে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মূল যুক্তিগুলোর নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ এবং ‘আলাপচারিতা’ একটি গবেষণাধর্মী নিবন্ধ নিচে তুলে ধরা হলো।
১. তাত্ত্বিক ও আইনি বিশ্লেষণ
গবেষণামূলক দৃষ্টিকোণ থেকে এর শক্তিশালী দিক এবং আইনি সূক্ষ্মতাগুলো হলো:
-
নাগরিকত্ব বনাম পাসপোর্ট (Citizenship vs. Travel Document): বক্তব্যের সবচেয়ে শক্তিশালী আইনি যুক্তি হলো—কূটনৈতিক বা ‘রেড পাসপোর্ট’ বাতিল হওয়া মানে নাগরিকত্ব বাতিল হওয়া নয়। পাসপোর্ট হলো আন্তর্জাতিক ভ্রমণের একটি নথি মাত্র, কিন্তু নাগরিকত্ব হলো রাষ্ট্রের সাথে ব্যক্তির মৌলিক ও সাংবিধানিক সম্পর্ক। যেহেতু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে বিচার প্রক্রিয়া চলমান, সেহেতু রাষ্ট্র নিজেই তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে নিচ্ছে।
-
সাংবিধানিক অধিকার ও এর সূক্ষ্মতা (অনুচ্ছেদ ৩৬): বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে নাগরিকের অবাধ চলাফেরা এবং দেশে পুনঃপ্রবেশের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে গবেষণাধর্মী লেখায় একটি আইনি সূক্ষ্মতা উল্লেখ রাখা জরুরি—৩৬ অনুচ্ছেদের শুরুতেই বলা আছে, “জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে”। কিন্তু আন্তর্জাতিক ও সাংবিধানিক আইনশাস্ত্র অনুযায়ী, কোনো নাগরিককে নিজ দেশে ঢুকতে না দেওয়া কোনোভাবেই ‘যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ’ (Reasonable Restriction)-এর আওতায় পড়ে না; কারণ তা ব্যক্তিকে কার্যত রাষ্ট্রহীন (Stateless) করার শামিল।
-
আন্তর্জাতিক সনদের বাধ্যবাধকতা (ICCPR ও UDHR): বক্তব্যে জাতিসংঘের ICCPR-এর ১২(৪) অনুচ্ছেদ এবং UDHR-এর ১৩(২) অনুচ্ছেদ সঠিকভাবে উদ্ধৃত হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির (UN Human Rights Committee) General Comment No. 27 অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্রই তার নাগরিককে পাসপোর্ট না থাকার অজুহাতে বা নির্বাহী আদেশে স্বদেশে ফিরতে বাধা দিতে পারে না। বাংলাদেশ ২০০০ সালে ICCPR-এ অনুস্বাক্ষর করেছে, তাই আন্তর্জাতিকভাবে এই ধারা মানতে রাষ্ট্র অঙ্গীকারবদ্ধ।
-
প্রত্যাবর্তনের বাস্তবতা ও কূটনৈতিক সমীকরণ: আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (ICAO ও IATA) নিয়ম অনুযায়ী, বৈধ ট্রাভেল ডকুমেন্ট ছাড়া সাধারণ বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্স কোনো যাত্রী পরিবহন করে না। বক্তব্যে যথার্থই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, বাণিজ্যিক ফ্লাইটের এই সীমাবদ্ধতা থাকলেও দুই দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সমঝোতা, বিশেষ বিমান বা স্থলপথে নিজ দেশের সীমান্তে উপস্থিত হলে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র নিজ নাগরিককে গ্রহণ করতে বাধ্য।
নাগরিকত্ব এবং পাসপোর্টের আইনি পার্থক্য
প্রথমেই একটি মৌলিক আইনি বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেখ হাসিনা এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট বা ‘রেড পাসপোর্ট’ বাতিল করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইন অনুযায়ী, পাসপোর্ট বাতিল হওয়া এবং নাগরিকত্ব বাতিল হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। পাসপোর্ট হলো একটি রাষ্ট্রীয় ভ্রমণ নথি (Travel Document), যা একজন নাগরিককে বিদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে পরিচয় ও সুরক্ষা প্রদান করে। অন্যদিকে নাগরিকত্ব হলো ব্যক্তির সাথে রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য আইনি ও সাংবিধানিক সম্পর্ক।
শেখ হাসিনার নাগরিকত্ব বাতিল হয়নি। বস্তুত, বাংলাদেশের বিচারালয়ে তাঁর বিরুদ্ধে যে আইনি প্রক্রিয়া বা বিচারের কথা বলা হচ্ছে, তার মূল ভিত্তিই হলো তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। নাগরিকত্ব বহাল থাকা অবস্থায় কেবল পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট না থাকার অজুহাতে কোনো নাগরিককে নিজ দেশে প্রবেশে বাধা দেওয়া যায় কি না, তার সুস্পষ্ট উত্তর রয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধানে এবং উচ্চ আদালতের একাধিক ঐতিহাসিক রায়ে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ ও উচ্চ আদালতের নজির (Case Laws)
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার অংশে ৩৬ নম্বর অনুচ্ছেদে চলাফেরার স্বাধীনতা সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—“জনস্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধে চলাফেরা, ইহার যে কোন স্থানে বসবাস ও বসতিস্থাপন এবং বাংলাদেশ ত্যাগ ও বাংলাদেশে পুনঃপ্রবেশ করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।”
সংবিধানের এই ৩৬ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা এবং পাসপোর্ট ও নাগরিকত্বের অধিকার নিয়ে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সুপ্রতিষ্ঠিত কিছু নজির (Judicial Precedents) রয়েছে:
-
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বনাম বাংলাদেশ [(2001) 21 BLD (AD) 69 / 7 BLC (AD) 67]: এই ঐতিহাসিক মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দেন যে, পাসপোর্ট পাওয়া এবং চলাফেরার অধিকার সরকারের কোনো ‘দয়া বা বিশেষ সুবিধা’ (Privilege) নয়; বরং এটি সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদের অধীনে নাগরিকের একটি মৌলিক অধিকার। আদালত স্পষ্ট করেন যে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো ছাড়া কেবল নির্বাহী আদেশে বা রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো নাগরিকের পাসপোর্ট জব্দ বা চলাফেরার অধিকার খর্ব করা সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
-
বাংলাদেশ সরকার বনাম জিনাত হোসেন [(1996) 1 BLC (AD) 89]: এই মামলায় আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত দেন যে, কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা বা আপিল বিচারাধীন থাকার অজুহাতে Bangladesh Passport Order, 1973-এর ক্ষমতাকে খেয়ালখুশিমতো বা একচ্ছত্রভাবে (Arbitrarily) ব্যবহার করে পাসপোর্ট বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করা যায় না। নির্বাহী বিভাগের এমন স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত সংবিধানের ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ৩২ (জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার) এবং ৩৬ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।
-
বাংলাদেশ বনাম অধ্যাপক গোলাম আযম [(1994) 46 DLR (AD) 192]: নাগরিকত্ব ও স্বদেশে অবস্থান সংক্রান্ত এই বহুল আলোচিত রায়ে আপিল বিভাগ নীতিগতভাবে প্রতিষ্ঠা করেন যে, নাগরিকত্ব একটি মৌলিক আইনি সত্তা, যা পাসপোর্ট থাকা বা না থাকার ওপর নির্ভরশীল নয়। কোনো নাগরিকের স্বদেশে প্রবেশ ও বসবাসের অধিকার তাঁর নাগরিকত্বের সাথেই জড়িত এবং নির্বাহী বিভাগের সাধারণ আদেশে তা কেড়ে নেওয়া যায় না।
সংবিধানের ৭ ও ২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৌলিক অধিকারের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত বা নির্বাহী আদেশ আইনগতভাবে অকার্যকর (Void)। ফলে কোনো দায়িত্বশীল পদে থেকে যদি দাবি করা হয় যে, কোনো নাগরিককে দেশে ফিরতে দেওয়া হবে না, তবে সেই অবস্থান সরাসরি সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রতিষ্ঠিত নজিরের পরিপন্থী। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের বিরুদ্ধে যদি শত অভিযোগও থাকে, তবুও তাঁর স্বদেশে প্রবেশের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করার এখতিয়ার কোনো নির্বাহী আদেশের নেই; বরং দেশে প্রবেশের পর তিনি প্রচলিত আইনের মুখোমুখি হবেন এবং ন্যায়বিচার প্রার্থনা করবেন—এটিই আইনের শাসনের মূলকথা।
আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের General Comment No. 27
একটি আধুনিক রাষ্ট্র কেবল অভ্যন্তরীণ আইন দিয়ে পরিচালিত হয় না; আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে তাকে আন্তর্জাতিক সনদ ও কনভেনশনও মেনে চলতে হয়। নাগরিকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনে দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী দলিল রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ নিজেও একটি স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র:
১. সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র (UDHR, ১৯৪৮): এর ১৩(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষেরই যেকোনো দেশ ত্যাগ করার এবং নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করার অধিকার রয়েছে। ২. নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ (ICCPR, ১৯৬৬): বাংলাদেশ ২০০০ সালে এই চুক্তিতে অনুস্বাক্ষর (Ratify) করেছে। এই সনদের ১২(৪) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “No one shall be arbitrarily deprived of the right to enter his own country”—অর্থাৎ, কাউকে খেয়ালখুশিমতো বা যথেচ্ছভাবে তাঁর নিজ দেশে প্রবেশের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।
এই ১২(৪) অনুচ্ছেদের আনুষ্ঠানিক ও প্রামাণ্য ব্যাখ্যা প্রদান করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি (UN Human Rights Committee) তাদের ১৯৯৯ সালের General Comment No. 27 (UN Doc. CCPR/C/21/Rev.1/Add.9) দলিলে:
-
অনুচ্ছেদ ১৯ ও ২০ (Paragraphs 19–20): এতে বলা হয়েছে, নিজ দেশে প্রবেশের অধিকারটি রাষ্ট্রের সাথে ব্যক্তির বিশেষ সম্পর্কের স্বীকৃতি দেয়। এই অধিকারের অর্থ কেবল বিদেশ ভ্রমণের পর দেশে ফেরার অধিকারই নয়, বরং এটি যেকোনো ধরনের ‘বাধ্যতামূলক নির্বাসন’ (Enforced Exile) নিষিদ্ধ করে।
-
অনুচ্ছেদ ২১ (Paragraph 21): এখানে ‘যথেচ্ছভাবে’ (Arbitrarily) শব্দটির ব্যাখ্যায় মানবাধিকার কমিটি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছে—“এমন কোনো পরিস্থিতি কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব, যেখানে কোনো নাগরিককে তার নিজ দেশে প্রবেশের অধিকার থেকে বঞ্চিত করাকে ‘যুক্তিসঙ্গত’ বলা যেতে পারে।” (The Committee considers that there are few, if any, circumstances in which deprivation of the right to enter one’s own country could be reasonable.) এতে আরও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আইনগত, প্রশাসনিক বা বিচারিক—কোনো পদক্ষেপের মাধ্যমেই রাষ্ট্র তার নাগরিককে স্বদেশে ফিরতে বাধা দিতে পারে না এবং পাসপোর্ট বা ভ্রমণ নথি কেড়ে নিয়ে কাউকে নিজ দেশে ফেরা থেকে বিরত রাখা সরাসরি ১২(৪) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।
আন্তর্জাতিক আইনের এই বাধ্যবাধকতা কেবল বিদেশিদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপের ক্ষমতা দেয়, কিন্তু নিজ দেশের নাগরিকের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে বাধ্য করে তাঁকে সীমান্তে গ্রহণ করতে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী ১০ ডিসেম্বর ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস’-এর দিনটি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যেদিন বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রগুলো মানবাধিকার রক্ষার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে, সেদিন একজন নাগরিকের স্বদেশে ফেরার অধিকারের প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
কূটনৈতিক বাস্তবতা ও ভ্রমণের কারিগরি দিক
আইনি অধিকারের পাশাপাশি বাস্তব প্রক্রিয়াটিও বিবেচনার দাবি রাখে। সাধারণত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাগুলো (ICAO ও IATA বিধি মোতাবেক) বৈধ পাসপোর্ট বা ট্রাভেল ডকুমেন্ট ছাড়া যাত্রী পরিবহন করে না। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রপরিচালক হিসেবে শেখ হাসিনা যদি প্রচলিত নিয়মের প্রতি সম্মান জানিয়ে ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা যে বিমানযোগে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল তা ফেরত চান, সেটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক রীতির অংশ।
কিন্তু আইনি বাস্তবতা হলো, ট্রাভেল ডকুমেন্ট ইস্যু না করলেও একজন নাগরিকের দেশে ফেরার পথ রুদ্ধ হয় না। উল্লেখ্য যে, শেখ হাসিনা ভারতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের বিমানবাহিনীর বিমানে এবং ভারতের আনুষ্ঠানিক অনুমতিক্রমে। ফলে ভারত ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে বিশেষ বিমানে কিংবা স্থল ও জলপথে নিজ দেশের সীমান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক এয়ারলাইন্সের ট্রাভেল ডকুমেন্টের বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য নয়। এমনকি ভারত সরকারও কূটনৈতিক প্রটোকল অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকারকে জানাতে পারে যে, আশ্রিত ব্যক্তি স্বেচ্ছায় স্বদেশে ফিরতে ইচ্ছুক এবং তাঁর নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা হোক।
রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন
আইনি তর্কের বাইরেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের অসম্মানজনক শব্দচয়ন ও বাচনভঙ্গি কেবল রাজনৈতিক শিষ্টাচারকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সব মিলিয়ে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বা না ফেরার বিষয়টি যতটা না আইনি বাধার ওপর নির্ভরশীল, তার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল সার্বিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিবেশের ওপর। জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নটি এখানে বাংলাদেশ সরকার, ভারত সরকার এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—সকলের জন্যই একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু নিরেট সংবিধান, উচ্চ আদালতের নজির ও আন্তর্জাতিক আইনের বিচারে এটি স্পষ্ট যে, পাসপোর্ট বা সরকারি অনুমতি না থাকার অজুহাতে বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের অধিকারকে অবৈধ ঘোষণা করার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই।
তথ্যসূত্র ও আইনি রেফারেন্স : ১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৭, ২৬, ৩২ এবং ৩৬। ২. Hussain Muhammad Ershad v. Bangladesh, Civil Appeal No. 123 of 2000, (2001) 21 BLD (AD) 69; 7 BLC (AD) 67. ৩. Government of Bangladesh v. Zeenat Hossain, (1996) 1 BLC (AD) 89. ৪. Bangladesh v. Prof. Golam Azam, (1994) 46 DLR (AD) 192. ৫. International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR), 1966, Article 12(4). ৬. UN Human Rights Committee (HRC), CCPR General Comment No. 27: Article 12 (Freedom of Movement), 2 November 1999, UN Doc. CCPR/C/21/Rev.1/Add.9, paras. 19–21. ৭. Universal Declaration of Human Rights (UDHR), 1948, Article 13(2).

