বাংলাদেশকে ঘিরে দিল্লির নতুন কৌশল: তিন পরাশক্তির ছায়ায় বদলে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া?

তিন পরাশক্তির সমর্থনের দাবি কতটা সত্য? ঢাকা–দিল্লি টানাপোড়েন, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ওয়াশিংটন–মস্কোর কৌশল—কোন সমীকরণে দাঁড়িয়ে আছে দিল্লি ও ঢাকা?
আলাপচারিত | বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন সবসময় প্রকাশ্য ঘোষণায় আসে না। কখনও তা বোঝা যায় রাষ্ট্রপ্রধানদের সফর থেকে, কখনও প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে, কখনও সীমান্ত আলোচনার ভাষা থেকে। আবার কখনও একটি দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সম্পর্কের অবনতিই প্রকাশ করে—আঞ্চলিক শক্তির হিসাব বদলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান সম্পর্ক সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
গোলাম মাওলা রনির ইউটিবে উপস্থাপিত বক্তবে মূলত দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সেখানে বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও রাশিয়ার পরিবর্তিত সমীকরণের একটি গভীর বিশ্লেষণ। বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টি কীভাবে কাজ করছে, তা এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
১. পরাশক্তিগুলোর আকস্মিক কূটনৈতিক তৎপরতা
ভিডিওর শুরুতে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের চীন সফর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের রাশিয়া সফরের তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সাথে জয়শঙ্করের বৈঠকের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বিশ্লেষণ করে রনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই বৈঠকগুলো রুটিন কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনা নয়, বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি কোনো ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণের অংশ।
২. রাশিয়ার ঐতিহাসিক নস্টালজিয়া ও বর্তমান ক্ষোভ
-
১৯৭১ এর প্রেক্ষাপট: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে । কিউবা ক্রাইসিসের পর বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছাড়া বিশ্বমঞ্চে সোভিয়েত ইউনিয়ন সেভাবে আর কোথাও সরাসরি শক্তি প্রদর্শন করেনি, যা বাংলাদেশের প্রতি তাদের ঐতিহাসিক নস্টালজিয়া প্রমাণ করে।
-
রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প ও আস্থার সংকট: রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ার বিপুল অর্থের বিনিয়োগ রয়েছে। পারমাণবিক প্রযুক্তির মতো স্পর্শকাতর বিষয় কেবল চরম আস্থাশীল রাষ্ট্রকেই দেওয়া হয় । কিন্তু এই প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতি এবং সরাসরি পুতিন বা রাশিয়াকে জড়িয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে যে সমালোচনা হচ্ছে, তাতে রাশিয়া অত্যন্ত ক্ষুব্ধ [12:00]। রনির মতে, নতুন সরকার বা জামায়াত-বিএনপির প্রতি রাশিয়ার এক ধরনের বিরক্তি তৈরি হয়েছে।
৩. চীনের বিশাল বিনিয়োগ ও উইঘুর নিরাপত্তা উদ্বেগ
-
অর্থনৈতিক ঝুঁকি: বাংলাদেশে চীনের শত শত কোম্পানি এবং সরকারের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীলতায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি তাদের লভ্যাংশ বা ঋণ ফেরত নিতে না পারে বা দেউলিয়া হয়ে যায়, তবে চীন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না ।
-
জঙ্গিবাদ ও উইঘুর ইস্যু: এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলামি চরমপন্থার উত্থান এবং অতীতে সাইমুম সিরিজের মতো জনপ্রিয় উপন্যাসে চীনের উইঘুর মুসলিমদের পক্ষে জিহাদের যে রোমান্টিসিজম তৈরি করা হয়েছে, তা নিয়ে চীন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন । বাংলাদেশ থেকে চরমপন্থীরা আফগানিস্তান হয়ে জিনজিয়াং প্রদেশে প্রবেশ করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে চীন তাদের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
৪. ভারতের স্বার্থ এবং পশ্চিমা ও আইএসআই ফ্যাক্টর
গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে ভারত সরকার, এক্সিম ব্যাংক ও আদানি গ্রুপের মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ২০-৩০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে । পাশাপাশি, বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতিতে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আইএস বা অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থানের আশঙ্কা ভারতকে শঙ্কিত করছে। এছাড়া, বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তার এবং পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে ভারত, চীন ও রাশিয়া—এই তিন পরাশক্তি তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ভুলে এক বিন্দুতে মিলছে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে ।
ভিডিওটির মূল বার্তা হলো—বাংলাদেশ বর্তমানে পরাশক্তিগুলোর এক জটিল দাবাখেলার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যদি এই বিপুল বিদেশী বিনিয়োগের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় এবং দেশে চরমপন্থার উত্থান ঘটে, তবে ভারত, চীন ও রাশিয়া তাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় যৌথভাবে কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
সম্প্রতি রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনির এ ভিডিওতে “দিল্লিতে বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে”, “মহা অ্যাকশন” এবং “তিন পরাশক্তির সমর্থন ভারতের দিকে”—এমন একটি ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। প্রশ্ন হলো, এর পেছনে বাস্তব ভূরাজনৈতিক ভিত্তি কতটা?
আলাপচারিতার অনুসন্ধানে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে তা হলো—ভারতের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন একই সঙ্গে অবস্থান নিয়েছে—এমন সরল সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রমাণ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে ভারত এমন একটি কৌশলগত অবস্থান তৈরি করেছে, যেখানে Washington-এর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, Moscow-এর সঙ্গে ঐতিহাসিক অংশীদারিত্ব এবং Beijing-এর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি কূটনৈতিক যোগাযোগ—সবকিছু একসঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে।
আর এই পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যের কেন্দ্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বাংলাদেশ।
১. ২০২৪-এর পর যে সম্পর্ক আর আগের জায়গায় নেই
বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, পানি ও উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে সংযোগ—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত।
কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সম্পর্কের চরিত্র বদলে যায়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান নেওয়ার পর তাঁর প্রত্যর্পণ, ভারতে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক—এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
আগস্ট ২০২৬-এ এই দ্বন্দ্ব আবার প্রকাশ্যে আসে।
শেখ হাসিনা দিল্লি থেকে একটি ভার্চুয়াল বক্তব্য দেওয়ার পরিকল্পনা করলে বাংলাদেশ ভারতকে এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানায়। ভারত জানায়, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজন এবং ভারত সরকারের এতে কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
ঘটনাটি ছোট মনে হলেও এর কূটনৈতিক তাৎপর্য বড়।
কারণ ঢাকার প্রশ্ন ছিল শুধু—শেখ হাসিনা কী বলবেন?
বরং বড় প্রশ্নটি ছিল—
ভারতের মাটি কি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে?
আর দিল্লির উত্তর ছিল—
এটি ভারত সরকারের অনুষ্ঠান নয়।
এই দুই অবস্থানের মধ্যেই বর্তমান সম্পর্কের অবিশ্বাসের গভীরতা ধরা পড়ে।
২. তবে একই সময়ে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টাও চলছে
এখানেই পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য।
একদিকে শেখ হাসিনা ইস্যুতে উত্তেজনা, অন্যদিকে ঢাকা ও দিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে।
আগস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি “conducive environment” বা অনুকূল পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
এরপর ভারতের সম্ভাব্য সফর নিয়েও আলোচনা শুরু হয়।
২১ আগস্ট Reuters জানায়, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে আলোচনা চললেও তখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি এবং ঢাকা ভারতের পক্ষ থেকে কিছু বিষয় পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায় ছিল।
অর্থাৎ সম্পর্ক ভেঙে পড়েনি।
বরং দুই দেশই সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা বুঝছে।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উত্তেজনা যতই বাড়ুক, ভূগোল তাদের পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগ দেয় না।
৩. তাহলে ‘দিল্লির মহা অ্যাকশন’ বলতে কী বোঝায়?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে ‘অ্যাকশন’ শব্দটিকে সামরিক অর্থে না দেখে কূটনৈতিক অর্থে দেখা প্রয়োজন।
ভারত বাংলাদেশে সামরিক অভিযান বা বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে না।
বরং প্রকাশ্য তথ্য থেকে যে বিষয়গুলো দেখা যাচ্ছে, সেগুলো হলো—
- কূটনৈতিক যোগাযোগ;
- নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা;
- শেখ হাসিনা ইস্যুতে অবস্থান পরিষ্কার করা;
- সীমান্ত ও নিরাপত্তা প্রশ্নে যোগাযোগ;
- বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা;
- বাংলাদেশের চীনা ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ।
অর্থাৎ দিল্লির সম্ভাব্য “অ্যাকশন” যদি কিছু হয়, সেটি আপাতত কূটনৈতিক ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস।
৪. ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা: একসঙ্গে বহু শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক
“তিন পরাশক্তির সমর্থন”—এই দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখানেই যাচাই করা দরকার।
যদি তিন পরাশক্তি বলতে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনকে বোঝানো হয়, তাহলে তিনটি দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের প্রকৃতি একেবারেই এক নয়।
যুক্তরাষ্ট্র: অংশীদারিত্ব
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কৌশলগত সম্পর্ক গত কয়েক দশকে অনেক গভীর হয়েছে।
প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, Indo-Pacific, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং চীনকে ঘিরে আঞ্চলিক ভারসাম্যের প্রশ্নে দুই দেশের স্বার্থের উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
২৮ আগস্ট ২০২৬-এ ভারতীয় সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে Javelin অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি চূড়ান্ত করেছে বলে Reuters জানিয়েছে।
এটি শুধু একটি অস্ত্র কেনার ঘটনা নয়; ভারত–যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যে ক্রমেই গভীর হচ্ছে, এটি তার আরেকটি দৃষ্টান্ত।
তবে এখান থেকে বলা যাবে না যে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সব আঞ্চলিক সিদ্ধান্তের সমর্থক।
Washington-এর নিজস্ব স্বার্থ রয়েছে।
বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও।
৫. বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি: Washington ও Delhi—দুজনেরই হিসাব
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গভীর হয়েছে।
২০২৬ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং অবকাঠামো প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
এর আগে Reuters-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে চীনের অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
এই বিষয়টি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
অন্যদিকে Washington-এর কাছেও বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে।
ফলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের কিছু জায়গায় মিল তৈরি হতে পারে—বিশেষত চীনের প্রভাবের প্রশ্নে।
কিন্তু এটিও মনে রাখা জরুরি:
বাংলাদেশকে চীন থেকে দূরে রাখা আর বাংলাদেশকে ভারতের প্রভাববলয়ে নিয়ে আসা—দুটি একই বিষয় নয়।
বাংলাদেশের নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্তের জায়গা আছে।
৬. রাশিয়া: ভারতের মিত্র, কিন্তু বাংলাদেশের শত্রু নয়
ভারত–রাশিয়া সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পুরোনো কৌশলগত সম্পর্ক।
প্রতিরক্ষা, পারমাণবিক শক্তি, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে Moscow ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
কিন্তু রাশিয়াকে “ভারতের পক্ষে দাঁড়ানো একটি শক্তি” বলেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অবস্থান নির্ধারণ করা ঠিক হবে না।
রাশিয়া বাংলাদেশের সঙ্গেও অর্থনৈতিক, জ্বালানি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্পর্ক বজায় রাখে।
এখানে Moscow-এর মূল কৌশল হচ্ছে—
একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা।
তাই রাশিয়ার ভারতঘনিষ্ঠতা বাস্তব, কিন্তু বাংলাদেশবিরোধিতা তার স্বাভাবিক ফল নয়।
৭. চীনকে ভারতের সমর্থক বলা কেন বিভ্রান্তিকর?
এই জায়গাতেই “তিন পরাশক্তির সমর্থন” তত্ত্ব সবচেয়ে বেশি দুর্বল।
ভারত ও চীন এশিয়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি।
দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত বিরোধ রয়েছে।
২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর সম্পর্ক গুরুতরভাবে অবনতি হয়েছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশ উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে।
২৫ আগস্ট ২০২৬-এ চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল বেইজিংয়ে সীমান্ত ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। দুই দেশ সীমান্ত সমস্যার একটি “fair, reasonable and mutually acceptable” সমাধানের সন্ধান চালিয়ে যাওয়ার কথা জানায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে।
চীন ও ভারত একে অপরের বন্ধু হয়ে যায়নি; তারা সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।
দুই দেশই বুঝতে পারছে, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত তাদের অর্থনীতি ও বৃহত্তর কৌশলগত স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে।
ফলে ভারত একই সময়ে—
চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী এবং চীনের সঙ্গে আলোচনাকারী।
এটাই আধুনিক ভূরাজনীতির বাস্তবতা।
৮. ভারতের ‘বহুমুখী কূটনীতি’ই কি আসল শক্তি?
সম্ভবত হ্যাঁ।
ভারতের বর্তমান কৌশলকে একক কোনো জোটের অংশ হিসেবে দেখা কঠিন।
ভারত—
- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা করছে;
- রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখছে;
- চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়াচ্ছে;
- মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে;
- Indo-Pacific কাঠামোতে সক্রিয় রয়েছে।
এটি ভারতের জন্য একটি বড় কৌশলগত সুবিধা।
অন্যদিকে বাংলাদেশ যদি শুধু একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তার কূটনৈতিক স্বাধীনতা কমতে পারে।
৯. বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন: ‘ভারত বনাম বাংলাদেশ’ নয়
বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু বাংলাদেশ–ভারত দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।
এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—
বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক
বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক
বাংলাদেশ–রাশিয়া সম্পর্ক
বাংলাদেশ–পাকিস্তান সম্পর্ক
বাংলাদেশ–মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্ক
এবং সর্বোপরি—
বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতি।
বাংলাদেশের ভূগোল তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
এ কারণেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন অনেক বড় শক্তির হিসাবের অংশ।
১০. মক্কা চুক্তি: ঢাকার কৌশলগত স্বাধীনতার পরীক্ষা
২৫ আগস্ট Reuters জানায়, বাংলাদেশ সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন Mecca Pact-এ যোগ দেওয়ার বিষয় বিবেচনা করতে পারে। চুক্তিটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামো।
এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরীক্ষা।
কারণ পাকিস্তান ভারতের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি।
ঢাকা যদি পাকিস্তানসহ একটি প্রতিরক্ষা কাঠামোর অংশ হয়, তাহলে দিল্লি সেটিকে নিছক বাংলাদেশের একটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখবে না।
ভারতের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় এর প্রভাব পড়বে।
একটি প্রতিরক্ষা কাঠামো কি বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাড়াবে, নাকি তাকে বড় শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে আরও গভীরভাবে টেনে নেবে? এ প্রশ্ন হয়ত প্রশ্নের উত্তর হয়তসময় বলে দেবে।
১১. ‘চীনপন্থী বাংলাদেশ’—এই ধারণাটিও কতটা সত্য?
২০২৪-এর পর বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের গুরুত্ব বেড়েছে—এটি বাস্তব।
কিন্তু বাংলাদেশের নতুন সরকার একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।
এরপর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টা দেখা যায়।
অর্থাৎ ঢাকার কৌশলকে এখন পর্যন্ত “চীনপন্থী” অথবা “ভারতপন্থী”—একটি মাত্র শব্দে ব্যাখ্যা করা যায় না।
বরং একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে:
বাংলাদেশ একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ বাড়াতে চাইছে।
১২. দিল্লির সামনে আসল সমস্যা কোথায়?
ভারতের জন্য বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা সামরিক নয়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আস্থার সংকট।
বাংলাদেশের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক জনমনে ভারত সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের নিরাপত্তা মহলে বাংলাদেশের চীন, পাকিস্তান বা অন্যান্য শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
এই দুই ধরনের উদ্বেগ একে অপরকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশ ভাবে—
ভারত কি আমাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে সম্মান করবে?
ভারত ভাবে—
বাংলাদেশ কি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগকে গুরুত্ব দেবে?
এই দুই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে না।
১৩. শেখ হাসিনা ইস্যু: সবচেয়ে কঠিন কূটনৈতিক গিঁট
বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা ইস্যুটি এখনও কেন্দ্রীয়।
Reuters-এর আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন এবং তিনি বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন।
এটি ভবিষ্যতে আরও বড় কূটনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
কারণ তাঁর প্রত্যাবর্তন শুধু আইনি বিষয় হবে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে—
- রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া;
- নিরাপত্তা;
- আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ;
- ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক;
- আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রশ্ন;
- বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা।
অতএব শেখ হাসিনা ইস্যুটি আগামী দিনেও ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগুলোর একটি হয়ে থাকবে।
১৪. বাংলাদেশ কী করতে পারে?
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে strategic autonomy—অর্থাৎ কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন।
এর অর্থ কোনো শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়।
বরং—
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে।
কিন্তু কোনো একটি শক্তি যেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ওপর একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে না পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান নীতি হতে পারে:
বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, নির্ভরতা কারও ওপর নয়।
১৫. বাংলাদেশের ভূগোল—সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক শক্তি এখনো ভারতের বা চীনের সমপর্যায়ের নয়।
সামরিক শক্তিতেও বাংলাদেশ আঞ্চলিক পরাশক্তি নয়।
কিন্তু বাংলাদেশের ভূগোল তাকে একটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিকটবর্তী অবস্থান এবং সমুদ্রবন্দর—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে।
এই ভূগোলকে যদি বাংলাদেশ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে বড় শক্তির প্রতিযোগিতা তার জন্য বিপদ নয়—সুযোগও হতে পারে।
কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ এবং সুসংহত পররাষ্ট্রনীতি।
১৬. আগামী দিনের তিন সম্ভাব্য দৃশ্যপট
দৃশ্যপট এক: ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের পুনর্মিলন
দুই দেশ শেখ হাসিনা ইস্যুসহ কঠিন বিষয়গুলো আলাদা করে আলোচনা করে বাণিজ্য, সীমান্ত, জ্বালানি, পানি ও যোগাযোগে নতুন সমঝোতায় যেতে পারে।
এটি সবচেয়ে স্থিতিশীল পথ।
দৃশ্যপট দুই: প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য
বাংলাদেশ ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে একযোগে সম্পর্ক বাড়াবে।
বাংলাদেশ তখন দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ “swing state” হয়ে উঠতে পারে।
দৃশ্যপট তিন: আঞ্চলিক মেরুকরণ
বাংলাদেশ যদি কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে পড়ে এবং ভারত সেটিকে সরাসরি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন মেরুকরণ তৈরি হতে পারে।
এটি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি।
১৭. তাহলে ভিডিওর ‘তিন পরাশক্তি’ তত্ত্বের সত্যতা কতটুকু?
তথ্য যাচাই করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত দাঁড়ায়।
| দাবি | অনুসন্ধানের ফল |
|---|---|
| দিল্লির কৌশলগত তৎপরতা বাড়ছে | প্রমাণিত প্রবণতা |
| বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক টানাপোড়েনে আছে | প্রমাণিত |
| ভারত–যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে | প্রমাণিত |
| রাশিয়া ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার | প্রমাণিত |
| চীন ভারতের সমর্থক হয়ে গেছে | প্রমাণিত নয় |
| চীন–ভারত উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা করছে | প্রমাণিত |
| বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বাড়ছে | প্রমাণিত প্রবণতা |
| বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে চাইছে | প্রমাণিত |
| ভারত বাংলাদেশে সামরিক ‘মহা অ্যাকশন’ নিতে যাচ্ছে | নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ নেই |
| দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে | শক্তিশালীভাবে সমর্থিত |
দিল্লির ‘মহা অ্যাকশন’ নয়, আসল ঘটনা শক্তির পুনর্বিন্যাস
গোলাম মাওলা রনির আলোচিত বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে, কারণ এটি এমন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে যা দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু তথ্যের আলোকে “তিন পরাশক্তি ভারতের পেছনে”—এই দাবিকে সরল সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কৌশলগত অংশীদার।
রাশিয়া ভারতের দীর্ঘদিনের কৌশলগত সহযোগী।
কিন্তু চীন ভারতের মিত্র নয়; বরং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি, যে একই সঙ্গে সংঘাত নিয়ন্ত্রণ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। আগস্ট ২০২৬-এর সীমান্ত আলোচনাই তার প্রমাণ।
অন্যদিকে বাংলাদেশও কোনো একক শক্তির দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে যায়নি।
ঢাকা চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ রাখছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করছে এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গেও সম্পর্ক বিস্তৃত করছে।
এখানেই দক্ষিণ এশিয়ার নতুন বাস্তবতা।
এটি ভারত বনাম বাংলাদেশ-এর সরল দ্বন্দ্ব নয়।
এটি—
ভারত বনাম চীন,
যুক্তরাষ্ট্র বনাম চীনের বৃহত্তর প্রতিযোগিতা,
রাশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য,
বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব,
এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক মূল্য—
সবকিছুর সমন্বিত ফল।
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশকে কি কেবল নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখা হবে, নাকি সমমর্যাদার কৌশলগত অংশীদার হিসেবে?
বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন আরও কঠিন:
বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে কি নিজের বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে দেওয়া হবে, নাকি সেটিকে জাতীয় উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বাধীনতার জন্য কাজে লাগানো হবে?
দক্ষিণ এশিয়ার আগামী দশকের রাজনীতিতে এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সামরিক ক্ষমতা নয়।
তার শক্তি হলো—
ভূগোল।
আর ভারতের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সুবিধা শুধু তার সামরিক শক্তি নয়।
তার সুবিধা হলো—
একই সময়ে একাধিক পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করার সক্ষমতা।
তাই ভবিষ্যতের লড়াই সম্ভবত কোনো একটি দেশের “মহা অ্যাকশন” দিয়ে নির্ধারিত হবে না।
নির্ধারিত হবে—
কে কাকে কতটা বিশ্বাস করতে পারে, কে কতটা কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারে এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নতুন ভূরাজনীতিতে কে নিজের জাতীয় স্বার্থ সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
এই কারণেই বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কোনো একটি শক্তির ছায়ায় দাঁড়ানো নয়—
নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখা।
আর দিল্লির জন্যও সবচেয়ে বাস্তবসম্মত কৌশল হতে পারে চাপের পরিবর্তে আস্থা তৈরি করা।
কারণ শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শুধু দিল্লি বা ঢাকার হাতে থাকবে না।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে—
বেইজিং, ওয়াশিংটন, মস্কো, রিয়াদ, আঙ্কারা এবং বঙ্গোপসাগর।
এটাই নতুন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।

