১০ এপ্রিল ১৯৭১, শনিবার ১২ চৈত্র ১৩৭৭ থেকে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গণপ্রজতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জন্ম ইতিহাস


স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র: ১০ এপ্রিল ১৯৭১ প্রণীত ঘোষণাপত্রটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান, যা স্বাধীনতাকে আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি প্রদান করে
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বলতে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার বা মুজিবনগর সরকার কর্তৃক ১০ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে প্রণীত একটি ঘোষণাপত্র বোঝায় যাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণাপত্র প্রচার করা হয়। ইংরেজিতে এটিকে বলা হয়েছিল “প্রোক্লেমেশন অব ইনডিপেনডেন্স”। এর মাধ্যমে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল বাংলাদেশ নামে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুসারে ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস কারণ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান ।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি -ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম (অংশবিশেষ)
বাংলার মানুষের সংগ্রাম মানবতার পক্ষে ও হিংস্র ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। সকল গণতন্ত্রকামী মানুষ ও সরকারের সহায়তা আমরা চাই। একটি সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উপলব্ধি করি। কেননা ভারত সরকারের সঙ্গে একটি সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে আমাদের কথা বলা উচিত। এদিকে সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন ফ্রন্ট থেকে চাপ আসা অব্যাহত রয়েছে। সরকার গঠন করার ব্যাপারে তাজউদ্দীন ভাইকে খুবই চিন্তিত মনে হয়। অস্ফুট স্বরে তিনি বলে ফেললেন বঙ্গবন্ধু আমাকে কী বিপদে ফেলে গেলেন। আমি বিরক্তির সঙ্গে জানতে চাইলাম, সরকার গঠন করার ব্যাপারে তাজউদ্দীন ভাই দ্বিধাগ্রস্ত কেন? জবাবে তাজউদ্দীন ভাই বলেন, আপনি আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি জানেন না।
সরকার গঠন করার প্রয়োজনীয়তার কথা বুঝি। জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই তা প্রয়োজন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও অন্য নেতাদের অনুপস্থিতিতে সরকার গঠন করে নাজুক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। আমার সরল মনের কাছে দেশের এমন একটি ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা রাজনৈতিক চেতনার দিক দিয়ে প্রথম ও প্রধান কর্তব্য বলে মনে হয়। তাজউদ্দীন ভাই আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, কাকে নিয়ে সরকার গঠন করা হবে? আমি স্বাভাবিক উত্তর দিলাম। বঙ্গবন্ধু সরকার গঠন করে রেখে গেছেন। আমি বললাম, যে ৫ জন নিয়ে বঙ্গবন্ধুর হাই কমান্ড গঠন করেছিলেন, এই ৫ জনকে নিয়েই সরকার গঠন করা হবে। দলীয় প্রধান বঙ্গবন্ধু, সাধারণ সম্পাদক ও তিনজন সহসভাপতি নিয়ে এই হাই কমান্ড পূর্বেই গঠিত হয়েছিল। তাজউদ্দীন ভাই পুনরায় প্রশ্ন করেন, প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? দ্বিধা না করে এবারও জবাব দিলাম, ২৫শে মার্চের পর থেকে আজ পর্যন্ত যিনি প্রধান দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনিই স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দায়িত্ব পালন করবেন। তাজউদ্দীন ভাই অনেকক্ষণ ভাবলেন।
আমার প্রস্তাবের যৌক্তিকতা কোনোভাবেই তিনি নাকচ করতে পারলেন না। তিনি এত বেশি কেন ভাবছিলেন তার উত্তর জানতে আমার অনেক সময় লেগেছিল। তাজউদ্দীন ভাই নিষ্ঠাবান ও সংগ্রামী পুরুষ। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দল ও দেশের স্বার্থে কাজ করতেন। নিজে বেশির ভাগ কাজ করেও তিনি কৃতিত্বের দাবি করতেন না। সকল কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে তিনি নিজেকে সর্বদাই দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাই আমি যখন বিপ্লবী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার নেয়ার জন্যে তাকে প্রস্তাব করি তখন এই প্রস্তাব মেনে নিতে তাঁর খুবই কষ্ট হচ্ছিল। এই দায়িত্বের গুরুভার সম্পর্কেও তিনি সচেতন ছিলেন। এই অবস্থায় তিনি আবার আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কথা স্মরণ করেন। তাঁরা কে কোথায় কী অবস্থায় আছেন, এ নিয়ে তিনি বিশেষভাবে চিন্তা করছেন। পত্রিকায় ইতোমধ্যে অনেকের মৃত্যুসংবাদ পরিবেশিত হয়েছে। অবশ্য পত্রিকায় প্রকাশিত নিহতের তালিকায় তাজউদ্দীন ভাই এবং আমার নামও রয়েছে।
নিহতের তালিকায় আমাদের দুজনের নাম দেখে ভেবেছিলাম, আমাদের নেতারাও হয়তো জীবিত রয়েছেন। আমাদের আরও চিন্তা হলো বঙ্গবন্ধুকে প্রধান করা হলে আমাদের আন্দোলনের ব্যাপারে কী প্রতিক্রিয়া হবে। অথবা তার জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কারণ দেখা দেবে কিনা। এ নিয়ে দুজনে অনেক রাত পর্যন্ত আলোচনা করি। পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি দিই আবার খণ্ডন করি। শেষ সিদ্ধান্ত নিলাম, ফলাফল যাই হোক, বঙ্গবন্ধুকে সরকারের রাষ্ট্রপতি করতে হবে। তাজউদ্দীন ভাই বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে বঙ্গবন্ধুর সহকর্মী হিসেবে তাঁর সঙ্গে কাজ করেছি। তবে এই ব্যাপারে আমি স্থির নিশ্চিত যে কোনো প্রকার ভয়ভীতি বা চাপের মাধ্যমে পাক সরকার বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে কোনো বিবৃতি দিতে সমর্থ হবে না। আমরা যেহেতু একটি যুদ্ধে লিপ্ত ছিলাম এবং বঙ্গবন্ধু তখন শত্রুর কারাগারে বন্দী, কাজেই সে সময়ে আমাদের সব কিছুই ভাবতে হয়েছিল। তাছাড়া ভাবাভাবির বেশি সময়ও ছিল না। কেননা আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। একটা সরকার গঠন করা ছাড়া কাজ এগুনো যাচ্ছে না। মুক্তিযুদ্ধের সিপাহশালার শত্রুর হাতে বন্দী। আবার তাঁকে বাদ দিয়ে যে মুক্তিযুদ্ধের কথা কল্পনাও করা যায় না। তারপর কথা উঠল দেশের নাম কী হবে। আমি বললাম, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। তাজউদ্দীন ভাইয়ের পছন্দ হলো। নামটি ঠিক করার সময় আমাদের মাথায় গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের কথা মনে হচ্ছিল। এ সময় সরকারি কাগজপত্রে ব্যবহারের জন্য একটি মনোগ্রাম ঠিক করা দরকার। মনোগ্রাম আমাদেরই ঠিক করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের যে মনোগ্রাম সরকারি কাগজপত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা আমার হাতে আঁকা। চারপাশে গোলাকৃতি লালের মাঝখানে সোনালি রঙের মানচিত্র। মনোগ্রাম দেখে তাজউদ্দীন ভাই পছন্দ করলেন। শুধু তাই নয়, সঙ্গে সঙ্গে তিনি তা অনুমোদনও করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি তাঁর প্রথম সরকারি অনুমোদন। এই দিন সন্ধ্যার পর রেহমান সোবহান, ড. আনিসুর রহমান আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এলেন। রেহমান সোবহান এর আগে একবার দেখা করে গেছেন। এ সময় আনিসুর রহমান স্বচক্ষে দেখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাক বাহিনীর নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দেন। তিনি নিজের বাসার গেটে তালা ঝুলিয়ে অন্যদিক দিয়ে বাসায় ঢুকে স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে নিয়ে বাসার মেঝেতে শুয়ে রাত কাটান এবং জানালা দিয়ে সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ড দেখেন। পাক দস্যুরা তার বাসার গেটে দরজায় তালা দেখে চলে যায়। সারাদিন আমি তাজউদ্দীন ভাইয়ের বক্তৃতা তৈরি করছি। রেহমান সোবহান বক্তৃতার খসড়া রচনায় আমাকে সহায়তা করেন। সেদিনই তার কাছে জানতে পারি যে, ড. কামাল হোসেন গ্রেপ্তার হয়েছেন। রেহমান সোবহান জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করবেন। তাঁর ইংরেজি খসড়ার একটা অংশ আমার খুব ভালো লেগেছিল। সেটা ছিল Pakistan is dead and burried under mountain of corpses। বাংলায় এর অনুবাদ করি ।
পর্বতপ্রমাণ লাশের নিচে পাকিস্তানের কবর রচিত হয়েছে। শেষ অনুচ্ছেদে আমি লিখি। আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা, ছেলেদের রক্ত ও ঘামে মিশে জন্ম নিচ্ছে নতুন বাংলাদেশের। এক সময় চোখের জলে বক্তৃতার খসড়ার এক অংশ ভিজে গেল। চোখ মুছে আবার লিখতে শুরু করি।
লেখা শেষ হলে সমস্ত বক্তৃতাটা তাজউদ্দীন ভাইকে শোনাই। রাজনৈতিক খসড়া প্রণয়নে তাজউদ্দীন ভাই খুবই দক্ষ। একটি খসড়া করার পর তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, মাথা নাড়তেন, কোনো স্থানে থেমে নিজের বক্তব্য স্পষ্ট করে বলতেন। প্রয়োজনবোধে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতেন। এমনিভাবে চূড়ান্ত বক্তব্য তৈরি হতো। আমাদের দুজনের মন ও চিন্তা যেন একইভাবে কাজ করছিল। আমার হাতের লেখা খুব ভালো নয়। তাজউদ্দীন ভাইয়ের বক্তৃতা টেপ করতে হবে। আমি একটি টেপ রেকর্ডারের ব্যবস্থা করি। তিনি সমস্ত বক্তৃতা নিজের হাতে লিখে নিলেন। চট্টোপাধ্যায় তার নিজের হাতে আরও একটি কপি করে নেন। তখন তিনজনের হাতে বক্তৃতার তিনটি কপি হয়ে গেল। পরদিন তাজউদ্দীন ভাই দ্বিতীয়বারের মতো ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। ইন্দিরা গান্ধী জানান, বঙ্গবন্ধুকে বন্দী করে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অবশ্য এই খবর পাকিস্তান সরকার তখনও সরকারিভাবে প্রকাশ করেনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাজউদ্দীন ভাই বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন। সিদ্ধান্ত হয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার ভারতের মাটিতে অবস্থান করতে পারবে। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, তাদের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ এবং শরণার্থীদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর প্রচারের জন্য একটি বেতার স্টেশন স্থাপনের বিষয়ও আলোচনা হয়। তাঁদের খোঁজখবর নেয়ার জন্য একটি ছোট বিমানের ব্যবস্থা করা হলো। স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তা করার জন্য ভারত সরকার একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলকে আমাদের সঙ্গে দেন। ঐ জেনারেলের নাম নগেন্দ্র সিং। তাঁর বয়স ৬০’র ঊর্ধ্বে। তিনি সামরিক ব্যাপারে আমাদের পরামর্শ দেবেন। জেনারেল সিং মনেপ্রাণে একজন খাঁটি সৈনিক। ব্যক্তিগত জীবনে খুবই ধর্মপ্রাণ। তাছাড়া মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ। আমাদের সংগ্রামের প্রতি তিনি আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাশীল। দিল্লিতে বসেই তাজউদ্দীন ভাইয়ের বক্তৃতা টেপ করা হয়। বক্তৃতার পূর্বে আমার কণ্ঠ থেকে ঘোষণা প্রচারিত হয়, এখন তাজউদ্দীন আহমদ জাতির উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেবেন। এরপর তাজউদ্দীন ভাই বক্তৃতা শুরু করেন। আমরা বিমানে করে আবার কলকাতা ফিরে এলাম। এখানে এসে জানলাম মনসুর ভাই ও কামরুজ্জামান (হেনা) ভাই এসেছেন। তাঁদের কথা শুনে কিছুটা স্বস্তি পেলাম। খবর নিয়ে জানলাম কলকাতায় গাজা পার্কের কাছে বাড়িতে কামরুজ্জামান ভাই থাকেন।
শেখ ফজলুল হক মনি ঐ বাড়িতে আছেন। পরে আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমদ ও সিরাজুল ইসলাম খান এই বাড়িতে ঘাঁটি করেন।
আমি ওতাজউদ্দীন ভাই ঘটনাবলি ব্যক্ত করি। কামরুজ্জামান ভাইয়ের মনে একটা জিনিস ঢোকানো হয়েছে যে আমরা তাড়াহুড়ো করে দিল্লি গিয়ে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেছি নেতাদের জন্য অপেক্ষা করা আমাদের উচিত ছিল। শেখ মনি আমাকে অন্য একটি ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন। তিনি আমাকে এটা বোঝালেন যে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আমাদের বিলম্বে সাক্ষাৎ হওয়ার কারণ হলো তাঁরা এখান থেকে ক্লিয়ারেন্স দেননি। তিনি বোঝাতে চাইলেন তাঁরা একটি শক্তিশালী গ্রুপ এবং তাঁদের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর পূর্ব থেকেই যোগাযোগ রয়েছে। আমাদের সরকার গঠনের ব্যাপারে সন্তুষ্ট নন এমন অনেক এমপি, এমএলএ ও আওয়ামী লীগ নেতা কলকাতায় এসেছেন। প্রিন্সেস স্ট্রিটের এমএলও হোস্টেলে ওঁরা উঠেছেন। একটা জিনিস বুঝতে পারলাম আমাদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপে আলাপ-আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে কামরুজ্জামান ভাইকে নিয়ে কতিপয় এমপি ও নেতা প্রিন্সেস স্ট্রিটে একটি বৈঠক করেছেন। আর এত ভালোভাবে সুর মিলিয়েছেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। তাজউদ্দীন ভাই আমাকে ডেকে বললেন, আপনাকে আগেই বলেছিলাম এই দল দিয়ে কি স্বাধীনতা যুদ্ধ হবে?
আমরা বিএসএফ’র লর্ড সিনহা রোডের একটি অফিসে অবস্থান করছি। ভারত সরকার আমাদের নিরাপত্তার জন্য বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। আমরা ভারতের মাটিতে, ইন্দিরা গান্ধীর সরকার এই কথা প্রকাশ করতে রাজি নয়।
আমাদের নেতাদের বিভিন্নমুখী বৈঠকে তাজউদ্দীন ভাই ও আমি বিশেষভাবে বিব্রতবোধ করছি। কামরুজ্জামান ভাই খুবই সুবিবেচক মানুষ। তিনি ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা বললেন। রাতের বেলা লর্ড সিনহা রোডে আমাদের বৈঠক বসল। উপস্থিত বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছিলেন কামরুজ্জামান, মিজান চৌধুরী, শেখ মনি, তোফায়েল আহমদ ও আরও অনেকে। শেখ মনি তাঁর বক্তৃতায় বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শত্রু শিবিরে বন্দী, বাংলার যুবকরা বুকের তাজা রক্ত দিচ্ছে, এখন কোনো মন্ত্রিসভা গঠন করা চলবে না। মন্ত্রী-টন্ত্রী খেলা এখন সাজে না। এখন যুদ্ধের সময়। সকলকে রণক্ষেত্রে যেতে হবে। রণক্ষেত্রে গড়ে উঠবে আসল নেতৃত্ব। এই যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করতে হবে।
তাজউদ্দীন ভাই ও আমি ছাড়া বৈঠকে উপস্থিত প্রায় সকলে শেখ মনির বক্তব্য সমর্থন করেন। তাজউদ্দীন ভাই যেহেতু নিজে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন, তাঁর পক্ষে পাল্টা জবাব দেয়া সম্ভব নয়। তাই শেষ পর্যন্ত আমাকেই উঠে দাঁড়াতে হলো। উপস্থিত প্রায় সকলেরই ধারণা ছিল আমি ও তাজউদ্দীন ভাই আগেভাগে দিল্লি গিয়েছি ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য।
আমি আমাদের দিল্লি যাওয়ার সমর্থনে ও শেখ মনির বক্তব্যের কয়েকটি যুক্তি পেশ করি। আমার প্রথম যুক্তি ছিল, দিল্লি যাত্রার পূর্বে আমাদের জানা ছিল না ।
কারা বেঁচে আছেন এবং কাকে কোথায় পাওয়া যাবে। দ্বিতীয় যুক্তি হলো, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীন ভাই দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কথা বলেছেন। দলের সভাপতি বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কথা বলার এখতিয়ার তাজউদ্দীন ভাইয়ের রয়েছে। তাছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে মাত্র। ভবিষ্যতে আরও আলোচনা হবে। তখন দলের অন্য নেতৃবৃন্দ অংশগ্রহণ করতে সমর্থ হবেন। তৃতীয়ত আমরা বঙ্গবন্ধুর নিয়োজিত হাই কমান্ড নিয়ে অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের পরিকল্পনা করেছি মাত্র।
আমি আরও বললাম, বাংলাদেশ বারো ভূঁইয়ার দেশ। বারোটি বিপ্লবী কাউন্সিল গড়ে ওঠা বিচিত্র কিছু নয়। আমাদের অবশ্যই আইনগত সরকার দরকার। কেননা, আইনগত সরকার ছাড়া কোনো বিদেশি রাষ্ট্র আমাদের সাহায্য করবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একটি নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্ব দেয়ার সুযোগ খুব কমই হয়েছে। স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার অধিকার একটি আন্তর্জাতিক নীতি। যে কোনো জনগোষ্ঠীর তাদের নির্বাচিত সরকার দ্বারা শাসিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বাংলার মানুষের সে গণতান্ত্রিক অধিকারের অবমাননা করেছে। তাই আমাদের সরকার প্রতিষ্ঠার অধিকার হরণই হচ্ছে জনগণের অধিকার হরণ।
শেখ মনির বক্তব্য খণ্ডন করার জন্য দুটি যুক্তি দিলাম। শেখ মনির প্রস্তাবিত বিপ্লবী কাউন্সিল যদি বিভিন্ন মতাবলম্বীরা দুটি, পাঁচটি বা সাতটি গঠন করে তাহলে জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধারা কোনোটির আদেশ মেনে চলবে না। কোন কাউন্সিলের সঙ্গে বিদেশের সরকার সহযোগিতা করবে। এই ক্ষেত্রে একাধিক কাউন্সিল গঠনের সম্ভাবনাই নয় কি?
সরকার প্রতিষ্ঠার অধিকারই হচ্ছে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। আজকে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা না করে অন্য কোনো বিপ্লবী কাউন্সিল গঠন করা হলে জনগণের মৌলিক অধিকারকে অবমাননা করা হবে। সেটা নিশ্চয়ই আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমার বক্তব্যের পর মিজান চৌধুরী ও শেখ মনি ছাড়া উপস্থিত প্রায় সকলে তাদের পূর্বের মনোভাব পরিবর্তন করেন।
কামরুজ্জামান ভাই আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন, শেখ মনির কথানুযায়ী বিপ্লবী পরিষদ গঠন করা যায় কিনা। আমি তাকে বললাম, তা করা হলে যুদ্ধ বিপন্ন হবে। তিনি আমার কথার আর কোনো প্রতিবাদ করলেন না। আমি তাকে বলি তার সঙ্গে দেখা করে আমি বিস্তারিত সবকিছু বলব।
সভার শেষ পর্যায়ে তাজউদ্দীন ভাই বক্তৃতা দেন। উপস্থিত সকলে সরকার গঠন করার ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য মেনে নিলেন। ১০ই এপ্রিল বিভিন্ন অঞ্চল সফরের জন্য আমাদের বের হবার কথা রয়েছে। একটি ছোট্ট বিমানের ব্যবস্থা করা হলো। বিমানটি খুব নিচু দিয়ে উড়তে পারে। বিভিন্ন স্থানে ছিটিয়ে থাকা আমাদের দলীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করা এই সফরের উদ্দেশ্য। মনসুর
ভাই ও কামরুজ্জামান ভাই এবং তোফায়েল আহমদ একই বিমানে আমাদের সঙ্গে যাবেন।
পরদিন খুব ভোরে গাজা পার্কের বাড়িতে কামরুজ্জামান ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করে তাকে বিস্তারিত সবকিছু অবহিত করি। তাঁর সঙ্গে বলতে গেলে আমার আত্মিক যোগাযোগ ছিল। তিনি প্রাণখোলা সহজসরল মানুষ। দুজনে একান্তে প্রায় আধঘণ্টা আলোচনা করি। আলোচনার মাধ্যমে তার মনের জমাট মান অভিমান দূরীভূত হয়ে গেল। বিপ্লবী পরিষদ গঠনের জন্য যুবকদের প্রস্তাব যে অযৌক্তিক ও অবাস্তব এবং এটা যে যুদ্ধের সহায়ক হবে না তা তিনি মেনে নিলেন।
তাজউদ্দীন ভাইয়ের অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারে তার আর কোনো আপত্তি রইল না। আমাদের সঙ্গে বিমানে আগরতলা যাওয়ার জন্য কামরুজ্জামান ভাইকে বললাম, তার পরিবার পরিজন কলকাতার পথে দেশ ত্যাগ করেছেন। এই পরিস্থিতিতে তার এখানে থাকা প্রয়োজন। আমি খুশি মনে বিদায় নিই।
১০ই এপ্রিল। বিমানে আমাদের আগরতলা রওনা হওয়ার কথা। তাজউদ্দীন ভাই, মনসুর ভাই, শেখ মনি, তোফায়েল আহমদ ও আমি লর্ড সিনহা রোড থেকে সোজা বিমানবন্দরে যাই। অন্যদের মধ্যে মি. নগেন্দ্র সিং আমাদের সঙ্গী হলেন। বিমানটি খুবই ছোট এতে বসার মতো ৫/৬টি আসন ছিল।
খুব নিচু দিয়ে বিমান উড়ে যাচ্ছে, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তৈরি অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলোর কয়েকটিতে আমরা নামি। এগুলো বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছাকাছি। একটি বিমানবন্দরে আমরা দুপুরের খাবার খাই। বিএসএফ-এর মাধ্যমে খবর দেয়া হলো কোনো আওয়ামী লীগ নেতার খোঁজ পেলে পরবর্তী কোনো বিমানবন্দরে তৈরি রাখতে।
উত্তরবঙ্গ তথা রাজশাহী, বগুড়া, পাবনা অঞ্চলের কোনো নেতা খুঁজে পাওয়া গেল না। এদের বেশির ভাগ কলকাতা এসে গেছেন। কিছুক্ষণ পর আমরা বাগডোগরা বিমানবন্দরে নামি। সেখান থেকে জিপে করে শিলিগুড়ি যাই। শহর থেকে অনেক ভেতরে সীমান্তের খুব কাছাকাছি একটি বাংলোতে উঠলাম। গোলক মজুমদার এখানে আমাদের অভ্যর্থনা জানান। পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী এখানে কোনো একটি জঙ্গল থেকে গোপন বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে তাজউদ্দীন ভাইয়ের বক্তৃতা প্রচারিত হবে। এসময় তোফায়েল আহমদ কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। শেখ মনি বলে, তোফায়েল আহমদের কলকাতা যাওয়া দরকার। শেখ মনি কিছু নির্দেশসহ তোফায়েল আহমদকে কলকাতা পাঠিয়ে দিলেন।
মনসুর ভাইয়ের জ্বর এসে গেছে। তিনি শুয়ে আছেন। আমি তার পাশে বসে আছি। তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ। প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর পদ নিয়ে তার সঙ্গে আলাপ করলাম। তিনি মত দিলেন তাজউদ্দীন ভাই প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি কোনো আপত্তি করবেন না। এরপর মনসুর ভাই বা কামরুজ্জামান ভাই
প্রধানমন্ত্রী পদের ব্যাপারে আর কোনো প্রশ্ন তোলেননি। পাঁচজন নেতার মধ্যে তিনজনের সঙ্গে আলাপের পর আমার খুব বিশ্বাস হয়েছিল যে, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন ভাইয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বে কোনো আপত্তি করবেন না। তাছাড়া তাকে উপরাষ্ট্রপতি করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এখন বাকি রইল খন্দকার মোশতাক আহমদ। শুধু তিনি আপত্তি করতে পারেন। তবুও চারজন এক থাকলে মোশতাক ভাইকেও রাজি করানো যাবে। এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দীন ভাইয়ের প্রথম বক্তৃতা প্রচার করার পালা। তাজউদ্দীন ভাই প্রচারের জন্য চোখে অনুমতি দিলেন। প্রধানমন্ত্রীর রেকর্ড করার বক্তৃতার ক্যাসেট গোলক মজুমদারের কাছে দেয়া হলো।
শেখ মনি তাজউদ্দীন ভাইয়ের সঙ্গে একান্তে আলাপ করতে চাইলেন। আমি বাইরের ঘরে বিএসএফ-এর আঞ্চলিক কর্মকর্তার সঙ্গে দিনাজপুর ও রংপুর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের অবস্থা ও শত্রুদের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা করলাম। শেখ মনির সঙ্গে কথাবার্তা শেষে তাজউদ্দীন ভাই আমাকে ডাকেন। তিনি জানান, শেখ মনি এখন সরকার গঠনের ব্যাপারে রাজি নন। আগরতলা গিয়ে দলীয় এমপি, এমএলএ ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে শেখ মনি সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছেন। আর এটা না করা হলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।
আমি সরকার গঠনের পক্ষে পুনরায় যুক্তি দিলাম। আমি বললাম সরকার গঠন করতে বিলম্ব হলে সংকট আরও বৃদ্ধি পাবে এবং তাতে ক্ষতির সম্ভাবনাই বেশি। তাছাড়া সরকার গঠনের পরিকল্পনা তো নতুন কিছু নয়। মনসুর ভাই ও কামরুজ্জামান ভাই তাজউদ্দীন ভাইকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নিয়েছেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও খন্দকার মোশতাক আহমেদের তখনও দেখা নেই। তাঁরা কোথায়, কী অবস্থায় আছেন, সে খবর এখনও আসেনি। ইতোমধ্যে বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কিছুটা রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, সরকার গঠনে বিলম্ব হলে তাও নস্যাৎ হবার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার গঠন করার ব্যাপারে ভারত সরকারকে আমরা আশ্বাস দিয়েছি। তাতে বিলম্ব হলে আমাদের নেতৃত্ব সম্পর্কেও তারা সন্দেহ পোষণ করবেন। আমাদের মধ্যে যে কোন্দল রয়েছে কোনো অবস্থাতেই তা বাইরে প্রকাশ হতে দেয়া উচিত নয়। ভারত সরকারও জানেন, আমাদের বক্তৃতা শিলিগুড়ির এই জঙ্গল থেকে আজ প্রচারিত হবে। আমার এসব কথা শেখ মনি মানতে রাজি নন। বেশি করে বোঝাতে চাইলে শেখ মনি জানান, তারা বঙ্গবন্ধু থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। অতএব তাদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে কারও প্রশ্ন তোলা উচিত নয়। এ সময় তাজউদ্দীন ভাই আমাকে বলেন, আমি যেন গোলক মজুমদারকে জানিয়ে দিই যে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা আজ প্রচার করা হবে না। এ ব্যাপারে পরবর্তী সিদ্ধান্ত তাকে যথাসময়ে জানানো হবে।
গোলক মজমুদারকে ফোন করে জানাই যে আজ বক্তৃতা প্রচার করা হবে না। এ কথা শুনে তিনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, বিলম্ব করা ঠিক হবে? তিনি বলেন, যে মুহূর্তে সবকিছু ঠিকঠাক সে মুহূর্তে তা স্থগিত রাখলে সব মহলে যে প্রশ্ন দেখা দেবে, তা আমরা ভেবে দেখছি কিনা। ইতোমধ্যে রেকর্ড করা ক্যাসেট নির্ধারিত স্থানে (জঙ্গলে) পৌছে গেছে।
আমি গোলক মজুমদারকে বললাম ক্যাসেট যদি পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে প্রচার করে দিন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই একটি মাত্র সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েছিলাম। এই দিন ছিল ১০ই এপ্রিল। রেডিও অন করে রেখে খেতে বসেছি। খাওয়ার টেবিলে তাজউদ্দীন ভাই ও শেখ মনি আছেন। রাত তখন সাড়ে ন’টা। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা প্রচারিত হলো। সারা বিশ্ববাসী শুনল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বেতার বক্তৃতা। আমাদের সংগ্রামের কথা দেশ-বিদেশেসেই আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত আসল। প্রথমে আমার কণ্ঠ ভেসে আসল। ঘোষণায় আমি বলেছিলাম, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদ বক্তৃতা দেবেন।
বক্তৃতা প্রচারিত হলো। আমাদের তিনজনের কারও মুখে কোনো কথা নেই। আমি শুধু বললাম, গোলক মজুমদার শেষ পর্যন্ত বক্তৃতা প্রচার বন্ধ করতে পারেননি। মনসুর ভাই খেয়ে আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তিনি বক্তৃতা শুনতে পাননি। পরে একক সিদ্ধান্তে বক্তৃতা প্রচারের জন্য তাজউদ্দীন ভাইয়ের কাছে ক্ষমা ও শাস্তি প্রার্থনা করি। তিনি বলেছিলেন যে, সে সময় আমার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। সেদিন বক্তৃতা প্রচার না করলে গোলমাল আরও বৃদ্ধি পেত বৈকি।
শেখ মনি তাজউদ্দীন ভাইকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাকে প্রধানমন্ত্রী করার ব্যাপারে তিনি আগরতলা গিয়ে সকল প্রকার উদ্যোগ গ্রহণ করবেন। কিন্তু আগরতলা গিয়ে শেখ মনি ভারত সীমান্তের কাছাকাছি কসবাদে সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমের বাড়িতে চলে যান।
তাজউদ্দীন ভাইয়ের বক্তৃতা প্রচারের পর অনেক রাতে কর্নেল (অব.) নুরুজ্জামান (সেক্টর কমান্ডার) ও আবদুর রউফ (রংপুর) আসেন। গভীর রাত পর্যন্ত তাদের সঙ্গে আলোচনা করি। উত্তরবঙ্গে কয়েকটি সেক্টর রয়েছে। একটা সেক্টরের দায়িত্বে রয়েছেন কর্নেল জামান। তারা জানান, গেরিলা কায়দায় আকস্মিক হামলায় শত্রুদের পর্যুদস্ত করা হচ্ছে।
আমি অবাঙালিদের ওপর হামলা না করার পরামর্শ দিলাম। অবাঙালি বিহারিদের ওপর জনগণ ক্ষুব্ধ। রংপুর ও সৈয়দপুরে বেশ কিছু বিহারি রয়েছে। অবশ্য ইতোমধ্যে কোনো কোনো স্থানে এদের ওপর বিছিন্ন হামলা হয়ে গেছে। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব হামলা বন্ধ করার চেষ্টা করছে। অবশ্য অনেকটা শান্ত হয়ে গেছে। আলোচনা করতে করতে রাত প্রায় ভোর হয়ে গেল। ভোরের দিকে তাঁরা দুজন চলে গেলেন। তাদের অনেক কাজ। এক মুহূর্ত সময় নেই। যোদ্ধারা তাদের নির্দেশের অপেক্ষা করছেন। সরকার গঠনে তারা আনন্দ প্রকাশ করলেন।
পরদিন ১১ই এপ্রিল নাশতা করে আমরা বিমানে উঠি। আগের রাতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার পর থেকেই শেখ মনি চুপচাপ রয়েছেন। বক্তৃতার কথা শুনে মনসুর ভাই উৎফুল্ল। রাতের বিশ্রামের পর মনসুর ভাই কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠছেন। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত মনসুর ভাই অবিশ্রান্ত কাজ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কের অবসান হওয়ায় মনসুর ভাই যেন বেশি খুশি।
খুব নিচু দিয়ে আমাদের বিমান উড়ছে। দু’দেশের সীমান্ত সংলগ্ন ছোট ছোট বিমানবন্দরে আমরা স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের খোঁজখবর নিচ্ছি। সৈয়দ নজরুল ইসলামকে বিশেষভাবে খোঁজ করার জন্য ময়মনসিংহ সীমান্তে আমরা খবর দিয়ে রেখেছিলাম। সৈয়দ নজরুলকে পাওয়া যেতে পারে এমন একটি স্থানে গিয়ে প্রথমে শুনলাম, নেতৃস্থানীয় কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে বিএসএফ-এর স্থানীয় অফিসার জানান, ঢালু পাহাড়ের নিচে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও আবদুল মান্নান রয়েছেন। একথা শুনে আমরা ‘ইউরেকা’ বলে আনন্দে লাফিয়ে উঠি।
প্রায় আড়াই ঘণ্টা পরে তাঁরা দুজন আসলেন। নজরুল ভাই জিপ থেকে প্রথমে নামেন। আমার সহকারী হুইপ আবদুল মান্নানকে দেখে প্রথমে চিনতে পারিনি। পরে জানলাম ২৫শে মার্চের পর থেকে মান্নান সাহেব খুব কষ্টে দিনকাল কাটিয়েছেন। পাক বাহিনীর ভয়ে তিনি দু’দিন পায়খানায় পালিয়ে ছিলেন। টাঙ্গাইল থেকে সড়কপথে হেঁটে ময়মনসিংহ এসেছেন। তিনি একেবারে জীর্ণশীর্ণ হয়ে গেছেন।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম তাঁর গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। আমাদের খবর পেয়ে নজরুল ভাই ও তাঁর ভাই যথেষ্ট উৎসাহিত হন। নজরুল ভাইকে তাজউদ্দীন ডেকে নিয়ে একান্তে কথা বলেন। গত কয়েক দিনের ঘটনাবলি তাঁকে অবহিত করা হয়। আমরা বাইরে বসে আছি। সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন ভাইকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোবারকবাদ জানান। এই দৃশ্য দেখে আমরা সকলেই উৎফুল্ল হই। আমরা আবার বিমানে উঠি। আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল আগরতলা। আমরা বিমানে আসন গ্রহণ করি। সামনের আসনে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও মনসুর ভাই। নজরুল ভাই বিমানে বসে ঢাকা থেকে পলায়নের কাহিনি বর্ণনা করেন। তিনি ডা. আলীম চৌধুরীর ছোট ভাইয়ের বাসায় থাকতেন। তিনি ছিলেন নজরুল ভাইয়ের আত্মীয়। সেই বাসা থেকে পরচুলা ও মেয়েদের কাপড় পরিধান করে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। মনসুর ভাই একথা নিয়ে এমনভাবে ঠাট্টা করলেন যে বিমানে কেউ না হেসে থাকতে পারলেন না। আমাদের আগরতলা পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।
ইতোমধ্যে আগরতলায় অনেক নেতা এসে পৌছেছেন। কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে দেখা হলো। তার চেহারায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো গোঁফ তিনি কেটে ফেলেছেন। প্রথমে তাঁকে চিনতেই পারছিলাম না। আমার নিজেরও দাড়ি কেটে ফেলেছি। দুজনেই দুজনকে ডেকে হাসি ঠাট্টা করলাম।
আগের রাতে খন্দকার মোশতাক এসেছেন। ড. টি হোসেন ঢাকা থেকে তাঁকে নিয়ে এসেছেন। এম আর সিদ্দিকী কয়েকদিন পূর্বে আগরতলা এসেছেন। চট্টগ্রাম থেকে জহুর আহমদ চৌধুরী এবং সিলেট থেকে আবদুস সামাদও এসে গেছেন। তাছাড়া সেখানে তাহের উদ্দিন ঠাকুর ও মাহবুব আলী চাষী ছিলেন।
আগরতলা সার্কিট হাউজের পুরোটা আমাদের দখলে। ওসমানী ও নগেন্দ্র সিং ভিন্ন একটি ঘরে অবস্থান করছেন। ওসমানী যুদ্ধের পরিকল্পনা এবং অস্ত্রশস্ত্রের তালিকা তৈরি করে ফেলেন। আধুনিক সমরসজ্জায় সজ্জিত পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে সম্মুখ যুদ্ধে আমাদের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। ওসমানীকে সশস্ত্র বাহিনী প্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণের আমন্ত্রণ জানানো হলো। তিনি এর পূর্বশর্ত হিসেবে যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জামের কথা উল্লেখ করেন।
রাতে খাবারের পর নেতৃবৃন্দ বৈঠকে বসেন। খন্দকার মোশতাক খুবই মনঃক্ষুণ্ণ। নাটকীয়ভাবে তিনি বললেন, আমরা যেন তাকে মক্কায় পাঠিয়ে দেই। আর মৃত্যুকালে তার লাশ যেন বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মোশতাক ও ড. টি হোসেনের মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে। দুজনেই এক জেলার লোক। পারিবারিক পর্যায়েও তাঁদের সম্পর্ক খুবই মধুর। তিনিই তাঁকে নিয়ে এসেছেন আগরতলায়।
ড. টি হোসেনের সঙ্গে আলাপ করে জানলাম, মোশতাক সাহেব প্রধানমন্ত্রী পদের প্রত্যাশী। সিনিয়র হিসেবে এই পদ তাঁরই প্রাপ্য বলে তিনি জানান। সারারাত শলাপরামর্শ হলো। অনিদ্রা ও দীর্ঘ আলোচনায় আমি খুবই ক্লান্ত অনুভব করি। একপর্যায়ে আমি ঘুমিয়ে পড়ি।
শেষ পর্যন্ত খন্দকার মোশতাক মন্ত্রিসভায় থাকতে রাজি হলেন। তবে একটা শর্ত হলো, তাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিতে হবে। তাজউদ্দীন ভাই আমাকে একথা জানান। সবাই এতে রাজি হলেন। কেননা, একটা সমঝোতার জন্য এই ব্যবস্থাটা একেবারে খারাপ নয়। অবশেষে খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগদানের বিষয়টির সুরাহা হলো। একজন হেসে খবর দিলেন, তিনি যোগদানে রাজি হয়েছেন। উপস্থিত সকলে একবাক্যে আলহামদুলিল্লাহ পড়লেন। সকলে জহুর ভাইকে মোনাজাত করতে অনুরোধ করলেন। তিনি কয়েকদিন পূর্বে পবিত্র হজব্রত পালন করে এসেছেন। তাঁর মাথায় তখনও মক্কা শরিফের টুপি। তিনি আধা ঘণ্টা ধরে আবেগপ্রবণভাবে মোনাজাত পরিচালনা করেন। তাঁর মোনাজাতে বঙ্গবন্ধুর কথা, পাক দস্যুদের অত্যাচার, স্বজন হারানো, দেশবাসীসহ শরণার্থীদের কথা এলো। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। অনেকের চোখে পানি এসে গেল। এই মোনাজাতের মাধ্যমে আমরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিলাম।
স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে আগরতলায় অনুষ্ঠিত বৈঠককে আওয়ামী লীগ সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠক বলা যেতে পারে। তাজউদ্দীন ভাই ও আমার প্রচেষ্টায় যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল বৈঠকে সবগুলোর অনুমোদন দেয়া হয়।
এ দিকে ওসমানী ও নগেন্দ্র সিংয়ের বৈঠকে যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রস্তুতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করা হয়। বৈঠকের পর একপর্যায়ে আমি অংশ নিই। এর পূর্বে যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে দিল্লি কলকাতাসহ দেশের বাইরে ভেতরে সীমাবদ্ধ আলোচনা হয়েছে। সবকটিতে আমি গভীরভাবে জড়িত ছিলাম। যুদ্ধের ব্যাপ্তি, প্রকৃতি, সামরিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক দিকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বোঝাবার চেষ্টা করি।
১৩ই এপ্রিল ছোট বিমানে কলকাতা ফিরে গেলাম। মন্ত্রিসভার সদস্য ছাড়াও আবদুস সামাদ আজাদ ও কর্নেল ওসমানী কলকাতা আসেন। অন্যরা রয়ে গেলেন। বাংলাদেশ থেকে ভারতে পৌঁছার ব্যাপারে আমরা ২টি প্রবেশপথ ঠিক করি। এর একটি হচ্ছে আগরতলা। এই পথে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও সিলেটের লোকজন প্রবেশ করবে। অন্য জেলার লোকজনের জন্য প্রবেশপথ করা হয় কলকাতা। পরে অবশ্য সিলেটের জন্য ডাউকি, ময়মনসিংহের জন্য তোরা পাহাড়, রংপুরের জন্য ভুরুঙ্গামারী, দিনাজপুরের জন্য শিলিগুড়ি, বরিশালের জন্য ঢাকি- এরকম বেশ কয়টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রবেশপথ ঠিক করা হয়।
মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক শপথের জন্য ১৪ই এপ্রিল দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছিল। শপথের স্থানের জন্য আমরা চুয়াডাঙ্গার কথা প্রথমে চিন্তা করি। কিন্তু ১৩ই এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী চুয়াডাঙ্গা দখল করে নেয়। পাক দস্যুরা সেখানে বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে। আমরা চুয়াডাঙ্গার কথা বাদ দিয়ে আমাদের নতুন স্থানের কথা চিন্তা করতে হলো। এই নিয়ে গোলক মজুমদারের সঙ্গে আমাদের বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ ব্যাপারে সবাই একমত হন যে, যেখানেই আমরা অনুষ্ঠান করি না কেন পাক বাহিনীর বিমান হামলার বিরুদ্ধে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। শেষ পর্যন্ত মানচিত্র দেখে কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলাকে মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। মন্ত্রিসভার শপথের জন্য নির্বাচিত স্থানের নাম আমি, তাজউদ্দীন ভাই, গোলক মজুমদার এবং বিএসএফ-এর চট্টোপাধ্যায় জানতেন। ইতোমধ্যে দ্রুত কতগুলো কাজ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল।
অনুষ্ঠানের কর্মসূচি নির্ধারণ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার খসড়া রচনা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বিশ্বের কাছে নবজাত বাংলাদেশকে স্বীকৃতির আবেদন জানাতে হবে। ১০ই এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী প্রথম যে ভাষণ দেন, তার কপি ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় করা হয়েছিল। ইংরেজি কপি বিদেশি সাংবাদিকদের দেয়া হয়। সবচেয়ে বড় কাজ হলো স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচনা করা।
আমি আর তাজউদ্দীন ভাই যে ঘরে থাকতাম সে ঘরের একটি ছোট্ট স্থানে টেবিল ল্যাম্পের আলোতে লেখার কাজ করি। আমার কাছে কোনো বই নেই, নেই অন্য দেশের স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো কপি।
আমেরিকার ইন্ডিপেনডেন্স বিল অনেক দিন আগে পড়েছিলাম। সেই অরিজিনাল দলিল চোখের সামনে ভাসছে। আর সেই বড় বড় হাতের স্বাক্ষরগুলো।
এদিকে শপথ অনুষ্ঠানের খুটিনাটি তৈরি করা হচ্ছে। জানা গেল প্রধান সেনাপতি ওসমানীর সামরিক পোশাক নেই। কিন্তু শপথ অনুষ্ঠানের জন্য তার সামরিক পোশাক প্রয়োজন। বিএসএফ-কে ওসমানীর জন্য এক সেট সামরিক পোশাক দিতে বললাম। তাঁদের স্টকে ওসমানীর গায়ের কোনো পোশাক পাওয়া গেল না। সেই রাতে কাপড় কিনে, দর্জি ডেকে তাঁর জন্য পোশাক তৈরি করা হলো।
কিন্তু ভাষা বা ফর্ম কিছুই মনে নেই। তবে বেশি কিছু মনে করার চেষ্টা করলাম না। মনে করলাম। কী কী প্রেক্ষিতে আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণার অধিকার রয়েছে।
শুধু এমনই চিন্তা করে ঘোষণাপত্রের একটা খসড়া তৈরি করলাম। স্বাধীনতার ঘোষণার অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নির্ধারণ করে দেয়া হলো।স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের খসড়া রচনার পর তাজউদ্দীন ভাইকে দেখালাম।
তিনি পছন্দ করলেন। আমি বললাম, আমরা সকলে এখন যুদ্ধে অবতীর্ণ। এই দলিলের খসড়াটি কোনো একজন বিজ্ঞ আইনজীবীকে দেখাতে পারলে ভালো হতো। তিনি বললেন এই মুহূর্তে কাকে আর পাবেন। যদি সম্ভব হয় কাউকে দেখিয়ে নিন।
ইতোমধ্যে কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবীরা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্বপক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। এদের মধ্য সুব্রত রায় চৌধুরীর নাম আমি শুনেছি। রায় চৌধুরীর আন্তর্জাতিক খ্যাতি রয়েছে। আমি তাঁর লেখা কিছু নিবন্ধ পড়েছি বলে মনে হলো। বিএসএফ-এর মাধ্যমে রায় চৌধুরীর ঠিকানা জেনে নিলাম টেলিফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি। বললাম তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাই। তিনি রাজি হলেন। বালিগঞ্জে তাঁর বাসা। আমার পরিচয়, ‘রহমত আলী’ নামে। সুব্রত রায় চৌধুরীর বাসায় পৌঁছে তাঁকে আমার প্রণীত ঘোষণাপত্রের খসড়াটি দেখালাম। খসড়াটি দেখে তিনি আনন্দে লাফিয়ে ওঠেন। এই খসড়া আমি করেছি কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। আমি হ্যাঁ-সূচক জবাব দিই। তিনি বলেন, একটা কমা বা সেমিকোলন বদলাবার কোনো প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার যে আইনানুগ অধিকার তা মানবাধিকারের একটা অংশ। এই কথা স্বাধীনতার সনদে ফুটে উঠেছে। তিনি জানান, তিনি এর ওপর একটা বই লিখবেন। এই ঘোষণাপত্রের একটি কপি তাঁকে দেয়ার জন্য তিনি অনুরোধ করলেন। এরপর আইন ব্যবসা প্রায় বন্ধ করে দিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ওপর বই লেখা শুরু করেন। তার রচিত বইটির নাম হচ্ছে ‘জেনেসিস অব বাংলাদেশ’- আন্তর্জাতিকভাবে অধ্যয়নের জন্য ইউরোপ ও আমেরিকার বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন তা পড়ানো হচ্ছে।
এটা ছিল সুব্রত চৌধুরীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। এরপর থেকে যুদ্ধ সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত তিনি আমাকে বড় ভাইয়ের মতো সময়ে অসময়ে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন। আমার জন্য তাঁর দুয়ার সর্বদাই ছিল খোলা।
এদিকে শপথ অনুষ্ঠানের খুটিনাটি তৈরি করা হচ্ছে। জানা গেল প্রধান সেনাপতি ওসমানীর সামরিক পোশাক নেই। কিন্তু শপথ অনুষ্ঠানের জন্য তার সামরিক পোশাক প্রয়োজন। বিএসএফ-কে ওসমানীর জন্য এক সেট সামরিক পোশাক দিতে বললাম। তাঁদের স্টকে ওসমানীর গায়ের কোনো পোশাক পাওয়া গেল না। সেই রাতে কাপড় কিনে, দর্জি ডেকে তাঁর জন্য পোশাক তৈরি করা হলো।
শপথ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের হাজির করার ভার ছিল আমার ও আবদুল মান্নানের ওপর। ১৬ই এপ্রিল আমরা দুজনে কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। এই প্রথম বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দুজন প্রতিনিধি বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলিত হই। সমস্ত প্রেসক্লাব লোকে লোকারণ্য। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। সার্চলাইটের অসংখ্য চোখ আমাদের দিকে নিবদ্ধ। ক্লাবের সেক্রেটারি উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাদের প্রথম অনুরোধ জানাই আমাদের উপস্থিতির কথা গোপন রাখতে হবে। এরপর বললাম, আমরা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একটি বার্তা নিয়ে এসেছি।
সমবেত সাংবাদিকদের পরদিন ১৭ই এপ্রিল জাতীয় ইতিহাসের একটি স্মরণীয় দিন। স্বাধীনতা যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের দিন। সারারাত ঘুম হয়নি। ভোরের দিকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, এম, মনসুর আলী, এ, এইচ, এম কামরুজ্জামান এবং ওসমানী একটি গাড়িতে রওনা হয়ে যান।
আমি ও আবদুল মান্নান ভোরের দিকে পূর্ব কর্মসূচি অনুযায়ী কলকাতা প্রেসক্লাবে যাই। সেই ভোরেও ক্লাবে লোক ধরেনি। ক্লাবের বাইরেও অনেক লোক দাঁড়িয়ে ছিল। আমি সাংবাদিকদের লক্ষ করে বিনীতভাবে বললাম, আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আপনাদের জন্য একটা বার্তা নিয়ে এসেছি। তাঁদের জানালাম স্বাধীন বাংলার মাটিতে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করবেন। আপনারা সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত। কেউ জানতে চাইলেন কীভাবে যাবেন, কোথায় যাবেন। আমি পুনরায় বলি, আমি আপনাদের সঙ্গে রয়েছি, পথ দেখিয়ে দেব। আমাদের গাড়িগুলো তখন প্রেসক্লাবের সামনে। উৎসাহিত সাংবাদিকরা গাড়িতে ওঠেন। তাঁদের অনেকের কাঁধে ক্যামেরা। ৫০/৬০টা গাড়ি যোগে রওনা হলাম গন্তব্যের দিকে। আমি ও আবদুল মান্নান দুজনই দুই গাড়িতে। আমার গাড়িতে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক ছিলেন। পথে তাঁদের সঙ্গে অনেক কথা হলো।
শপথ অনুষ্ঠানের নির্ধারিত স্থান আম্রকাননে পৌছতে ১১টা বেজে গেল। অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রায় শেষ। মাহবুব ও তৌফিক এলাহী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন। আগেই ঠিক করা হয়েছিল যে চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার সনদ পাঠ করবেন।
এদিকে পাক হানাদার বাহিনীর চাপের মুখে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটতে হয়েছে। সম্মুখ সমরে হানাদার বাহিনীর মোকাবিলা করা আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে সম্ভব নয়। নির্দেশ সত্ত্বেও দেশমাতৃকার মুক্তিপাগল যোদ্ধারা বাংকার ছেড়ে আসতে রাজি হচ্ছিল না। মাহবুব ও তৌফিক তাঁদের সৈন্যসহ পাক হানাদার বাহিনীর দ্বারা ঘেরাও হয়ে পড়েছিলেন। তারা সুকৌশলে পিছু হটে আসেন। মনোবল ঠিক রেখে পশ্চাদপসরণ করা একটা কঠিন কাজ। ক্লান্ত শ্রান্ত মুক্তিযোদ্ধারা বাংকার থেকে উঠে আসে। ওদের চোখে মুখে বিশ্বাসের দীপ্তি বিদ্যমান ছিল।
কোরআন তেলোয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হলো। একটি ছোট মঞ্চে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যবর্গ, ওসমানী, আবদুল মান্নান ও আমি। আবদুল মান্নান অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। ইউসুফ আলী স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দেন। একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এই স্থানের নাম ‘মুজিবনগর’ নামকরণ করেন। ১৬ই ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত মুজিবনগর ছিল অস্থায়ী সরকারের রাজধানী।
সাংবাদিক সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রধান প্রশ্ন ছিল সরকারের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোথায়? জবাবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই মন্ত্রিসভা গঠন করেছি। তার সঙ্গে আমাদের চিন্তার (বিস্তর) যোগাযোগ রয়েছে। আমরা জানতাম বঙ্গবন্ধু শত্রু শিবিরে বন্দী। কিন্তু আমরা তা বলতে চাইনি। পাক বাহিনী বলুক এটাই আমরা চাচ্ছিলাম। কারণ আমরা যদি বলি বঙ্গবন্ধু পাক শিবিরে, আর তারা যদি তা অস্বীকার করে তাহলে সমূহ বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। আর আমরা যদি বলি তিনি দেশের ভেতর থেকে যুদ্ধের নেতৃত্বে দিচ্ছেন তখন হানাদাররা বলে বসবে তিনি বন্দী আছেন।
আম বাগানের অনুষ্ঠানে ভরদুপুরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ছাড়াও পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার লোক জমায়েত হয়। হাজারো কণ্ঠে তখন উচ্চারিত হচ্ছিল জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর, ইত্যাদি স্লোগান। আমার কাজ ছিল দ্রুত অনুষ্ঠান শেষ করে সাংবাদিকদের ফেরত পাঠানো। দুপুরের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেল। সাংবাদিকদের গাড়িযোগে ফেরত পাঠানো হলো। মন্ত্রিসভার সদস্যরা ফেরে সন্ধ্যায়। অনুষ্ঠানের পর কলকাতার সাংবাদিকরা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এই সংবাদ পরিবেশন করেন।
মুজিবনগর সরকার কর্তৃক স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ঢাকা এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। এই গণহত্যার প্রাক্কালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, গণপরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যগণ নিরাপত্তার জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন। ৩০শে মার্চের মধ্যেই তাদের অনেকে কলকাতায় সমবেত হন। তাজউদ্দীন আহমদ এর নেতৃত্বে বাঙ্গালীরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ভারত সরকার পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে সর্ববিধ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। অতঃপর স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
প্রাদেশিক পরিষদের যে সকল সদস্য ১০ এপ্রিলের মধ্যে কলকাতায় পৌঁছতে সক্ষম হন তাদের নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা তাজউদ্দীন আহমদ মন্ত্রিপরিষদ গঠনের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করেন। এই সরকারের আইনী বৈধতার স্বার্থে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার প্রয়োজন দেখা দেয়। সর্বসম্মতিক্রমে অধ্যাপক রেহমান সোবহান আরো কয়েকজনের সাহায্য নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের একটি খসড়া প্রণয়ন করেন।
এরপর ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম এই ঘোষণাপত্রের আইনগত দিকগুলো সংশোধন করে একে পূর্ণতা দান করেন। এই ঘোষণাপত্রটি প্রথমে ১০ এপ্রিল মুজিবনগর থেকে প্রচার করা হয়।
এরপর ১৭ এপ্রিল ১৯৭১তারিখে মেহেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী স্থান বৈদ্যনাথতলায় (পরবর্তী নাম মুজিবনগর) এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে গণপরিষদের সদস্য অধ্যাপক এম ইউসুফ আলী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। বৈদ্যনাথতলা তখন ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সীমানার অভ্যন্তরে একটি শত্রুমুক্ত এলাকা। এই ঘোষণার মাধ্যমে নবগঠিত প্রবাসী আইন পরিষদ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে সাথে সাথে এ ঘোষণাপত্র প্রবাসী সরকারের অবস্থান ও যৌক্তিকতা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে। এদিনই ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দেয়া হয় এবং একই সাথে ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা কার্যকর হয়েছে বলে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারও বৈধ বলে স্বীকৃত হয়। এ ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকলের মধ্যে চেইন অফ কমান্ড স্থাপনের নির্দেশ দেয়া হয়।
যতদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলেছে ততদিন মুজিবনগর সরকার পরিচালনার অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান বা ক্রান্তিকালীন বিধান হিসেবে এই ঘোষণাপত্র কার্যকর ছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পরও এই ঘোষণাপত্র নবপ্রতিষ্ঠ দেশের সংবিধান হিসেবে কার্যকর ছিল। ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর তারিখে যখন দেশের নতুন সংবিধান প্রণীত হয় তখন সংবিধান হিসেবে এর কার্যকারিতার সমাপ্তি ঘটে।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল প্রণীত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ ছিল বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান। ২০১১ সালের ৩০শে জুন তারিখে বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে মূল সংবিধানের অঙ্গীভূত করা হয়েছে।
| বাংলাদেশ গণপরিষদ দ্বারা ঘোষণা |
|---|
|
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র
যেহেতু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে প্রতিনিধি নির্বাচিত করা হয়েছিল; এবং যেহেতু এই নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণ ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ দলীয় ১৬৭ জন প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছিল; এবং যেহেতু জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সনের ৩রা মার্চ তারিখে শাসনতন্ত্র রচনার উদ্দেশ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধিবেশন আহ্বান করেন; এবং যেহেতু তিনি আহূত এই অধিবেশন স্বেচ্ছাচার এবং বেআইনিভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন; এবং যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করার পরিবর্তে বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে পারষ্পরিক আলোচনাকালে ন্যায়নীতি বহির্ভূত এবং বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করেন; এবং যেহেতু উল্লিখিত বিশ্বাসঘাতকতামূলক কাজের জন্য উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান; এবং যেহেতু পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনা করেছে এবং এখনও বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন গণহত্যা ও নির্যাতন চালাচ্ছে; এবং যেহেতু পাকিস্তান সরকার অন্যায় যুদ্ধ ও গণহত্য এবং নানাবিধ নৃশংস অত্যাচার পরিচালনার দ্বারা বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের পক্ষে একত্রিত হয়ে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব করে তুলেছে; এবং যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ তাদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের উপর তাদের কার্যকরি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে; সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারষ্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি এবং এর দ্বারা পূর্বাহ্নে শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা অনুমোদন করছি; এবং এতদ্বারা আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; এবং রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন; ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাসহ সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধিকারী থাকবেন; এবং তার কর ধার্য ও অর্থব্যয়ের ক্ষমতা থাকবে; এবং বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষমতারও তিনি অধিকারী হবেন। বাংলাদেশের জনগণ দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, কোনো কারণে যদি রাষ্ট্রপ্রধান না থাকেন অথবা যদি রাষ্ট্রপ্রধান কাজে যোগদান করতে না পারেন অথবা তার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যদি অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধান প্রদত্ত সকল দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করবেন। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, বিশ্বের একটি জাতি হিসাবে এবং জাতিসংঘের সনদ মোতাবেক আমাদের উপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তেছে তা যথাযথভাবে আমরা পালন করব। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই স্বাধীনতার ঘোষণা ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর বলে গণ্য হবে। আমরা আরও সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছি যে, আমাদের এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করার জন্য আমরা অধ্যাপক এম. ইউসুফ আলীকে যথাযথভাবে রাষ্ট্রপ্রধান ও উপ-রাষ্ট্রপ্রধানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য দায়িত্ব অর্পণ ও নিযুক্ত করলাম। স্বাক্ষর: অধ্যাপক এম. ইউসুফ আলী বাংলাদেশ গণপরিষদের |
আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ ১৯৭১
বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে একই দিনে আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ নামে একটি আদেশ জারি করেন। ঘোষণাপত্রের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সকল আইন চালু ছিল, তা রক্ষার্থে এই আদেশ বলবৎ করা হয়[৫]।
পূর্ণ বিবরণ
আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশ ১৯৭১
মুজিবনগর, বাংলাদেশ, ১০ এপ্রিল ১৯৭১, শনিবার ১২ চৈত্র ১৩৭৭
আমি বাংলাদেশের উপ-রাষ্ট্রপতি এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে এ আদেশ জারি করছি যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সকল আইন চালু ছিল, তা ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একইভাবে চালু থাকবে, তবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের জন্য করা যাবে। এই রাষ্ট্র গঠন বাংলাদেশের জনসাধারণের ইচ্ছায় হয়েছে। এক্ষণে, সকল সরকারি, সামরিক, বেসামরিক, বিচার বিভাগীয় এবং কূটনৈতিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী যারা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছেন, তারা এতদিন পর্যন্ত নিয়োগবিধির আওতায় যে শর্তে কাজে বহাল ছিলেন, সেই একই শর্তে তারা চাকুরিতে বহাল থাকবেন। বাংলাদেশের সীমানায় অবস্থিত সকল জেলা জজ এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং সকল কূটনৈতিক প্রতিনিধি যারা অন্যত্র অবস্থান করছেন, তারা সকল সরকারি কর্মচারীকে স্ব স্ব এলাকায় আনুগত্যের শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করবেন।
এই আদেশ ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে কার্যকর করা হয়েছে বলে গণ্য করতে হবে।
স্বাক্ষর:- সৈয়দ নজরুল ইসলাম
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি
—————————————————————————————————–
মুজিবনগর সরকারের কার্যাবলী
মুজিবনগর সরকার (যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার বা প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার নামেও পরিচিত) মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল জনগনের রায়ে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠন করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল এই সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (বর্তমান মুজিবনগর) শপথ গ্রহণ করেন।
- বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার গঠিত হয় ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে।
- প্রথম অস্থায়ী সরকার শপথ গ্রহণ করে ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে।
- শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন সংসদ সদস্য আবদুল মান্নান।
- বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী।
- মেহেরপুরের ভবের পাড়া বৈদ্যনাথতলার ‘মুজিবনগর নামকরণ করেন তাজউদ্দিন আহমেদ।
- প্রবাসী সরকার গঠিত হয় ১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে।
- শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তৎকালীন মেহেরপুরের সাব-ডিভিশন অফিসার তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী।
- মুজিব নগর সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন এম মনসুর আলী।
আজকের তরুণ জন্ম থেকেই স্বাধীন দেশের নাগরিক কিন্তু এর জন্য পূর্ববর্তী প্রজন্মকে যে কী মূল্য দিতে হয়েছে সে সম্পর্কে হয়তো তারা ধারণা তেমন স্পষ্ট নয়। যদি সে ধারণা স্পষ্ট হয় তাহলে দেশ, স্বাধীনতা সম্পর্কে তার মমত্ববোধ অন্য মাত্রা পেত। এর জন্য অবশ্য কমবেশি দায়ী আমরা সবাই।
তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া,মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি -ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম

