সময়ের কথন 🇧🇩 যে কথা অজানা ।।জগন্নাথ হলে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের বৈঠক চলছে.. 
বাংলাদেশ ও শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান আমার বন্ধু ছিলেন। অন্যান্য গুণাবলী ছাড়াও তার ছিল দু’টি বিশেষ গুণ-মানুষের সঙ্গে মিশা, মানুষকে বুঝা এবং সংগঠন করা। এই দুই ব্যাপারে তার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। এই গুণ গুলি আমাদের রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিরল। বঙ্গবন্ধুর সাথে একই পার্টিতে, পরবর্তীতে একই রাজনীতিতে ছিলাম অনেকদিন। পরস্পরকে বুঝার মধ্যে কোন কমতি ছিল না। তিনি কখনো শোষকের পক্ষে ছিলেন না। তিনি সব সময়ই ছিলেন শোষিতের পক্ষে। তাঁর মধ্যে সব সময় আমি লক্ষ্য করেছি এবং সময় সময় তিনিও বুঝতে দিয়েছেন, কমছে-কম
শেরে বাংলা ফজলুল হকের মত জনপ্রিয়তা নিয়ে তিনি মরতে চান।
আমি ১৯৩৭ সনে রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হলেও বিভিন্ন কারণে সক্রিয় রাজনীতিতে আসতে পারিনি। সক্রিয় রাজনীতিতে আসার জন্য তিনি আমাকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেন। ১৯৫৪ সনে যুক্তফ্রন্ট আমলে নির্বাচনে প্রার্থী হই এবং সক্রিয় রাজনীতিতে এসে যাই।
বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীনতার চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন তখন তিনি যে দু’ একজন বন্ধুকে আস্থার মধ্যে নেন তার মধ্যে আমি ছিলাম একজন। তার আস্থা আমি কখনো ভুলিনি।
‘মুজিব চরিত্রের এক ঝলক’- লিখেছেন বঙ্গবন্ধুরই আর এক বন্ধু পীর হাবিবুর রহমান।
তিনি লিখেছেন, “সন ১৯৫৬। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন। শাসন ক্ষমতা গ্রহণে আওয়ামী লীগ দোদুল্যমান। দ্রুত অবনতিশীল খাদ্য সংকটের মুখে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণে বাধ্য হয়। পূর্ব পাকিস্তানে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ মন্ত্রী সভা গঠন করে। এর কিছুকাল পর অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দর মির্জার অনুরোধে আওয়ামী লীগ নেতা জনাব শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে পাকিস্তানের কেন্দ্রেও আওয়ামী লীগরিপাবলিকান পার্টির কোয়ালিশন মন্ত্রী সভা গঠিত হয়।
পাকিস্তান পার্লামেন্টে মোট আসন সংখ্যা ছিল ৮০টি। আওয়ামী লীগ দলের এমপি ছিলেন ২৩ জন। আর রিপাবলিকান দলীয় এমপি ছিলেন ৩৬ জন। রিপাবলিকান পার্টি দলে তারী থাকায় স্বভাবতঃই সেদিকে সরকারের ঝৌকও ছিল। পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচিত হল ১৯৫৬ সালে। লোকসংখ্যার অনুপাতে পূর্ব পাকিস্তানের লোক সংখ্যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের লোকসংখ্যার চেয়ে শতকরা ১২ ভাগ বেশী। কিন্তু ৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে পার্লামেন্টের আসন সংখ্যায় পূর্ব পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাসাম্য তথা ৫০:৫০ নির্ধারিত রাখা হয়।
রাজধানী করাচী থেকে পূর্ব পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল ১৪শ’ মাইল দূরত্বের অবস্থানে বিচ্ছিন্ন। তদুপরি, বিগত বছরগুলোতে রাজস্ব ব্যয়, উন্নয়ন, চাকুরী, দেশরক্ষাসহ সব বিষয়ে পূর্ব পাকিস্তান নিদারুণ বৈষম্যের শিকার হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মাত্র ৩টি ক্ষমতা যথাঃ দেশরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও মুদ্রা রেখে বাদবাকী সকল ক্ষমতা প্রাদেশিক সরকারের হাতে সমর্পণের দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবী এখানে জোরদার হয়ে উঠে। ১৯৪৯ সালে জন্মলগ্নে আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোতে ঐ স্বায়ত্তশাসনের দাবী সন্নিবেশিত হয়।
১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক আইন সভার নির্বাচন কালে আওয়ামী লীগসহ যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা কর্মসূচীতেও ঐ স্বায়ত্তশাসনের দাবী লিপিবদ্ধ করা হয়। এমতাবস্থায় স্বায়ত্তশাসনের দাবী বর্জন ও অগনতান্ত্রিক সংখ্যা সাম্য চাপিয়ে দেওয়ায় ‘৫৬ সালের শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান সোচ্চার ছিল। ক্ষমতা লাভের পর জনাব সোহরাওয়ার্দী সাহেব কোন একটি সমাবেশে ‘৫৬ সালের শাসনতন্ত্রে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবী ৯৮/ ভাগ অর্জিত হয়েছে বলে উক্তি করেন। এর প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের আইন সভায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির এমপিএ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ শুধু দেশরক্ষা, পররাষ্ট্রনীতি ও মুদ্রা এই ৩টি বিষয় কেন্দ্রের হাতে রেখে বাদবাকী যাবতীয় ক্ষমতা প্রদেশের হাতে অর্পণের ভিত্তিতে ‘৫৬ সালের শাসনতন্ত্রকে সংশোধনের জন্য পাকিস্তান পার্লামেন্টের প্রতি আহবান জানিয়ে একটি জরুরী প্রস্তাব উত্থাপন করেন। আইন সভার মাননীয় স্পীকার জনাব আব্দুল হাকিম খান ঐ প্রস্তাব আলোচনার জন্য একটি নির্দিষ্ট তারিখ ধার্য করেন।
জগন্নাথ হলে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদের বৈঠক চলছে। সেদিন জোহরের নামাজের বিরতি একটু আগেভাগেই হয়ে গেল। ১২টায় বিরতি হল।
আর সান্ধ্যকালীন অধিবেশনের সময় বিকেল ৩টা ধার্য হল। দীর্ঘ বিরতির কারণ ঐদিন দ্বিতীয় অধিবেশনেই অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের স্বায়ত্তশাসন সম্বলিত প্রস্তাবের উপর আলোচনা হবে।

আমি মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের কামরায় বসেছিলাম। জনাব আবুল মনসুর আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমানসহ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বর্গ একে একে মন্ত্রী সভার সকল সদস্যই এসে আসন গ্রহণ করলেন। মুখ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বৈঠক শুরু হল। আমি বিরোধী দলের সদস্য হলেও কেউ ভ্রুক্ষেপ করেনি। তাই আমার উপস্থিতিতেই আলোচনা শুরু হল। বিষয়বস্তু ৩টার অধিবেশনে আলোচ্য অধ্যাপক মোজফফর আহমদ উত্থাপিত স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব।
প্রথমে জনাব আবুল মনসুর আহমদ এ বিষয়ে বিশদ বক্তব্য হাজির করেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম হলঃ এই প্রস্তাব হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী জনাব শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে সেনসার করার, জনসমক্ষে তার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করার একটি কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র বৈ আর কিছু নয়। কাজেই সর্বশক্তিতে আমাদের এই ষড়যন্ত্রকে ঘায়েল করতে হবে। মনসুর সাহেবের বক্তব্যের তীর্যক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন যশোরের জনাব আব্দুল খালেক সাহেব। তার বক্তব্যের বিষয়বস্তু ছিল অধ্যাপক মোজাফফর প্রস্তাবিত স্বায়ত্ত শাসনের দাবী আওয়ামী লীগ মেনিফেস্টোতে সন্নিবেশিত। যে ২১ দফা কর্মসূচীর ওয়াদা দিয়ে আমরা ‘৫৪ সালে ভোটে নির্বাচিত হয়েছি, সেই ২১ দফায়ও তা লিপিবদ্ধ আছে। কাজেই আওয়ামী লীগের পক্ষে ঐ প্রস্তাবের বিরোধিতার কোন উপায় নাই। এমনি আলোচনা-সমালোচনায় প্রায় ঘন্টাখানেক বা তারও বেশী সময় কাটলো।
শেখ মুজিবুর রহমান একাধারে কেবিনেট মন্ত্রী আবার পার্টির জেনারেল সেক্রেটারী। তিনি কোন কথাই বলছেন না দেখে মূখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান তার মতামত বলতে অনুরোধ জানালেন। শেখ সাহেব অতঃপর মুখ খুললেন। তার কথায় ছিল আগুন আর আগুন। আমি মুজিবুর রহমান বঙ্গভূমির একজন ঘুমন্ত সুসন্তানের দাবীদার। মোজাফফর যে স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে আইন পরিষদের প্রস্তাব এনেছে আমি তা একবার আওয়ামী লীগের ৪২ দফা মেনিফেস্টোতে আর একবার ২১ দফা কর্মসূচীতে সেই স্বায়ত্বশাসনের দাবীর জন্য সংগ্রামের ওয়াদা করে বসে আছি। আপনারা কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র রুখতে আর লীডারের ইমেজ বাঁচাতে যা ইচ্ছে করতে পারেন। আমি মুজিবুর রহমান দেশের ৬ কোটি মানুষের কাছে যে ওয়াদা করেছি তা থেকে এক ইঞ্চিও হঠতে, নড়বড় করতে পারব না আমার গলায় যদি কেউ ছুরিও চালায় তাতেও আমাকে স্বায়ত্তশাসন দাবী থেকে সরাতে পারবে না। আমি ঐ স্বায়ত্তশাসনের দাবীতে উত্থাপিত প্রস্তাবের পক্ষেই ভোট দিব। মুজিব ভাইয়ের কথাও শেষ হল। সভাও শেষ করে সবাই আইন সভার হলে প্রবেশ করলেন। পূর্ব পাকিস্তান আইন সভায় অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ উত্থাপিত স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব সেদিন সরকারী দল ও বিরোধী দলের সর্বসম্মত সমর্থনে পাস হয়ে একটি নজীর প্রতিষ্ঠিতহল।” সৌজন্যে -‘মুজিব স্বরনিকা ১৯৮৯।’
সন ১৯৬৬। লাহোরে বিরোধীদলের এক সম্মেলন। ঐ সম্মেলন শেষে শেখ মুজিব তার ঐতিহাসিক ছয়দফা প্রস্তাব ঘোষণা করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানে এসে সরকারের কোপানলে পতিত হন। তাকে দু’বছরের জন্য কারাবন্দী করা হয় এবং ফাঁসী কাষ্ঠে ঝুলাবার জন্য আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী করা হয়।সন ১৯৭২। হাজার হাজার রাজাকার, আলবদর ও শান্তি কমিটির সদস্য যাদের কারাগারে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল শেখ সাহেব তাদের প্রতি সাধারণ ক্ষমা করে ছেড়ে দিলেন।
লেখক-অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ
মোজাফফর আহমদ (১৪ এপ্রিল ১৯২২ – ২৩ আগস্ট ২০১৯) ছিলেন একজন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ। তিনি ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (মস্কোপন্থী) সভাপতি ছিলেন।

