দিল্লির গোলটেবিলে নতুন বিশ্বব্যবস্থার খোঁজ ।। ব্রিকস কি পশ্চিমের বিকল্প, নাকি স্বার্থের নতুন সমঝোতা?
আলাপচারিতা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

দিল্লিতে ১২–১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ছবিটি নিছক একটি কূটনৈতিক সম্মেলনের ছবি নয়। একটি গোল টেবিল ঘিরে বসেছেন এমন কয়েকটি দেশের নেতা, যাদের মধ্যে কেউ কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী, কেউ সামরিক সংঘাতের পক্ষ, আবার কেউ একই ভূরাজনৈতিক সংকটে বিপরীত অবস্থানে থাকা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান—একই সম্মেলনে তাদের উপস্থিতি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ব্রিকস এখন ১১ সদস্যের একটি বিস্তৃত প্ল্যাটফর্ম। এর সদস্যদের মধ্যে রয়েছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ সম্প্রসারিত কাঠামো। এই বৈচিত্র্যই ব্রিকসের শক্তি, আবার একই সঙ্গে তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও।
দিল্লি সম্মেলনের মূল প্রশ্ন তাই শুধু—ব্রিকস কী বলল?
বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ব্রিকসের সদস্যরা আসলে কতটা একসঙ্গে চলতে প্রস্তুত?
‘নিয়ম অনুসারী’ নয়, ‘নিয়ম সৃষ্টিকারী’
সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদী বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় তথাকথিত ‘সুবিধাভোগী শ্রেণি’র আধিপত্য কমিয়ে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি ব্রিকসকে এমন একটি শক্তি হিসেবে দেখতে চান, যারা কেবল বিদ্যমান আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করবে না, বরং নিয়ম তৈরির প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।
ব্রিকসের ২০২৬ সালের দিল্লি ঘোষণাতেও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান সংস্কার, জাতিসংঘের প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামো শক্তিশালী করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ঘোষণায় বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সংগত, প্রতিনিধিত্বশীল ও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব।
বৈশ্বিক ব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্নে ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে বিস্তর মিল থাকলেও সংস্কারের পর সেই বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে—এ বিষয়ে তাদের অভিন্ন নীতি নেই।
চীন চায় বহুমেরু বিশ্বে তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে। রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক চাপের বাইরে নতুন আন্তর্জাতিক পরিসর চায়। ইরান চায় নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলার বিকল্প অর্থনৈতিক যোগাযোগ। ভারত চায় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে একই সঙ্গে পশ্চিম ও পূর্ব—দুই দিকেই সম্পর্ক ধরে রাখতে।
ফলে ব্রিকসের অভিন্নতা অনেকাংশে ‘কী চাই না’—এই প্রশ্নে বেশি স্পষ্ট; কিন্তু ‘কী চাই’—এই প্রশ্নে এখনো বিভাজন রয়েছে।
পশ্চিমবিরোধী জোট হতে চায় না ভারত
ব্রিকসকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের পাল্টা শক্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা নতুন নয়। চীন ও রাশিয়ার কৌশলগত অবস্থানে এর ছাপ স্পষ্ট।
কিন্তু ভারত এই জোটকে সরাসরি পশ্চিমবিরোধী সামরিক বা রাজনৈতিক ব্লকে পরিণত করতে আগ্রহী নয়।
কারণ দিল্লির বাস্তবতা আলাদা।
যুক্তরাষ্ট্র ভারতের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। ইউরোপ ভারতের বড় বাণিজ্যিক বাজার। একই সময়ে চীন ভারতের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের একটি এবং রাশিয়া ভারতের ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা সহযোগী।
তাই ভারতের নীতি হলো—একদিকে ব্রিকস, অন্যদিকে পশ্চিমা শক্তি; কারও সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন নয়।
এই কৌশলকে ভারতের ‘স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি’ বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা যায়।
এ কারণেই মোদী ব্রিকসকে ‘কারও বিরুদ্ধে’ নয় বলে তুলে ধরেছেন। দিল্লির লক্ষ্য সম্ভবত এমন একটি বহুমুখী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, যেখানে ভারত একই সঙ্গে ওয়াশিংটন, মস্কো, বেইজিং ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে কাজ করতে পারে।
‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’: ঐকমত্যের আড়ালে বিভাজন
দিল্লি সম্মেলনের অন্যতম সাফল্য হলো সদস্যরা শেষ পর্যন্ত একটি যৌথ ঘোষণা গ্রহণ করতে পেরেছে।
কিন্তু ঘোষণাটি পড়লে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—ঐকমত্য তৈরি হয়েছে মূলত এমন ভাষায়, যা সদস্যদের পার্থক্যকে সাময়িকভাবে আড়াল করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে। বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এবং ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক স্থানচ্যুতির বিরোধিতা করা হয়েছে।
কিন্তু ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—দুই দেশই একই জোটে থেকেও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে সবসময় একই অবস্থানে নেই।
এই অবস্থায় কোনো পক্ষকে সরাসরি অভিযুক্ত না করে ‘সংযম’, ‘সংলাপ’ ও ‘কূটনীতি’র ওপর জোর দেওয়া ছিল আপসের পথ।
অর্থাৎ ঘোষণার ভাষা দেখায়—ব্রিকস এখনো সংঘাতের পক্ষ নির্ধারণের চেয়ে সংঘাতের মধ্যে যোগাযোগের জায়গা ধরে রাখতে বেশি আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের নাম নেই, কিন্তু বার্তা আছে
বাণিজ্য ও শুল্কনীতিতেও একই কৌশল দেখা গেছে।
দিল্লি ঘোষণায় একতরফা শুল্ক ও বাণিজ্য-নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করা হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ একতরফা পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতাও করা হয়েছে।
তবে ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি অভিযুক্ত করা হয়নি।
এটি কূটনীতির ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ
কারণ ব্রিকসের বহু সদস্যই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। আবার যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা নীতির প্রভাব তাদের ওপর পড়ছে।
তাই সরাসরি সংঘাত নয়, বরং বহুপাক্ষিক বাণিজ্যব্যবস্থা ও WTO সংস্কারের দাবি তোলাই আপাতত তাদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ পথ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা: বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো
ব্রিকসের ভবিষ্যৎ শুধু রাজনৈতিক ঘোষণায় নির্ধারিত হবে না। প্রকৃত পরীক্ষা হবে অর্থনীতিতে।
দিল্লি ঘোষণায় আন্তঃব্রিকস বাণিজ্য, স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, সীমান্তপারের পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ সহজ করার উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
এখানে ব্রিকসের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।
যদি সদস্যরা বাস্তবসম্মত একটি কার্যকর পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের ওপর নির্ভরতা কিছু ক্ষেত্রে কমানো সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু এখানেও বাস্তব সমস্যা রয়েছে।
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য করতে হলে মুদ্রার রূপান্তরযোগ্যতা, বিনিময় হার, আর্থিক স্থিতিশীলতা, ব্যাংকিং অবকাঠামো এবং পারস্পরিক আস্থার প্রয়োজন।
অর্থাৎ ‘ডলারবিহীন বাণিজ্য’ রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে সহজ; কিন্তু কার্যকর আর্থিক ব্যবস্থা হিসেবে বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন।
শি–মোদী বৈঠক: প্রতিযোগিতার মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা
দিল্লি সম্মেলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ঘটনাগুলোর একটি ছিল শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদীর বৈঠক।
২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত–চীন সম্পর্ক দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র অবিশ্বাসের মধ্যে ছিল। সাত বছর পর শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফর তাই নিছক প্রটোকল গত ঘটনা নয়।
দুই নেতা সম্পর্কের মতপার্থক্যকে সংঘাতে পরিণত না করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। বাণিজ্য ও যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
তবে এখানেই অতিরঞ্জন বিপজ্জনক।
এই বৈঠককে ভারত–চীন সম্পর্কের ‘নতুন জোট’ বা পূর্ণাঙ্গ মীমাংসা বলা যাবে না।
সীমান্ত সমস্যা রয়ে গেছে। বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও দুই দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে।
তাই যা ঘটেছে তা সম্ভবত সম্পর্কের পুনঃসমন্বয়, পূর্ণ পুনর্মিলন নয়।
শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফরের সময়সীমাও ছিল সংক্ষিপ্ত এবং তিনি মোদীর আয়োজিত নৈশভোজে অংশ নেননি।
এই প্রতীকী বিষয়গুলোও মনে করিয়ে দেয়—দুই দেশের সম্পর্কের বরফ কিছুটা গললেও তা পুরোপুরি গলে যায়নি।
ইরান–আমিরাত: একই টেবিলে আরেক পরীক্ষা
ব্রিকসের বিস্তৃতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়তো মধ্যপ্রাচ্য।
ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত একই প্ল্যাটফর্মে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে।
এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের প্রতিনিধিদের একই কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যে আলোচনায় বসা ব্রিকসের জন্য একটি সম্ভাব্য সুবিধা তৈরি করেছে।
ব্রিকস যদি সত্যিই সংঘাতরত বা প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংলাপের জায়গা তৈরি করতে পারে, তাহলে এটি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি একটি অতিরিক্ত কূটনৈতিক চ্যানেল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু সেটিকে ‘মধ্যস্থতাকারী শক্তি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু সম্মেলন নয়, বাস্তব কূটনৈতিক ফল দেখাতে হবে।
ব্রিকসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা—অভিন্ন কৌশলের অভাব
দিল্লি সম্মেলনের সাফল্য যতটা দৃশ্যমান, সীমাবদ্ধতাও ততটাই স্পষ্ট।
ব্রিকসের সদস্যরা একদিকে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে কথা বলছে, অন্যদিকে নিজেদের জাতীয় স্বার্থে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।
চীন ও ভারতের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে।
ভারত ও চীন অর্থনৈতিকভাবে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হলেও কৌশলগতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী।
রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে, কিন্তু ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের অর্থনৈতিক মাত্রাও এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি।
ইরান নিষেধাজ্ঞার চাপ মোকাবিলা করতে চাইছে; অন্যদিকে উপসাগরীয় ব্রিকস সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।
এই বাস্তবতায় ব্রিকসের অভিন্ন কৌশল তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন।
তাহলে ব্রিকস কোথায় যাচ্ছে?
দিল্লি সম্মেলন থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট।
প্রথমত, ব্রিকস আর কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতার ফোরাম নয়। এটি ক্রমেই বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা করার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, ব্রিকস পশ্চিমা ব্যবস্থার বিকল্প তৈরি করতে চাইছে—কিন্তু সদস্যদের সবাই পশ্চিমবিরোধী জোট চায় না।
তৃতীয়ত, ব্রিকসের প্রকৃত শক্তি তার সদস্যদের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত ওজন; কিন্তু দুর্বলতা হলো তাদের ভিন্ন রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ।
চীনের জন্য ব্রিকসের পরবর্তী চেয়ারম্যানশিপ ২০২৭ সালে নতুন পরীক্ষা নিয়ে আসবে। দিল্লি সম্মেলনে চীনকে পরবর্তী চেয়ারম্যানশিপের জন্য সমর্থন দেওয়া হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো—বেইজিং কি ব্রিকসকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে নিয়ে যাবে, নাকি জোটটি মূলত রাজনৈতিক বক্তব্যের প্ল্যাটফর্ম হিসেবেই থাকবে?
বাংলাদেশের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের পরিবর্তন সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি, যার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারত, চীন, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমা বাজার—সব দিকেই বিস্তৃত।
ফলে ব্রিকস যদি স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং নতুন বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এর অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে পারে।
কিন্তু এখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও রয়েছে।
যদি ব্রিকস ধীরে ধীরে একটি পশ্চিম বিরোধী ভূরাজনৈতিক ব্লকে পরিণত হয়, তাহলে বাংলাদেশের মতো ভারসাম্য নির্ভর অর্থনীতির জন্য পক্ষ বেছে নেওয়ার চাপ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে ব্রিকস যদি মোদীর ভাষায় ‘কারও বিরুদ্ধে নয়’—এমন বহুমুখী সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিকশিত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য সুযোগ অনেক বেশি।
ঢাকার কৌশল হওয়া উচিত—কোনো ব্লকের অংশ হওয়ার চেয়ে একাধিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকা।
চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া এবং উপসাগরীয় দেশ—সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ককে জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে পরিচালনা করা বাংলাদেশের জন্য অধিক বাস্তবসম্মত।
গোল টেবিল থেকে বাস্তব পৃথিবী :দিল্লির গোল টেবিল একটি প্রতীক।এখানে একসঙ্গে বসেছে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র, নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা দেশ, পশ্চিমের কৌশলগত অংশীদার এবং পশ্চিমা প্রভাবের সমালোচক শক্তি।
তারা সবাই পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার কথা বলছে।কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করা আর তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা এক বিষয় নয়।
ব্রিকসের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—তারা কি রাজনৈতিক বক্তব্যকে বাস্তব প্রতিষ্ঠান, কার্যকর বাণিজ্যব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য আর্থিক কাঠামো এবং কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগে রূপান্তর করতে পারবে?
দিল্লি সম্মেলন দেখিয়েছে, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সদস্যরা একই টেবিলে বসতে পারে। কিন্তু একই টেবিলে বসা মানেই একই পথের যাত্রী হওয়া নয়।
বরং ব্রিকসের বর্তমান বাস্তবতা হলো—প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেই সহযোগিতা, মতপার্থক্যের মধ্যেই ঐকমত্য এবং পশ্চিমা ব্যবস্থার সমালোচনার মধ্যেই বিকল্প তৈরির চেষ্টা।
নতুন বিশ্বব্যবস্থার আসল পরীক্ষা তাই দিল্লির সম্মেলনকক্ষে শেষ হয়নি।
এখন শুরু হলো তার বাস্তব পরীক্ষা—কে নিয়ম বানাবে, কে সেই নিয়ম মানবে, আর কে বদলে যাওয়া বিশ্বের নতুন নিয়মে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারবে।এই সংস্করণে দিল্লি সম্মেলনের সাম্প্রতিক ঘোষণাপত্র, ভারত–চীন সমীকরণ, ইরান–আমিরাত সংলাপ, অর্থনৈতিক বিকল্প এবং বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রভাব একসঙ্গে রাখা হয়েছে। ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে স্থানীয় মুদ্রা ও আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট নিয়েও যে বাস্তব উদ্যোগের কথা আছে, সেটি প্রতিবেদনে আলাদা গুরুত্ব পেয়েছে।
সামনে কোন পথ?
দিল্লি সম্মেলনের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত কোনো নির্দিষ্ট চুক্তি নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করা, যেখানে পরস্পরের সঙ্গে মতবিরোধ থাকা দেশগুলোও একই টেবিলে বসে কথা বলতে পারছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইউক্রেন যুদ্ধ, মার্কিন শুল্কনীতি, নিষেধাজ্ঞা, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং আর্থিক ব্যবস্থার পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে বিশ্ব এখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের সময়ে ব্রিকস সদস্যদের সামনে দুটি পথ।
একটি হলো পশ্চিমবিরোধী একটি রাজনৈতিক ব্লকে পরিণত হওয়া।
অন্যটি হলো—কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে নয়, বরং বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা।
ভারত দ্বিতীয় পথটিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে সম্মেলনের বক্তব্য ও কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে প্রতীয়মান হয়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্রিকসের সাফল্য নির্ভর করবে কথার ওপর নয়, বাস্তব ফলাফলের ওপর।
নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা সদস্যদের কাছে যতই স্পষ্ট হোক, সেই ব্যবস্থা কেমন হবে এবং কীভাবে সেখানে পৌঁছানো যাবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত।
দিল্লির গোল টেবিলে তাই শুধু নেতারা বসেননি।বসেছিল একটি পরিবর্তনশীল বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরস্পরবিরোধী স্বার্থ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং অনিশ্চয়তা।
আর মোদীর ‘নিয়ম অনুসরণকারী’ নয়, ‘নিয়ম সৃষ্টিকারী’ হওয়ার আহ্বানের প্রকৃত পরীক্ষা এখন শুরু হবে সম্মেলন শেষ হওয়ার পর।

