ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অস্বস্তির কাঁটা: শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের কূটনৈতিক দ্বিধা ।।শেখ হাসিনার ‘একগুঁয়েমি’ ও ভারতের বিরক্তি
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অস্বস্তির কাঁটা: শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের কূটনৈতিক দ্বিধা

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বর্তমানে এক জটিল মোড় অতিক্রম করছে। এই সম্পর্কের বর্তমান অস্বস্তির মূল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যিনি গত দুই বছর ধরে ভারতে আশ্রয়ে রয়েছেন।
প্রত্যর্পণ ইস্যুতে কূটনৈতিক নীরবতা

২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়ে ভারতের কাছে কূটনৈতিক নোট ভার্বাল পাঠিয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যাসহ বিভিন্ন মামলায় বিচারের মুখোমুখি করতে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়ে একাধিকবার ভারতের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই অনুরোধে সাড়া না দিয়ে ভারত কার্যত চুপচাপ বসে আছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটি এই সংক্রান্ত একটি প্রশ্ন করেছিল সরকারকে। সরকারের উত্তর সম্বলিত রিপোর্টটি সংসদের উচ্চ ও নিম্ন দুই কক্ষেই পেশ করা হয়েছে ৩০শে জুলাই। ভারতে অবস্থানকারী বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানোর আবেদন খতিয়ে দেখছে দিল্লি।
আইনি জটিলতা নাকি কূটনৈতিক কৌশল?
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধের মামলা’য় অভিযুক্ত বা ফেরার আসামি ও বন্দিদের একে অপরের কাছে হস্তান্তরের জন্য একটি চুক্তি আছে সেই ২০১৩ সাল থেকেই। ওই চুক্তিতে এমন কতগুলো বিধান বা শর্ত আছে, যার যে কোনওটাকে ব্যবহার করে ভারত এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে। নানা আইনি জটিলতা বা মারপ্যাঁচ দেখিয়েও সেই অনুরোধ ফেলে রাখতে পারে দিনের পর দিন।
সবচেয়ে বড় কথা – শেখ হাসিনা বিগত প্রায় ৫০ বছর ধরে ভারতের সবচেয়ে আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ত বন্ধুদের একজন। শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের আবেগপ্রবণ সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হলো হাসিনার শাসনামলে দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা দৃঢ় রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক।
শেখ হাসিনার ‘একগুঁয়েমি’ ও ভারতের বিরক্তি

দিল্লিতে নামার পর প্রথম দিন থেকেই শেখ হাসিনার প্রত্যাশা ছিল – বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে ভারত তাকে সাহায্য করবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্তরে ভারতের সম্পর্কও ঐতিহাসিক, ফলে তাতে ভারতও যে খুব একটা নিমরাজি ছিল সেটাও নয়।
কিন্তু ভারতের স্বরাষ্ট্র বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে আভাস মিলছে, সেই লক্ষ্যে দিল্লি গত দু’বছরে যা-ই প্রস্তাব দিয়েছে, তিনি সেটা মানতে চাননি। উদাহরণস্বরূপ, ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের স্ট্র্যাটেজি কী হওয়া উচিত – তা নিয়ে ভারতের পরামর্শ শেখ হাসিনার মনঃপূত হয়নি বলেই দিল্লিতে কর্মকর্তারা আভাস দিচ্ছেন।
এমনকি দলের নেতৃত্বে সামান্যতম বা সাময়িক কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাবও দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের ‘নেতৃত্বে’র ভার তার বা তার পরিবারের বাইরে কারও হাতে অল্প সময়ের জন্যও যাক, এটা নাকি তিনি কখনোই মেনে নিতে পারেননি। বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর এই অনড় মনোভাব ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা ভারতের কর্মকর্তাদেরও বিরক্ত করেছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে থমকে যাওয়া আলোচনা
ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বহু গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা গত দু’বছরে থমকে আছে। সেই কথাবার্তা না এগোনোর কারণ হিসেবে দু’পক্ষই শেখ হাসিনার প্রসঙ্গকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করছে। কোনো আলোচনায় অগ্রগতি না হলে বাংলাদেশ এটা বলার সুযোগ পাচ্ছে যে, শেখ হাসিনাকে ফেরত না দেওয়া হলে আসলে আস্থার পরিবেশটাই ফিরবে না বা কোনো অর্থপূর্ণ আলোচনা সম্ভব হবে না।
অন্যদিকে ভারত পাল্টা যুক্তি দিচ্ছে, শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ আলোচনার বাইরে রেখেই অন্য কথাবার্তা এগিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু বাংলাদেশ সেই সদিচ্ছা দেখাচ্ছে না। ফলে ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক যে কিছুতেই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে পারছে না, ফলে তার একটা বড় কারণ শেখ হাসিনা।
সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি
দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের বার্তা দিয়ে আসছিল। তবে গত বুধবার দিল্লিতে শেখ হাসিনার ওই অনুষ্ঠান দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শেখ হাসিনা এখন শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নন; তিনি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ইস্যুতে পরিণত হয়েছেন। দুই বছরের ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট হয়েছে, শেখ হাসিনা ইস্যুটি সমাধান ছাড়া ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে না।
ভারতের জন্য এটি একটি কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ – একদিকে ঐতিহাসিক মিত্র ও আস্থাভাজন নেত্রীকে রক্ষা করা, অন্যদিকে নতুন বাংলাদেশ সরকারের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন। বাংলাদেশের জন্যও এটি একটি পরীক্ষা – কীভাবে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে প্রত্যর্পণ নিশ্চিত করা যায়।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যকার সুসম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে এই ইস্যুটির একটি দ্রুত ও যৌক্তিক সমাধান অপরিহার্য। নাহলে, শেখ হাসিনা ইস্যুটি আরও দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অস্বস্তির কাঁটা হয়ে থাকবে।
শেখ হাসিনার অনমনীয়তা বাআপনার উল্লেখ করা বিষয়টি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণের আলোকে সঠিক: শেখ হাসিনার অনমনীয়তা বা “একগুঁয়েমি” ভারতের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরক্তির সৃষ্টি করেছে এবং এটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের জটিলতার আরেকটি স্তর যোগ করেছে।
শেখ হাসিনার প্রত্যাশা ও ভারতের অবস্থান
আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনে সহায়তা: দিল্লিতে পৌঁছানোর পর থেকেই শেখ হাসিনার প্রত্যাশা ছিল যে, ভারত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনে তাকে সহায়তা করবে।
ঐতিহাসিক সম্পর্ক: আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ঐতিহাসিক ও পারস্পরিক আস্থার; ফলে শুরুতে ভারতও এই বিষয়ে নিমরাজি ছিল না।
ভারতের সীমিত সমর্থন: তবে গত দুই বছরে ভারত বারবার প্রকাশ্যে দাবি করেছে যে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা আওয়ামী লীগ নিয়ে যা করছেন, তা তিনি করছেন “ইন্ডিভিজুয়াল ক্যাপাসিটি”তে – তার সাথে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই।
একগুঁয়েমির উদাহরণ
নির্বাচনী কৌশল নিয়ে মতবিরোধ: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের কৌশল কী হওয়া উচিত – তা নিয়ে ভারতের পরামর্শ শেখ হাসিনার মনঃপূত হয়নি বলে দিল্লিতে কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছেন।
নেতৃত্বের পরিবর্তনে অনড়তা: দলের নেতৃত্বে সামান্যতম বা সাময়িক কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাবও তিনি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন; আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের ভার তার বা তার পরিবারের বাইরে কারও হাতে অল্প সময়ের জন্যও যাক, এটা তিনি কখনোই মেনে নিতে পারেননি।
রাজনৈতিক বাস্তবতা অস্বীকার: বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর এই অনড় মনোভাব ও রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করা ভারতের কর্মকর্তাদেরও বিরক্ত করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকদের মতামত
অ্যাসেট থেকে লায়বিলিটি: একসময় শেখ হাসিনাকে ভারতীয় পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ “অ্যাসেট” হিসেবে দেখা হতো; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকে “লায়াবিলিটি” হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
নির্ভরযোগ্য উপাদান থেকে জটিলতা: ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে শেখ হাসিনা একজন রাজনৈতিক মিত্রের পাশাপাশি একটি “নির্ভরযোগ্য উপাদান” ছিলেন; কিন্তু তার অনমনীয়তা ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা অস্বীকার করার মনোভাব ভারতের জন্য জটিলতা তৈরি করেছে।
প্রভাব
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে টানাপোড়েন: শেখ হাসিনার এই একগুঁয়েমি শুধু ভারতের কর্মকর্তাদের বিরক্তই করছে না, বরং এটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের উন্নয়ন প্রচেষ্টায়ও বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ভারতের দ্বিমুখী নীতি: একদিকে ভারত শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে আতিথেয়তা দিচ্ছে, অন্যদিকে তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে – এই দ্বিমুখী নীতি স্পষ্ট হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, শেখ হাসিনার অনমনীয়তা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা অস্বীকার করার মনোভাব ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের জটিলতার আরেকটি স্তর যোগ করেছে এবং এটি দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন প্রচেষ্টায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ভারতের সংসদীয় কমিটির রিপোর্টে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের নতুন কৌশল হিসেবে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মূল কৌশলগত দিকনির্দেশনা
১. নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন
সক্রিয় ভূমিকা: বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে গড়ে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান: বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সমর্থন: গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও জনগণকেন্দ্রিক বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান ধরে রাখতে নয়াদিল্লি সরকারকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
২. সংসদীয় যোগাযোগ জোরদার
নিয়মিত বিনিময়: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হওয়া উচিত দুই দেশের সংসদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও বিনিময়।
প্রতিনিধি দলের সফর: বাংলাদেশের নতুন সংসদ ও সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় অদূর ভবিষ্যতে সংসদীয় প্রতিনিধি দলের পারস্পরিক সফরের আয়োজন করতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক রূপ: ভবিষ্যতে এ ধরনের বিনিময়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
৩. অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান
দ্রুত উদ্যোগ: পারস্পরিক স্বার্থ ও সংবেদনশীলতাকে গুরুত্ব দিয়ে অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
গঙ্গা চুক্তি: ১৯৯৬ সালের ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে এক বছরেরও কম সময় বাকি থাকলেও এখনও আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু না হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি।
তিস্তা চুক্তি: তিস্তা চুক্তি সম্পাদন নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত সরকার নতুন করে আলোচনা শুরু করুক।
৪. ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিককরণ
দ্রুত স্বাভাবিককরণ: বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
নেতিবাচক প্রভাব: বাংলাদেশিদের ভিসা প্রক্রিয়াকরণ কমে যাওয়া এবং নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধ দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক ও ইতিবাচক ধারণার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ধাপে ধাপে চালু: পরিস্থিতি অনুকূলে এলেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে বাংলাদেশে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।
৫. চীনের প্রভাব মোকাবিলা
উদ্বেগ: বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ও প্রতিরক্ষা সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি।
পর্যবেক্ষণ: বাংলাদেশে বিদেশি শক্তিগুলোর কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
ঝুঁকি: ভারতের জন্য “বন্ধু নয়” এমন কোনো দেশ যদি বাংলাদেশে সামরিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে, তাহলে তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
সুপারিশ: ভারত সরকারকে বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগিতা আরও জোরদার করে দেশটিতে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী করার সুপারিশ করা হয়েছে।
৬. সীমান্ত ও নিরাপত্তা সহযোগিতা
৩৩টি সুপারিশ: রিপোর্টে ৩৩টি সুপারিশের মাধ্যমে মোদি সরকারকে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের নতুন কৌশল বাতলে দেওয়া হয়েছে।
সীমান্ত নিরাপত্তা: রিপোর্টে সীমান্ত নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু সুরক্ষা, উন্নয়ন সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক কূটনীতি, পানি বণ্টন ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে সুপারিশ রয়েছে।
যৌথ কর্মী দল: ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া বা যৌথ কর্মী দল তৈরি করার আহ্বান জানিয়েছে কমিটি, যা জাতীয়তা যাচাইকরণ এবং নথিভুক্ত অভিবাসীদের প্রত্যর্পণ পর্যবেক্ষণ করবে।
৭. কৌশলগত চ্যালেঞ্জ স্বীকার
বড় চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভারতের জন্য “সবচেয়ে বড় স্ট্র্যাটেজিক (কৌশলগত) চ্যালেঞ্জ” তৈরি করেছে।
১৯৭১ পরবর্তী সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বর্তমানে বাংলাদেশ নিয়ে সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে ভারত।
দীর্ঘমেয়াদী পরীক্ষা: এটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং ভারতের প্রতিবেশী নীতির উপর প্রভাব ফেলে- এমন একটি “গভীর ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরীক্ষার” প্রতিনিধিত্ব করে।
সামগ্রিকভাবে, সংসদীয় কমিটির রিপোর্টে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের নতুন কৌশল হিসেবে একটি বহুমুখী ও প্রাগম্যাটিক (বাস্তবমুখী) পদ্ধতির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠন, সংসদীয় যোগাযোগ জোরদার, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান, ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিককরণ, চীনের প্রভাব মোকাবিলা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা সহযোগিতা – সবকিছুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই তার অবস্থান নিয়ে ভারত সরকার কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখেছে।
শেখ হাসিনার বর্তমান অবস্থান

গোপনীয়তা: শেখ হাসিনা ভারতে যাওয়ার পর থেকে কোথায় আছেন বা কীভাবে আছেন তা নিয়ে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখন পর্যন্ত কিছু জানায়নি।
লুটিয়েন্স জোন: ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লির লুটিয়েন্স বাংলো জোনের একটি বাড়িতে গত দুই মাস ধরে বসবাস করছেন শেখ হাসিনা।
সুরক্ষিত বাড়ি: দিল্লির অভিজাত লুটিয়েন্স বাংলো জোনের একটি সুরক্ষিত বাড়িতে তাকে রাখা হয়েছে।
নিরাপত্তা: বাংলাদেশের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জন্য কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে ভারত সরকার। শেখ হাসিনার এখানে থাকার বিষয়টি দেখভাল করছেন ভারতের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।
ভারতের আতিথেয়তা নীতি
আতিথেয়তা, আশ্রয় নয়: আপাতত ভারত শেখ হাসিনাকে ‘আতিথেয়তা’ দিতে চাইছে – ‘আশ্রয়’ নয়!
সংশোধিত ট্র্যাভেল অ্যারেঞ্জমেন্ট: দিল্লিতে একাধিক শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে আভাস দিয়েছেন, ভারতে শেখ হাসিনার এই মুহুর্তে অবস্থানের ভিত্তিটা হল ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘সংশোধিত ট্র্যাভেল অ্যারেঞ্জমেন্ট’।
সাময়িক অবস্থান: ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান সাময়িক। তিনি দেশটিতে রাজনৈতিক আশ্রয় চাননি।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
দালাই লামা ও নাজিবুল্লাহ: দালাই লামা বা সাবেক আফগান প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ নাজিবুল্লাহর পরিবার ‘হোস্ট কান্ট্রি’ ভারতের সব ‘চাওয়া-পাওয়া’র সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন।
সফল ‘হাতিয়ার’: দালাই লামা যেভাবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি সফল ‘হাতিয়ার’ হয়ে উঠতে পেরেছেন, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে তা ঘটেনি।
অ্যাসেট থেকে লায়বিলিটি: ‘অ্যাসেট’ বা সম্পদ হিসেবে নয়, তার ক্ষেত্রে বরং ‘লায়াবিলিটি ফ্যাক্টর’ বা বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর বিষয়টাই বেশি বড় হয়ে উঠেছে বলে দিল্লিতে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
আঞ্চলিক জিওপলিটিক্সের প্রভাব
কৌশলগত চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভারতের জন্য “সবচেয়ে বড় স্ট্র্যাটেজিক (কৌশলগত) চ্যালেঞ্জ” তৈরি করেছে।
১৯৭১ পরবর্তী সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বর্তমানে বাংলাদেশ নিয়ে সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে ভারত।
চীন-পাকিস্তান কানেকশন: বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ও প্রতিরক্ষা সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ভারতের সংসদীয় কমিটি।
সামগ্রিকভাবে, শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই তার অবস্থান নিয়ে ভারত সরকার কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখেছে। দিল্লির লুটিয়েন্স জোনের একটি সুরক্ষিত বাড়িতে তাকে রাখা হয়েছে, যেখানে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে দালাই লামা বা নাজিবুল্লাহর মতো শেখ হাসিনা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির একটি সফল ‘হাতিয়ার’ হয়ে উঠতে পারেননি; বরং ‘লায়াবিলিটি ফ্যাক্টর’ বা বোঝা হয়ে দাঁড়ানোর বিষয়টাই বেশি বড় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে একটি জটিল ও টানাপোড়েনপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটি প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।ittefaq+2
বর্তমান সম্পর্কের অবস্থা
-
টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক: গত দুই বছর ধরে টানাপোড়েনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটি এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে।
-
সহায়ক পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা: প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ভারতকে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ; বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটির সমাধান ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া কঠিন বলে মনে করছে ঢাকা
-
ফ্রেশ স্টার্টের আহ্বান: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ভারতের সাথে সম্পর্কে “ফ্রেশ স্টার্ট” চান এবং এই বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনারের সাথে আলোচনা করেছেন।
সাম্প্রতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ
-
প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠক: ২০২৬ সালের ১০ আগস্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন; এই বৈঠকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
-
প্রত্যর্পণের অনুরোধ: বৈঠকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পুনর্ব্যক্ত করা হয়; এছাড়া গণঅভ্যুত্থানের পর নিহত ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদেরও বাংলাদেশে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
-
ভারতের প্রতিক্রিয়া: ভারতীয় হাইকমিশনার বলেন, “ডেমোক্রেসিতে ইস্যুজ থাকবে… কিন্তু মানুষের ইস্যু একটাই, ভালো সম্পর্ক। ভালো সম্পর্ক হলে উইন উইন সিচুয়েশন।
মূল বিতর্কের বিষয়গুলো
-
প্রত্যর্পণ ইস্যু: শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যুর সমাধান না করে ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক নয় বলে মনে করছে বাংলাদেশ সরকার ।
-
দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন: ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের অনুমতি দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ; পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে বাংলাদেশের জুডিশিয়ারির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
-
আইনি জটিলতা: প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফেরানো কঠিন হতে পারে; চুক্তিতে এমন কতগুলো বিধান বা শর্ত আছে, যার যে কোনোটা ব্যবহার করে ভারত এই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে
ভারতের অবস্থান
-
পর্যালোচনাধীন: বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ঢাকা থেকে পাওয়া আবেদনটি “সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারা খতিয়ে দেখা হচ্ছে” বলে ভারতীয় একটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে জানিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার
-
প্রক্রিয়াগত সমাধান: প্রযোজ্য আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে
-
ঐতিহাসিক সম্পর্ক: শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের আবেগপ্রবণ সম্পর্ক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ হলো হাসিনার শাসনামলে দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠা দৃঢ় রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক
সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক বর্তমানে একটি সংকটময় পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটি প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক স্বার্থ থাকা সত্ত্বেও এই ইস্যুটির সমাধান ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া কঠিন বলে মনে করছে কূটনৈতিক মহল।

