ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব ও প্রবাস-কূটনীতি: ১০০ আইনজীবীর ঢাকা যাত্রা কি ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন হাতিয়ার?
বিশেষ প্রতিবেদক | ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের চরম রাজনৈতিক পালাবদল এবং বিচার বিভাগ ঘিরে চলমান অস্থিরতার মধ্যেই রাজনীতির মাঠে নতুন এক সমীকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। দেশে যখন পতিত সরকারের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার পাহাড় জমছে, ঠিক তখন যুক্তরাজ্যের ১০০ জন প্রবাসী আইনজীবী বাংলাদেশে এসে ‘আইনি লড়াই’ চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। দৃশ্যত এটি আইনি পদক্ষেপ মনে হলেও, বিশ্লেষকরা একে বিপর্যস্ত রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুদূরপ্রসারী, সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কৌশল হিসেবেই দেখছেন।
সম্প্রতি সাংবাদিক তৌফিক মারুফের উপস্থাপনায় এক ভার্চুয়াল আলোচনায় যুক্ত হয়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী দুই আইনজীবী— ব্যারিস্টার সাঈদ আলী জিরো এবং ব্যারিস্টার মনিরুল ইসলাম মঞ্জু এই উদ্যোগের নেপথ্য কারণ ও রূপরেখা তুলে ধরেন। তাদের এই আলোচনা কেবল প্রবাসীদের উদ্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি নির্দেশনার বিষয়টিও।
লন্ডনের শোকসভা এবং দূরনিয়ন্ত্রিত নির্দেশনার রাজনীতি
আলোচনায় ব্যারিস্টার সাঈদ আলী জিরো জানান, গত ২৪শে আগস্ট লন্ডনের আইভি হলে যুক্তরাজ্যের আইনজীবীরা একটি শোকসভার আয়োজন করেন। সেখানে উপস্থিত হয়ে শেখ হাসিনা সরাসরি এই আইনজীবীদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এই বিষয়টি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দেশে শীর্ষ নেতৃত্ব যখন আত্মগোপনে বা কারাবন্দি, তখন বিদেশ থেকে দলের সভানেত্রীর এমন প্রকাশ্য নির্দেশনা প্রমাণ করে যে, দেশের ভেতরের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে দলটি এখন প্রবাসী পেশাজীবীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। দেশে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলার পরিসর সংকুচিত হওয়ার যে অভিযোগ তারা করছেন, তাকে পুঁজি করেই মূলত আন্তর্জাতিক ও আইনি চাপ তৈরির একটি প্রয়াস চালানো হচ্ছে।
বাস্তবতা বনাম মনস্তাত্ত্বিক চাপ
একসঙ্গে ১০০ জন প্রবাসী আইনজীবীর ঢাকায় এসে আইনি লড়াই করার ঘোষণাটি যতটা বাস্তবসম্মত, তার চেয়ে বেশি মনস্তাত্ত্বিক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। বাংলাদেশের বর্তমান বিচারিক কাঠামোতে বিদেশ থেকে আসা একঝাঁক আইনজীবীর সরাসরি আইনি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া বা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া কতটা আইনিভাবে সম্ভব, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। তবে এই ঘোষণার মূল লক্ষ্য আইনি বিজয়ের চেয়েও রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস ফেরানো। আত্মগোপনে থাকা বা হতাশাগ্রস্ত তৃণমূল নেতাকর্মীদের কাছে এই বার্তাটি পৌঁছানো জরুরি যে, শীর্ষ নেতৃত্ব হাল ছাড়েনি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে একটি সংঘবদ্ধ শক্তি তাদের পাশে দাঁড়াতে আসছে।
‘ঘুরে দাঁড়ানোর’ বয়ান এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার ন্যারেটিভ
আলোচনায় ব্যারিস্টার মনিরুল ইসলাম মঞ্জুর একটি রূপক মন্তব্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ঝড় ও বন্যার সাথে তুলনা করে বলেছেন— “বন্যা এলে পানিতে সয়লাব হয়ে যায়, কিন্তু পানি নেমে গেলে ঢাকা শহর আবার টিকে থাকে।” আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থাকে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে তুলনা করার মাধ্যমে মূলত দলের ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের সত্যতাকেই পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে ৩০ লক্ষ শহীদ এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারা মূলত সেই পুরনো ও পরীক্ষিত আদর্শিক ন্যারেটিভকেই পুনরায় সামনে আনছেন। অর্থাৎ, আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আদর্শিক লড়াইয়ের ময়দানটিও তারা প্রস্তুত রাখতে চাইছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিদেশ থেকে আইনি লড়াই পরিচালনার নজির একেবারে নতুন না হলেও, বর্তমান পরিবর্তিত অভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগের মাত্রা ভিন্ন। এই ১০০ জন প্রবাসী আইনজীবী যদি সত্যিই ঢাকায় এসে আইনি লড়াইয়ের সূচনা করেন, তবে তা কেবল আদালত প্রাঙ্গণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা দেশের রাজপথের রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ আকর্ষণের একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপে পরিণত হতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, বর্তমান প্রশাসন এই মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি চাপকে কীভাবে মোকাবিলা করে। এই উদ্যোগ কি দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি নতুন করে নিবদ্ধ করার মাধ্যমে কোনো ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করবে, নাকি বাংলার চিরায়ত রাজনৈতিক সংঘাতের ইতিহাসেই কেবল আরেকটি উত্তপ্ত অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হবে? যেভাবেই দেখা হোক না কেন, প্রবাসী আইনজীবীদের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করছে— ক্ষমতার লড়াইটি এখন আর কেবল দেশের ভেতরে আটকে নেই, বরং এর একটি বৃহত্তর ফ্রন্ট আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রসারিত হয়েছে।

