বর্তমান ভূ-রাজনীতির দৃশ্যপট: পরাশক্তির নতুন রেষারেষি ।। “ইতিহাসের আয়নায় বর্তমানের চ্যালেঞ্জ”
আলাপচারিতা সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ

ভূ-রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে ১৯৭১, পরাশক্তির স্নায়ুযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী কূটনীতির প্রাসঙ্গিকতা
সুপ্রিয় আলাপচারিতার পাঠক বৃন্দ আমরা আজ বর্তমান সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বলয় বিস্তারের যে প্রতিযোগিতা আমরা দেখছি, তার শেকড় সন্ধানে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দিকে। বাংলাদেশের অভ্যুদয় কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ডের স্বাধীনতা প্রাপ্তি ছিল না; বরং এটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধকালীন (Cold War) বিশ্বব্যবস্থার এক চরম ভূ-রাজনৈতিক স্নায়ুপরীক্ষা। বিশ্বমোড়লদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন ভূখণ্ডকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে বিশ্বমঞ্চে সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তার প্রামাণ্য ইতিহাস আজকের দিনের কূটনীতির জন্যও সবচেয়ে বড় পাঠ।
স্নায়ুযুদ্ধের দাবানল এবং ১৯৭১-এর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

১৯৭১ সালে বিশ্ব পরিষ্কার দুটি মেরুতে বিভক্ত ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে তখন প্রধান লক্ষ্য ছিল চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, আর সেই কূটনীতির প্রধান মাধ্যম (Conduit) ছিল পাকিস্তান। ফলে কৌশলগত কারণেই যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন যেকোনো মূল্যে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষায় মরিয়া ছিল।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল প্রতিবেশী ভারত এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন।
* সোভিয়েত ভেটো: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের আনা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর্যুপরি ‘ভেটো’ প্রয়োগ স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।
* সপ্তম নৌবহর: মুক্তিযুদ্ধের শেষভাগে বঙ্গোপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর (Task Force 74) পাঠানোর হুমকি এবং এর বিপরীতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পারমাণবিক সাবমেরিন মোতায়েন—এই অঞ্চলকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল।
বিবেকের বিদ্রোহ: দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম ও মানবতা
পরাশক্তিগুলোর এই নির্মম হিসাব-নিকাশের মাঝেও কিছু মানুষ মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে. ব্লাড ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল ওয়াশিংটনে একটি কড়া তারবার্তা পাঠান, যা কূটনীতির ইতিহাসে ‘ব্লাড টেলিগ্রাম’ নামে খ্যাত। নিজের ক্যারিয়ারের ঝুঁকি নিয়ে তিনি তার সরকারের নীতির তীব্র সমালোচনা করে লিখেছিলেন:
> “আমাদের সরকার গণতন্ত্র দমনের নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে… আমাদের সরকার এখানকার নৃশংসতার নিন্দা জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। উল্টো আমরা একটি পরিকল্পিত গণহত্যার নীরব দর্শক হয়ে আছি।”
> একজন ভিনদেশি কূটনীতিবিদের এই সাহসী মন্তব্য প্রমাণ করে, ১৯৭১ সালের মার্চ-এপ্রিল থেকেই বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের মাত্রা কতটা ভয়াবহ ছিল এবং নিক্সন প্রশাসন কতটা নির্লিপ্ত ছিল।
বিশ্ববিবেক জাগরণে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম
পরাশক্তি যখন নীরব, তখন বিশ্বজনমত গঠনে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম পালন করেছিল অবিস্মরণীয় ভূমিকা।
* দ্য সানডে টাইমস: ১৯৭১ সালের ১৩ই জুন যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত এই পত্রিকায় সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস-এর ঐতিহাসিক প্রতিবেদন “Genocide” (গণহত্যা) প্রকাশিত হয়। তিনি লিখেছিলেন, “এটি নিছক কোনো সামরিক অভিযান নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত গণহত্যা।” এই প্রতিবেদন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে বিশ্বনেতাদের কাছে বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিতে দারুণভাবে সহায়তা করেছিল।
* সাইমন ড্রিং ও সিডনি শ্যানবার্গ: ২৫শে মার্চের কালরাতের পর সাইমন ড্রিংয়ের পাঠানো প্রতিবেদন এবং ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’-এর সাংবাদিক সিডনি শ্যানবার্গের অবরুদ্ধ ঢাকা থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাঠানো সংবাদগুলো পরাশক্তিগুলোর মনস্তাত্ত্বিক হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছিল।
যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ডে বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল—পরাশক্তিগুলোর রেষারেষি থেকে দেশকে মুক্ত রেখে পুনর্গঠন করা।
* মৈত্রী ও ভারসাম্য: তাঁর প্রণীত পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি—“সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়”—ছিল এক যুগান্তকারী কৌশল। যুদ্ধে অসামান্য সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি যেমন ১৯৭২ সালে মস্কো সফর করেন, তেমনি পশ্চিমা বিশ্বের সাথেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন।
* ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রত্যাহার: স্বাধীনতার মাত্র তিন মাসের মাথায় (১৯৭২ সালের মার্চে) বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক প্রজ্ঞায় বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় মিত্রবাহিনী প্রত্যাহার করা হয়, যা বিশ্ব ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
* বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি: ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (OIC), জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন (NAM) এবং ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলায় দেওয়া তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল।
ইতিহাসের আয়নায় বর্তমানের চ্যালেঞ্জ
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ (IPS) বা চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর মতো ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন আমাদের আবারও একাত্তরের স্নায়ুযুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
বঙ্গবন্ধু যে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy)-এর ভিত্তি রচনা করে গিয়েছিলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সেটিই আমাদের রক্ষাকবচ। আর্চার ব্লাড বা মাসকারেনহাসের মতো মানুষেরা যে সত্য ইতিহাস লিখে রেখে গেছেন, তা প্রমাণ করে—সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য এবং স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান ছাড়া পরাশক্তিগুলোর চাপ মোকাবিলা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
বর্তমান ভূ-রাজনীতির দৃশ্যপট: পরাশক্তির নতুন রেষারেষি
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যদি দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে ১৯৭১ সালের সেই স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হলেও নতুন মোড়কে পরাশক্তিগুলোর প্রভাব বিস্তারের লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ এবং বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল মূলত দুটি বৃহৎ বৈশ্বিক কৌশলের সাঁড়াশি চাপের মধ্যে রয়েছে:
ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (IPS) ও কোয়াড (Quad): একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র দেশগুলোর নেতৃত্বে ‘অবাধ ও উন্মুক্ত ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল’ নিশ্চিত করার নামে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ বাস্তবায়নের চাপ রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে কোয়াড (যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া) জোটের কৌশলগত সমীকরণ, যার মূল লক্ষ্য মূলত এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানো।
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI): অন্যদিকে, চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় বিশাল অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলছে।
ভূ-অর্থনৈতিক মেরুকরণ ও কৌশলগত বন্দর কূটনীতি:
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে (যেমন- শ্রীলঙ্কা বা মালদ্বীপ) সরকার পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে এই পরাশক্তিগুলোর প্রভাব স্পষ্ট। বঙ্গোপসাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্বের কারণে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং লজিস্টিক সাপোর্ট এগ্রিমেন্ট সই করার জন্য পরাশক্তিগুলোর প্রকাশ্য ও প্রচ্ছন্ন চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। এছাড়া প্রতিবেশী মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক নতুন আন্তর্জাতিক পরীক্ষাক্ষেত্র তৈরি করেছে।
বঙ্গবন্ধুর ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’: উত্তরণের একমাত্র পথ
এই জটিল সমীকরণে কোনো একটি নির্দিষ্ট বৈশ্বিক ব্লকে (Global Bloc) সরাসরি যুক্ত হওয়া বা কোনো সামরিক চুক্তির অংশ হওয়া বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। ঠিক এই জায়গাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী কূটনীতির প্রাসঙ্গিকতা সবচেয়ে বেশি। তিনি যে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (Strategic Autonomy)-এর ভিত্তি রচনা করে গিয়েছিলেন—অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে সবার সাথে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রাখা—বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে সেটিই আমাদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। আর্চার ব্লাড বা মাসকারেনহাসের মতো মানুষেরা যে সত্য ইতিহাস লিখে রেখে গেছেন, তা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্য, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং স্বাধীন, ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান ছাড়া পরাশক্তিগুলোর চাপ মোকাবিলা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বাংলাদেশ তার জন্মলগ্নে যেভাবে রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজের পথ তৈরি করেছিল, আজও ঠিক একইভাবে প্রজ্ঞার সাথে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান সুসংহত করতে হবে।

