বিশেষ অনুসন্ধান: ৫ শত টাকায় নিলামে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য, হুমকির মুখে জাতীয় নিরাপত্তা
নিজস্ব প্রতিবেদক, আলাপচারিতা
একবিংশ শতাব্দীতে কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কেবল তার ভৌগোলিক সীমান্তের ওপর নির্ভর করে না; বরং নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাও জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। অথচ, বাংলাদেশের নাগরিকদের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গোপনীয় তথ্য—জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), কল ডিটেল রেকর্ড (সিডিআর) এবং লাইভ লোকেশন—এখন বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্য নিলামে। ডার্ক ওয়েব বা কোনো গুপ্তচর সংস্থার গোপন নেটওয়ার্ক নয়, খোদ ফেসবুক ও টেলিগ্রামের মতো সাধারণ প্ল্যাটফর্মে মাত্র ৫০০ থেকে ১ হাজার ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এসব তথ্য।
অনলাইনে তথ্য কেনাবেচার এই বিশাল কালোবাজার কেবল ব্যক্তিপর্যায়ের গোপনীয়তাকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, বরং রাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ অশনিসংকেত তৈরি করেছে।
তথ্যের খোলা বাজার ও শিউরে ওঠা বাস্তবতা
তথ্য যাচাইকারী ও গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান ‘ডিসমিসল্যাব’-এর সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সাইন কপি’ লিখে অনুসন্ধান করলেই শত শত পোস্ট বেরিয়ে আসছে, যেখানে প্রকাশ্যে ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানকারীরা ক্রেতা সেজে দালাল চক্রের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তথ্য ফাঁসের যে চিত্র বেরিয়ে আসে, তা যেকোনো সচেতন নাগরিককে আতঙ্কিত করবে:
- এনআইডি জালিয়াতি: একটি নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর ও মাত্র ৫০০ টাকা দেওয়ার ১৭ মিনিটের মাথায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির এনআইডির পিডিএফ কপি সরবরাহ করেছে দালাল চক্র। সেখানে নাম, ছবি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সংশোধন করা তথ্যও ছিল নিখুঁত।
- কল রেকর্ড ফাঁস: ১ হাজার ৫০ টাকার বিনিময়ে আড়াই ঘণ্টার মধ্যে একটি নম্বরের তিন মাসের সম্পূর্ণ কল ডিটেল রেকর্ড (সিডিআর) পাওয়া গেছে।
- লাইভ লোকেশন ট্র্যাকিং: মাত্র ১৬ মিনিটের মধ্যে একটি নম্বরের সর্বশেষ সক্রিয় সময়, টাওয়ারভিত্তিক অবস্থান ও গুগল ম্যাপের সুনির্দিষ্ট ঠিকানা বের করে দেওয়া হয়েছে।
এই চক্রটি যোগাযোগের জন্য অন্তত ১১২টি আলাদা মোবাইল নম্বর ও ৩৬টি সক্রিয় ফেসবুক গ্রুপ ব্যবহার করছে। এমনকি ৪ হাজার ৫০০ টাকার বিনিময়ে মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) সম্পূর্ণ স্টেটমেন্ট বের করে দেওয়ারও প্রমাণ মিলেছে।
সিস্টেমের ভেতরেই কি লুকিয়ে আছে বিপদ?
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এত দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে রাষ্ট্রীয় বা কর্পোরেট ডেটাবেস থেকে তথ্য বের করা কোনো সাধারণ হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে সম্ভব নয়। ১৭ মিনিটে এনআইডি বা ১৬ মিনিটে লাইভ লোকেশন দেওয়ার অর্থ হলো—সিস্টেমের ভেতরে থাকা কোনো অসাধু চক্র, হোক তারা টেলিকম অপারেটরের কর্মী বা সরকারি ডেটাবেসের রক্ষণাবেক্ষণের সঙ্গে জড়িত কেউ, সরাসরি এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত। ২০২৩ সাল থেকে এই চক্রগুলো অনলাইনে প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যবসা চালালেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নীরবতা অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
ভূ-রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার চরম ঝুঁকি
ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের এই ঘটনাকে কেবল প্রতারণা বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটি সরাসরি রাষ্ট্রের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি:
- ক্রস-বর্ডার টেররিজম ও গুপ্তচরবৃত্তি: অরক্ষিত এই ডেটাবেস যদি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা বা আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে পড়ে, তবে তারা সহজেই বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচয়ে ভুয়া এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরি করতে সক্ষম হবে। এর মাধ্যমে দেশে-বিদেশে নাশকতা চালানো বা স্লিপার সেল তৈরি করা অত্যন্ত সহজ হয়ে যাবে।
- কৌশলগত অবস্থান ট্র্যাকিং: সামরিক কর্মকর্তা, নীতিনির্ধারক বা গুরুত্বপূর্ণ ভিআইপিদের মোবাইল লোকেশন এবং কল রেকর্ড যদি মাত্র কয়েক হাজার টাকায় কেনা যায়, তবে রাষ্ট্রের যেকোনো সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত বা অপারেশন বিদেশি শক্তির কাছে মুহূর্তের মধ্যে ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়া: নাগরিকদের আর্থিক লেনদেনের তথ্য ও এমএফএস স্টেটমেন্ট ভিনদেশি হ্যাকার বা শত্রুরাষ্ট্রের হাতে পৌঁছালে তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের সাইবার হামলা চালানোর পথ প্রশস্ত করবে।
কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও আমাদের করণীয়
নাগরিকের তথ্যভাণ্ডার অরক্ষিত রেখে কোনো রাষ্ট্র ডিজিটাল সক্ষমতার দাবি করতে পারে না। তথ্যই যেখানে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র, সেখানে রাষ্ট্রের ডেটাবেস ফুটো হয়ে যাওয়া মানে জাতীয় নিরাপত্তাকে শত্রুর হাতে তুলে দেওয়া।
সরকার, টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি) এবং সাইবার সিকিউরিটি এজেন্সিগুলোকে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। সিস্টেমের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ডেটাবেসের নিরাপত্তা কাঠামোকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। নতুবা, তথ্য ফাঁসের এই কালোবাজার অচিরেই দেশের জন্য এক অপূরণীয় বিপর্যয় ডেকে আনবে।

