তিস্তা ঘিরে ত্রিমুখী ভূরাজনীতি: বেইজিং ও দিল্লির দ্বন্দ্বে এবার ওয়াশিংটনের কৌশলগত নজরদারি

বিশেষ প্রতিবেদক, আলাপচারিতা
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা তিস্তা নদীকে ঘিরে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এক অভূতপূর্ব মোড় নিচ্ছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও চীনের মধ্যে চলা কৌশলগত নীরব প্রতিযোগিতায় এবার সরাসরি দৃশ্যপটে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। গত দুই মাসের ব্যবধানে রংপুরের তিস্তা ব্যারেজ অঞ্চলে মার্কিন কর্মকর্তাদের তিনটি পৃথক সফর এবং কারিগরি তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি দেশের পানি-সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ওয়াশিংটনের গভীরতর সম্পৃক্ততার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তিস্তায় মার্কিন সেনাপ্রকৌশলীর উপস্থিতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা
সর্বশেষ তিন দিনের সফর শেষে ১০ সেপ্টেম্বর রংপুর ত্যাগ করেছে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধিদল। এর আগের দিন, ৯ সেপ্টেম্বর তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন মার্কিন সেনাবাহিনীর পানি-সম্পদ প্রকৌশলী ক্যালভিন ট্রেবর ফেসোজ ক্রিচ (Calvin Trebor Phesoj Creech)।
তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাসের চার কর্মকর্তা—
-
চার্লস ফিলিপ বেসনার জুনিয়র (রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকর্তা)
-
ডেভিড ইভান হার্লি
-
উইলিয়াম স্টিভেনসন লোগান চতুর্থ
-
মিশেল অ্যাঞ্জেলা হিলারি
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলীদের সঙ্গে এই মার্কিন প্রতিনিধিদলের সুনির্দিষ্ট কী বিষয়ে মতবিনিময় হয়েছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বেসামরিক পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীর উপস্থিতি পুরো তৎপরতাটিতে ভিন্ন কৌশলগত মাত্রা যোগ করেছে।
এর আগে ৩১ আগস্ট মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন তিস্তা ব্যারেজ পরিদর্শনকালে তিস্তাকে ‘উত্তরাঞ্চলের প্রাণস্রোত’ বলে অভিহিত করেছিলেন। যদিও সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশদ কিছু জানানো হয়নি, তবে ধারাবাহিক সফরগুলো ইঙ্গিত দেয় যে ওয়াশিংটনের আগ্রহ নিছক সৌজন্যমূলক পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
নিজস্ব অর্থায়নের ঘোষণা ও তৎপরবর্তী মার্কিন গতিবিধি
পাউবোর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো তিস্তা মহাপরিকল্পনার সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে চূড়ান্ত চুক্তির জন্য অপেক্ষমাণ থাকলেও সম্প্রতি প্রেক্ষাপট বদলেছে। সরকার তিস্তা প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পরপরই মার্কিন প্রতিনিধিদলগুলোর রংপুর সফর শুরু হয়।
সফরকালে মার্কিন প্রতিনিধিরা প্রকল্পের সরেজমিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি কারিগরি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন এবং তিস্তা ব্যারেজে কারিগরি সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
কৌশলগত নজরদারি বনাম ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য
সংশ্লিষ্ট একটি গোয়েন্দা সূত্রের দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশে চীনা স্বার্থ ও অর্থায়ন সংশ্লিষ্ট সংবেদনশীল প্রকল্পগুলোর ওপর ওয়াশিংটন তার কূটনৈতিক ও কৌশলগত পর্যবেক্ষণ জোরদার করেছে। ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রকল্পগুলোর কারিগরি ও ভৌগোলিক তথ্য সংগ্রহ এই প্রক্রিয়ারই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
তিস্তা ইস্যুটি এত দিন মূলত দুটি প্রধান অক্ষের ওপর আবর্তিত হচ্ছিল:
-
ভারতের সংবেদনশীলতা: আন্তঃসীমান্ত নদী হিসেবে তিস্তার ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা তথাকথিত ‘চিকেনস নেক’-এর সন্নিকটে। ফলে সেখানে যেকোনো বহিঃশক্তির উপস্থিতি দিল্লির জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
-
চীনের কৌশলগত বিনিয়োগ: সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ করে সিনোহাইড্রো বড় বিনিয়োগের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলে তাদের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আগ্রহী ছিল।
এই সমীকরণে ওয়াশিংটনের সরাসরি সম্পৃক্ততা স্পষ্টতই একটি ত্রিমুখী ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ক্ষেত্র তৈরি করছে। বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা শেষ পর্যন্ত কী রূপ নেবে, তা নির্ভর করছে কয়েকটি মূল বিষয়ের ওপর—প্রস্তাবিত মার্কিন কারিগরি সহায়তার শর্ত কী, ওয়াশিংটন মূলত কী ধরনের হাইড্রোলজিক্যাল ও ভৌগোলিক উপাত্তে আগ্রহী এবং এই তৎপরতা কেবল প্রকৌশলগত সহায়তায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বৃহত্তর কোনো ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশের অংশ হবে।
নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণার মুখে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের এই টানাটানি বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য একটি নতুন ও জটিল পরীক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করল।
-
ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা: এই করিডোরটি কোথাও কোথাও মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত। ভুটান, নেপাল, বাংলাদেশ এবং তিব্বত (চীন) সীমান্তের মাঝে অবস্থিত এই পথটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের একমাত্র স্থলসংযোগ।
-
দিল্লির ভয়: চীন যদি তিস্তা মহাপরিকল্পনা বা ড্রেজিংয়ের নামে বাংলাদেশ অংশে দীর্ঘমেয়াদে তাদের বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী এবং কর্মী বহর মোতায়েন রাখে, তবে তা কার্যত শিলিগুড়ি করিডোর থেকে মাত্র ৫০-১০০ কিলোমিটার দূরে বেইজিংয়ের স্থায়ী উপস্থিতির সুযোগ তৈরি করে। ডোকলাম (২০১৭) সংঘাতের পর ভারত কোনো অবস্থাতেই তাদের এই দুর্বলতম স্থানে চীনের ছায়াও দেখতে রাজি নয়।
-
কৌশলগত উপস্থিতি: তিস্তা প্রকল্পে সম্পৃক্ততার মাধ্যমে চীন একদিকে যেমন বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাব বাড়াতে চায়, অন্যদিকে ভারতের সংবেদনশীল সীমান্ত ঘেঁষে নিজেদের এক ধরনের পরোক্ষ পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
-
পানির রাজনীতিতে আধিপত্য: ব্রহ্মপুত্র থেকে শুরু করে দক্ষিণ এশিয়ার উজানের বহু নদী তিব্বতে চীনের নিয়ন্ত্রণে। তিস্তার ভাটির উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেদের যুক্ত করে চীন দক্ষিণ এশিয়ার সমন্বিত নদী অববাহিকা ও হাইড্রোলজিক্যাল তথ্যের ওপর নিজেদের অংশীদারিত্ব পাকাপোক্ত করার লক্ষ্য রাখে।
-
চীনা প্রভাব প্রতিহত করা (Containment of China): ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ার স্পর্শকাতর কোনো অবকাঠামোতেই বেইজিং যেন একচ্ছত্র কর্তৃত্ব না পায়। তিস্তায় সিনোহাইড্রোর প্রবেশ রদ করতেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কারিগরি সহায়তার পাল্টা প্রস্তাব এবং দফায় দফায় উচ্চপর্যায়ের সফর পরিচালিত হচ্ছে।
-
সামরিক ও কারিগরি নজরদারি: মার্কিন প্রতিনিধিদলে বেসামরিক কূটনীতিকদের পাশাপাশি মার্কিন সেনাবাহিনীর পানি-সম্পদ প্রকৌশলী (U.S. Army Corps of Engineers-এর মতো সামরিক ব্যাকগ্রাউন্ডের বিশেষজ্ঞ) যুক্ত থাকার বিষয়টি নির্দেশ করে যে, ওয়াশিংটন তিস্তা অববাহিকার ভূসংস্থান, বন্যা নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং সীমান্তবর্তী নদীর হাইড্রোলজিক্যাল ডেটাকে কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করছে।
-
ভারতকে আশ্বস্ত ও নজরদারির ভারসাম্য: দিল্লি ওয়াশিংটনের ‘কোয়াড’ (QUAD) অংশীদার। তিস্তা এলাকায় চীনের প্রবেশ ঠেকাতে ওয়াশিংটন ভারতের উদ্বেগের পক্ষে দাঁড়ালেও, একই সঙ্গে এই স্পর্শকাতর ভৌগোলিক ডেটায় আমেরিকা নিজের সরাসরি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চাইছে, যাতে দিল্লির ওপর একচেটিয়া নির্ভরশীল না হয়ে ওয়াশিংটন নিজেই মাঠের বাস্তব তথ্য পেতে পারে।
| শক্তি | প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য | প্রধান উদ্বেগ/প্রতিবন্ধকতা | তিস্তায় তাদের হাতিয়ার |
| ভারত | শিলিগুড়ি করিডোরকে বহিঃশক্তির নজরদারি মুক্ত রাখা এবং তিস্তার ওপর একক প্রভাব বজায় রাখা। | অভ্যন্তরীণ রাজনীতির (পশ্চিমবঙ্গ) কারণে পানিবণ্টন চুক্তি করতে না পারা এবং বাংলাদেশের চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি। | ভৌগোলিক অবস্থান, উজানের পানির নিয়ন্ত্রণ এবং ভূকৌশলগত প্রভাব। |
| চীন | দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের অর্থনৈতিক ও প্রকৌশল পদচিহ্ন বাড়ানো এবং ভারতের সীমান্তে কৌশলগত লিভারেজ তৈরি করা। | ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বাধা এবং প্রকল্পের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা। | বড় অঙ্কের ঋণ/বিনিয়োগ প্রস্তাব, সিনোহাইড্রোর সমীক্ষা ও অবকাঠামো সক্ষমতা। |
| যুক্তরাষ্ট্র | বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন ভূখণ্ডে বেইজিংয়ের কর্তৃত্ব খর্ব করা এবং স্পর্শকাতর অঞ্চলের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ। | সরাসরি উন্নয়ন অর্থায়নের চেয়ে কারিগরি ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার সীমা। | কূটনৈতিক তৎপরতা, সামরিক প্রকৌশল দক্ষতা ও বিকল্প কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব। |
-
ভারত দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ে পানিবণ্টন চুক্তি সম্পন্ন করতে পারেনি।
-
এর বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ যখন চীনের সহায়তায় তিস্তা রিভার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট এগিয়ে নিতে চেয়েছে, তখন ভারত গভীর নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
-
এই টানাপোড়েনের মাঝে বাংলাদেশ যখন পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘নিজস্ব অর্থায়নে’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা ঘোষণা করল, তখনই প্রবেশ ঘটল যুক্তরাষ্ট্রের। নিজস্ব অর্থায়নে হলেও কারিগরি নকশা, ড্রেজিং সরঞ্জাম ও পরামর্শক হিসেবে কারা থাকবে—তা নিয়ে এখন তিনটি শক্তিরই প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

