পরাশক্তির দাবার ছকে দুর্বল রাষ্ট্র: জনবিচ্ছিন্ন নেতৃত্বের পরিণতি এবং আমাদের কূটনীতি

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অমোঘ এবং নির্মম নিয়ম হলো—যে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার তার দেশের মানুষের পালস বা নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারেন না, তিনি কেবল নিজের পতনই ডেকে আনেন না; তিনি গোটা রাষ্ট্রকে এক ভয়াবহ ভূ-রাজনৈতিক খাদের কিনারায় ঠেলে দেন। রাজনীতি কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার অন্ধ সমীকরণ নয়; এটি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, মনস্তত্ত্ব এবং সমসাময়িক বাস্তবতার এক জটিল রসায়ন। যখন কোনো শাসক এই রসায়ন বুঝতে ব্যর্থ হন, তখন অভ্যন্তরীণভাবে রাষ্ট্র যেমন ভেঙে পড়ে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও দেশটি পরিণত হয় বিদেশি পরাশক্তির খেলার পুতুলে।
ইতিহাসের আয়নায় ১৯৭১ এবং রাজনৈতিক অন্ধত্ব:
নেতৃত্বের জনবিচ্ছিন্নতা এবং রাজনৈতিক অন্ধত্বের সবচেয়ে বড় ও মর্মান্তিক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তটি আমাদের এই ভূখণ্ডেরই। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি যখন নিজেদের অধিকারের পক্ষে চূড়ান্ত রায় প্রদান করল, তখন পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল।
ইয়াহিয়া খান এবং পাকিস্তানি জান্তারা ভেবেছিল, অস্ত্রের অহংকারে একটি জাগ্রত জাতির স্বাধিকার স্পৃহাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া যাবে। তারা পূর্ব বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও ক্ষোভকে বিন্দুমাত্র বুঝতে পারেনি। এই চরম রাজনৈতিক অজ্ঞতা, দাম্ভিকতা এবং জনগণের শক্তির প্রতি অবজ্ঞার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। ইতিহাস দ্ব্যর্থহীনভাবে সাক্ষ্য দেয়—জনগণের সাথে আত্মিক সংযোগহীন কোনো শক্তি কখনোই শেষ হাসি হাসতে পারে না।
সমকালীন ভূ-রাজনীতি এবং দুর্বল সরকারের পরিণতি:
১৯৭১ সালের সেই ঐতিহাসিক শিক্ষা আজকের দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। বর্তমান বিশ্বে, বিশেষ করে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ চলছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আমাদের বঙ্গোপসাগর।
যুক্তরাষ্ট্র চাইছে তাদের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলের মাধ্যমে এ অঞ্চলে কৌশলগত ও সামরিক আধিপত্য বিস্তার করতে; অন্যদিকে চীন অগ্রসর হচ্ছে তাদের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) এবং বিশাল অর্থনৈতিক বিনিয়োগের জাল বিছিয়ে। এই দুই হাতির লড়াইয়ে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল এবং জনবিচ্ছিন্ন একটি সরকার অত্যন্ত অরক্ষিত।
যখন কোনো সরকার জনগণের ম্যান্ডেট হারিয়ে কেবল ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াই করে, তখন দেশীয় বৈধতার অভাব ঘোচাতে তারা বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টায় তারা জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি বিভিন্ন অসম চুক্তিতে সই করতে বাধ্য হয়। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ শ্রীলঙ্কার রাজাপাকসে সরকার। জনগণের প্রকৃত অবস্থা না বুঝে খামখেয়ালি নীতি গ্রহণ এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে চীনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেওয়ার পরিণতিতে দেশটিকে তাদের কৌশলগত হাম্বানটোটা বন্দর ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দিতে হয়েছে। জনবিচ্ছিন্ন নেতৃত্ব এভাবেই রাষ্ট্রকে ঋণের ফাঁদ বা ‘Debt Trap’-এ ফেলে দেয়।
বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং বর্তমানের পথরেখা:
এই ভূ-রাজনৈতিক রশি টানাটানির মধ্যে বাংলাদেশের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশের করণীয় কী? এর উত্তর লুকিয়ে আছে স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনালগ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত ঐতিহাসিক পররাষ্ট্রনীতির মধ্যে— “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়।”
সত্তরের দশকে স্নায়ুযুদ্ধের চরম উত্তেজনার মধ্যে সদ্য স্বাধীন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে বঙ্গবন্ধু কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে (যুক্তরাষ্ট্র বা সোভিয়েত ইউনিয়ন) আটকে রাখেননি। তিনি অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’ (NAM)-এ বাংলাদেশকে যুক্ত করেন। এটি কোনো দুর্বল বা নিষ্ক্রিয় নীতি ছিল না; এটি ছিল জাতীয় স্বার্থ আদায়ে এক চরম সাহসিকতাপূর্ণ ‘সক্রিয় নিরপেক্ষতা’ (Active Neutrality)।
আজকের দিনেও এই নীতির প্রয়োগ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পরাশক্তির চাপ সামলাতে আমাদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বা Balancing Foreign Policy প্রয়োজন। চীনের কাছ থেকে দেশের জন্য লাভজনক অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা আমাদের নিতে হবে, কিন্তু কোনো সামরিক বা কৌশলগত ফাঁদে পা দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রপ্তানি বাণিজ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে, কিন্তু দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হয় বা বঙ্গোপসাগরের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে চলে যায়—এমন কোনো চুক্তিতে জড়ানো যাবে না।
কূটনীতি কেবল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষের টেবিলের আলোচনা নয়; একটি রাষ্ট্রের দরকষাকষির সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী হাতিয়ার হলো তার সরকারের প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন। সত্তরের দশকে বঙ্গবন্ধু পরাশক্তির চোখরাঙানি উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন, কারণ তার পেছনে ছিল সমগ্র জাতির ঐক্যবদ্ধ শক্তি।
আজকের দিনেও কোনো দেশের সরকার প্রধান যদি রাজনৈতিক বাস্তবতা না বোঝেন এবং অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল হন, তবে তাঁর শাসনামলে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব’ নীতিটি শেষ পর্যন্ত ‘সবার কাছে নতিস্বীকার’ করার নীতিতে পরিণত হতে বাধ্য। কারণ, যে সরকার তার নিজের জনগণের শক্তির ওপর দাঁড়াতে পারে না, তারা আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে কখনোই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। পরাশক্তি সবসময় দুর্বল শাসকের সুযোগ নেয়। তাই পরিশেষে এথাই ধ্রুব সত্য—একটি দেশের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব ও ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা কোনো বিদেশি শক্তির দয়ায় নিশ্চিত হয় না; তা নিশ্চিত হয় দেশের আপামর জনসাধারণের নিঃশর্ত সমর্থন ও গণতান্ত্রিক আস্থার মাধ্যমে।

