১৯৭১–২০২৬: আদর্শের মুখোশ, ক্ষমতার বাস্তবতা
আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী—বাংলাদেশের তিন রাজনৈতিক ধারার ৫৫ বছরের পরীক্ষাবিশেষ
অনুসন্ধান | আলাপচারিতা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি অস্বস্তিকর সত্য আছে: এখানে প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলই গণতন্ত্রের কথা বলে—কিন্তু ক্ষমতায় গেলে গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটি প্রায়ই বদলে যায়।
বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় যে দল নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা চায়, ক্ষমতায় গিয়ে সে-ই কমিশনকে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের মুখে পড়ে। যে দল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে কথা বলে, ক্ষমতায় গিয়ে তার নেতৃত্বেই প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবের অভিযোগে পড়ে। যে দল রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি করে, তার রাজনৈতিক জোটের ইতিহাসে আবার এমন শক্তির উপস্থিতি দেখা যায়, যাদের অতীত ভূমিকা নিয়েই রাষ্ট্রের মৌলিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
১৯৭১ থেকে ২০২৬—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তাই শুধু আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পালাবদলের ইতিহাস নয়। এটি আদর্শ বনাম ক্ষমতা, প্রতিশ্রুতি বনাম প্রতিষ্ঠান এবং গণতন্ত্রের ভাষা বনাম গণতন্ত্রের চর্চার ইতিহাস।
এই পাঁচ দশকে তিন দলের রাজনৈতিক অবস্থানও বদলেছে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব থেকে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতাসীন দলে পরিণত হয়েছে; বিএনপি সামরিক-উত্তর রাজনৈতিক উত্থান থেকে বহুবার সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকায় গেছে; আর ১৯৭১-এর বিতর্কিত উত্তরাধিকার বহনকারী জামায়াতে ইসলামী ২০২৫ সালে নিবন্ধন ফিরে পেয়ে ২০২৬ সালে সংসদের প্রধান বিরোধী শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পায়, আর জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট ৬৮টি আসন পায় বলে Reuters জানিয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি।
প্রশ্ন হলো: এই তিন দলের ঘোষিত আদর্শ এবং তাদের বাস্তব রাজনৈতিক আচরণের মধ্যে দূরত্ব কতটা
১৯৭১: রাষ্ট্রের জন্ম, রাজনীতির প্রথম বিভাজন বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার সূচনা হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে—ভাষা, জাতীয় পরিচয়, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৭২ সালের সংবিধান জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করে।
আওয়ামী লীগের জন্য ১৯৭১ তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; দলটির রাজনৈতিক বৈধতার অন্যতম প্রধান উৎস।
দলটির নিজস্ব নির্বাচনী ঘোষণাপত্রে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বৈষম্যহীন সমাজকে তার মূল নীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস এখানেই সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৯৭১ সালে দলটির তৎকালীন নেতৃত্ব বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। পরবর্তী দশকগুলোতে এই ভূমিকা এবং জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
বিএনপি তখনও অস্তিত্বে আসেনি। ১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে তার উত্থান।
এভাবেই স্বাধীনতার প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিন ভিন্ন ঐতিহাসিক ধারা তৈরি হয়:
মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বের উত্তরাধিকার, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামী রাজনৈতিক দর্শন।
পরবর্তী ৫৫ বছরের রাজনীতি মূলত এই তিন ধারার প্রতিযোগিতা, সংঘাত ও কখনও সমঝোতার গল্প।
আওয়ামী লীগ: গণতন্ত্রের দাবিদার থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্র
আওয়ামী লীগের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শক্তি—মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নও ক্ষমতায় থাকার সময়েই তৈরি হয়েছে।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র পুনর্গঠন করে; অন্যদিকে ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় ব্যবস্থা বদলে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা এবং একদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে।অর্থাৎ স্বাধীনতার পরপরই গণতন্ত্রের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বাস্তবতার মধ্যে সংঘাত দেখা দেয়।
এরপর সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের দীর্ঘ সময় পার হয়ে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে আবার ক্ষমতায় আসে।
২০০৮ সালের নির্বাচনী ঘোষণায় দলটি যে Vision 2021 সামনে আনে, সেখানে স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিকীকরণ, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নিয়মিত বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি ছিল।
কিন্তু ২০০৯–২০২৪-এর দীর্ঘ শাসনপর্বে দলটির গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতার দূরত্ব ক্রমশ বড় হয়েছে—এমন অভিযোগ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচন প্রধান বিরোধী দল বিএনপির বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়েও বিরোধী দল ও পর্যবেক্ষকদের নানা অভিযোগ ছিল।
এরপর আসে ২০২৪।
জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলন দ্রুত বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদনে নিরাপত্তা বাহিনীর অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, নির্বিচার গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা বলা হয়। একই প্রতিবেদনে আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও পুলিশ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়।
আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে।
২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, এই নিষেধাজ্ঞা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে দেওয়া হয় এবং দল ও নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে তা যুক্ত করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্তটিকে অবৈধ বলে প্রত্যাখ্যান করে।এখানে ইতিহাসের একটি গভীর ব্যঙ্গ দেখা যায়।
যে দল গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার দাবি করে, সেই দলই ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
তবে এখানেই বিশ্লেষণ থামানো যায় না। কারণ রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নিজেই গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় প্রশ্ন তৈরি করে: কোনো দলের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকলে দলীয় নিষেধাজ্ঞার সীমা কোথায়, এবং সেই নিষেধাজ্ঞা কীভাবে রাজনৈতিক অধিকার ও বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে?
এটি শুধু আওয়ামী লীগের প্রশ্ন নয়। এটি ভবিষ্যতের বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রশ্ন।
বিএনপি: বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি এবং ক্ষমতার পরীক্ষা
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্র বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।
দলটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে ভূখণ্ডভিত্তিক বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়কে সামনে আনে। জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত দলটি ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কেন্দ্রের একটি বড় শক্তিতে পরিণত হয়।
১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসে এবং সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ঐতিহাসিক নথিতে ১৯৯১ সালের নির্বাচনকে সে সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে এবং একই সময়ে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা নথিভুক্ত হয়েছে।
কিন্তু বিএনপির ইতিহাসও সরল নয়।
১৯৯১–৯৬ সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়। সংসদ বর্জন, হরতাল ও রাজনৈতিক আন্দোলন তখনকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসে—এবার জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে।
এখানেই আদর্শ ও রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাত দেখা যায়।
বিএনপি বহুদলীয় জাতীয়তাবাদী দল; জামায়াত ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার দল। কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের মধ্যে জোট সম্ভব হয়েছিল।
রাজনীতির বাস্তবতা আদর্শকে এখানে ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি বর্তমানে এই ইতিহাসের একটি নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে। দলটি প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিত করা, ক্ষমতার ভারসাম্য, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো সংস্কারের কথা বলেছে।
এখন সমস্যা হলো—এই সংস্কারগুলো বিরোধী দলে থাকা অবস্থার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, নাকি ক্ষমতায় থাকা অবস্থার রাষ্ট্রনীতি?
২০২৬ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি আবার রাষ্ট্রক্ষমতায়।
তাই বিএনপির সামনে এখন আর “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার” শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়। এটি প্রশাসনিক পরীক্ষা।
নির্বাচন কমিশন কতটা স্বাধীন হবে?
প্রশাসনে দলীয় প্রভাব কতটা কমবে?
বিরোধী দলের সভা-মিছিল কতটা নিরাপদ থাকবে?
বিচারব্যবস্থা কতটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকবে?
সংবাদমাধ্যম সরকারকে কতটা কঠোরভাবে প্রশ্ন করতে পারবে?
এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বিএনপির ঘোষিত গণতান্ত্রিক সংস্কার বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়।
জামায়াত: নিষিদ্ধের রাজনীতি থেকে সংসদের প্রধান বিরোধী শক্তি
জামায়াতে ইসলামীর ক্ষেত্রে ইতিহাস সবচেয়ে জটিল।
দলটির নিজস্ব গঠনতন্ত্রে কোরআন ও সুন্নাহকে জীবন ও রাজনীতির মৌলিক নির্দেশনার উৎস হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলটি গণতান্ত্রিক কৌশলে ন্যায় ও সাম্যের ভিত্তিতে একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলে।
অর্থাৎ জামায়াত নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে না। বরং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণের সমর্থন অর্জন করে ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণ করতে চায়।
কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের সঙ্গে এর সংঘাত ১৯৭১-এ।
২০১৩ সালে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল। ২০২৫ সালের জুনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিদ্ধান্তের পর নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন ও প্রতীক পুনর্বহাল করে।
তারপর মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যায়।
২০২৬ সালের নির্বাচনে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোট ৬৮টি আসন পায়। দলটির নেতা শফিকুর রহমান পরাজয় স্বীকার করে “positive politics”-এর কথা বলেন—Reuters-এর প্রতিবেদনে এ বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে।
এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় রূপান্তর।
যে দল একসময় রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছিল, সেই দলই স্বাধীন বাংলাদেশের নির্বাচিত সংসদে প্রধান বিরোধী শক্তি।
কিন্তু এখানেও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে যায়:
ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা এবং বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সাংবিধানিক নাগরিকত্ব—এই দুটির মধ্যে বাস্তব ভারসাম্য কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে?
বিশেষ করে নারী অধিকার, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ধর্মীয় নীতির ভূমিকা—এসব প্রশ্ন এখন আর তাত্ত্বিক নয়।
২০২৬-এর সংসদে জামায়াতের ভূমিকা এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর তৈরি করবে।
তিন দলের একটি অস্বস্তিকর মিল
আদর্শগতভাবে তিন দলকে আলাদা করে দেখা সহজ।
আওয়ামী লীগ—বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধ।
বিএনপি—বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও বহুদলীয় গণতন্ত্র।
জামায়াত—ইসলামী মূল্যবোধ ও ন্যায়ভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র।
কিন্তু রাজনৈতিক আচরণের ইতিহাসে তাদের মধ্যে একটি অদ্ভুত মিল আছে:
তিন দলই ক্ষমতাকে কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে নয়, রাজনৈতিক আধিপত্যের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগের মুখে পড়েছে।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনে বিরোধী রাজনীতি ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিএনপির শাসনেও বিরোধী রাজনীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং জোট-নির্ভর ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জামায়াতের ক্ষেত্রেও দলীয় আদর্শের সঙ্গে রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী কাঠামোর সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অর্থাৎ সমস্যাটি হয়তো শুধু কে ক্ষমতায়—সেটি নয়।
সমস্যাটি হলো ক্ষমতার সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক কী?
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুর্বলতা: প্রতিষ্ঠান নয়, দল শক্তিশালী
১৯৭১ থেকে ২০২৬-এর ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে—দল পরিবর্তিত হয়েছে, সরকার পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো একইভাবে শক্তিশালী হয়নি।
বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন নিয়ে বিতর্ক হয়।
বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
প্রশাসনের দলীয়করণ নিয়ে অভিযোগ ওঠে।
পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
সংসদ কার্যকর কি না—সেটিও বিতর্কিত হয়।
আর ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণ পরিবর্তিত হচ্ছে কি না—এই প্রশ্নও থেকে যায়।
এখানেই ২০২৪-এর পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
কারণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ ছিল—রাষ্ট্রকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা—সেটি যদি নতুন সরকারও একইভাবে বহন করে, তাহলে শুধু দলের নাম বদলাবে; রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাবে না।
২০২৬: ক্ষমতার পালাবদল, নাকি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পালাবদল?
২০২৬ সালের নির্বাচন একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
আওয়ামী লীগ বাইরে।
বিএনপি ক্ষমতায়।
জামায়াত সংসদের প্রধান বিরোধী শক্তি।
কিন্তু এই সমীকরণকে গণতন্ত্রের চূড়ান্ত বিজয় বা পরাজয়—কোনোটিই ধরে নেওয়া যায় না।
কারণ একটি নির্বাচন গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয় শর্ত হতে পারে; কিন্তু যথেষ্ট শর্ত নয়।
গণতন্ত্র টিকে থাকে যখন:
পরাজিত দলও রাজনৈতিক অস্তিত্বের অধিকার রাখে।
বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করতে পারে।
আদালত সরকারের বিরুদ্ধেও রায় দিতে পারে।
সংবাদমাধ্যম ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে।
প্রশাসন দল নয়, রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে।
নির্বাচন কমিশন সরকার পরিবর্তনের যন্ত্র নয়, জনগণের ভোটের নিরপেক্ষ রক্ষক হয়।
এই পরীক্ষায় ২০২৬-এর সরকারকে সময়ই মূল্যায়ন করবে।
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন: কে নিজের জন্য যে গণতন্ত্র চায়, অন্যের জন্যও তা দেবে?
এখানেই ৫৫ বছরের বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সবচেয়ে নির্মম শিক্ষা দেয়।
আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল, তারা নির্বাচন ও গণতন্ত্রের দাবি করেছে। ক্ষমতায় গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে একই গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করার অভিযোগ উঠেছে।
বিএনপি বিরোধী দলে থাকাকালে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ও রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি করেছে। এখন তাদের সামনে সেই দাবিগুলো নিজেদের শাসনব্যবস্থায় প্রয়োগের পরীক্ষা।
জামায়াত দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও নিবন্ধন হারানোর অভিজ্ঞতা পেয়েছে। এখন সংসদীয় শক্তি হিসেবে তাদের সামনে প্রশ্ন—তারা কি নিজেদের রাজনৈতিক অধিকারের একই নীতি সব মতের মানুষের জন্য সমানভাবে প্রয়োগের পক্ষে থাকবে?
এটাই গণতন্ত্রের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
বাংলাদেশের রাজনীতির পরবর্তী অধ্যায় দল নিয়ে নয়, নিয়ম নিয়ে
১৯৭১–২০২৬-এর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে যদি এক বাক্যে সংক্ষেপ করতে হয়, তাহলে বলা যায়:
এটি ক্ষমতা বদলের ইতিহাস যতটা, তার চেয়ে বেশি ক্ষমতার চরিত্র বদলাতে না পারার ইতিহাস।
আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার বহন করেছে—কিন্তু দীর্ঘ ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্র ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কথা বলেছে—কিন্তু ক্ষমতার সময় তার রাজনৈতিক আচরণও বিতর্কমুক্ত ছিল না।
জামায়াত ইসলামী ন্যায় ও কল্যাণরাষ্ট্রের কথা বলে—কিন্তু ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক অবস্থান এবং ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নকে জটিল করে রেখেছে।
তাই ২০২৬-এর বাংলাদেশের সামনে আসল প্রশ্ন কে ক্ষমতায়—এটি নয়।
প্রশ্ন হলো—
ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, রাষ্ট্র কি তার চেয়ে বড় হবে?
যদি রাষ্ট্র দলীয় স্বার্থের ওপরে উঠতে পারে, তাহলে ১৯৭১-এর গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পেতে পারে।
যদি না পারে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস আবারও একই বৃত্তে ফিরবে:
এক দল যাবে, আরেক দল আসবে; পতাকা বদলাবে, স্লোগান বদলাবে—কিন্তু ক্ষমতার সংস্কৃতি বদলাবে না।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ তাই আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জামায়াত—কোনো একটি দলের হাতে এককভাবে নির্ধারিত হবে না।
এটি নির্ধারিত হবে একটি কঠিন নিয়মে:
“ক্ষমতায় থাকলে যে অধিকার নিজের জন্য দাবি করি, ক্ষমতার বাইরে গেলে সেই অধিকার অন্যের জন্যও কি স্বীকার করি?”
এই প্রশ্নের উত্তরই শেষ পর্যন্ত বলে দেবে—২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও ২০২৬-এর নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু আরেকটি ক্ষমতার পালাবদল ছিল, নাকি সত্যিই একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা।সম্পাদকীয় নোট: এই সংস্করণে ২০২৬-এর নির্বাচন, আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা, জামায়াতের নিবন্ধন পুনর্বহাল এবং ২০২৪-এর মানবাধিকার পরিস্থিতির মতো সময়সংবেদনশীল তথ্য যাচাই করে ব্যবহার করেছি। ২০২৬ সালের নির্বাচন সম্পর্কে Reuters-এর প্রতিবেদনে বিএনপির বড় জয়, আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বাইরে থাকা এবং জামায়াত-জোটের ৬৮ আসনের কথা রয়েছে। ২০২৪ সালের আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া বিষয়ে OHCHR-এর প্রাথমিক বিশ্লেষণটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে একই সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এবং আন্দোলন-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সমর্থক, পুলিশ ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার উদ্বেগ—দুই দিকই নথিভুক্ত হয়েছে।

