কৌশলগত শঙ্কা (Security Dilemma) এবং রাশিয়া-ইউক্রেন তত্ত্ব: দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের (International Relations) রূঢ় বাস্তবতা হলো, এখানে নৈতিকতার চেয়ে রাষ্ট্রীয় টিকে থাকা (State Survival) এবং ভৌগোলিক নিরাপত্তাই শেষ কথা বলে। ‘মক্কা প্যাক্ট’ বা এ জাতীয় কোনো সামরিক জোটে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের তত্ত্বকে যদি রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের লেন্স দিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়, তবে ভূ-রাজনীতির কয়েকটি ধ্রুব সত্য অত্যন্ত প্রকট হয়ে ওঠে।
১. ‘সিকিউরিটি ডাইলেমা’ বা নিরাপত্তা শঙ্কার মূল কথা
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ‘সিকিউরিটি ডাইলেমা’ তখন তৈরি হয়, যখন একটি রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য এমন সব পদক্ষেপ নেয় (যেমন- সামরিক জোটে যোগদান বা অস্ত্র বৃদ্ধি), যা তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মনে চরম নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়। প্রতিবেশী রাষ্ট্র তখন আত্মরক্ষার্থে পাল্টা আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
ইউক্রেন যখন নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ন্যাটোতে (NATO) যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল, রাশিয়া সেটাকে তাদের ‘অস্তিত্বের প্রতি সরাসরি হুমকি’ হিসেবে দেখেছিল। ঠিক একইভাবে, বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান, তুরস্ক বা সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রগুলোর সাথে কোনো যৌথ সামরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যায়, ভারত সেটাকে কেবল একটি স্বাধীন দেশের সাধারণ কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখবে না; বরং এটিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি ‘রেড লাইন’ অতিক্রম হিসেবেই বিবেচনা করবে।
২. কৌশলগত গভীরতা (Strategic Depth) এবং ‘বাফার স্টেট’ বাফার
ভূ-রাজনীতিতে কোনো পরাশক্তি বা আঞ্চলিক শক্তি তাদের মূল ভূখণ্ডের চারপাশে একটি প্রভাব বলয় বা ‘বাফার জোন’ বজায় রাখতে চায়।
* রাশিয়ার ক্ষেত্রে: ইউক্রেন ছিল রাশিয়ার জন্য ন্যাটো এবং মস্কোর মাঝখানের একটি বিশাল ‘বাফার’। ইউক্রেন ন্যাটোতে গেলে মস্কো থেকে ন্যাটোর দূরত্ব কমে মাত্র কয়েকশো কিলোমিটারে দাঁড়াত, যা রাশিয়ার ‘স্ট্র্যাটেজিক ডেপথ’ বা কৌশলগত গভীরতা একেবারে শূন্য করে দিত।
* ভারতের ক্ষেত্রে: ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ভারতকে তিন দিক থেকে ঘিরে রেখেছে। ভারতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ভূ-খণ্ড ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ (চিকেনস নেক)-এর পাশেই বাংলাদেশের অবস্থান। বাংলাদেশে যদি কোনো ভারত-বৈরী সামরিক জোটের উপস্থিতি ঘটে, তবে ভারতের পূর্ব সীমান্ত সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়বে। ভারত তার ‘বাফার’ হারাবে এবং তাদের কৌশলগত গভীরতায় চরম আঘাত লাগবে।
৩. ‘ডকট্রিন অফ প্রি-এমপটিভ স্ট্রাইক’ বা প্রতিরোধমূলক আক্রমণ
যখন কোনো রাষ্ট্র বুঝতে পারে যে তার সীমান্তে ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক হুমকি তৈরি হচ্ছে, তখন তারা হুমকিটি পুরোপুরি শক্তিশালী হওয়ার আগেই আঘাত হানার নীতি গ্রহণ করে।
রাশিয়া ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই আক্রমণ করেছিল, কারণ তারা জানত একবার ন্যাটোর আর্টিকেল ফাইভ কার্যকর হয়ে গেলে ইউক্রেনে হামলা মানে পুরো ইউরোপ ও আমেরিকার সাথে যুদ্ধে জড়ানো।
একইভাবে, ভারতের সামরিক থিংক ট্যাংকগুলোর বিশ্লেষণ হলো— বাংলাদেশ যদি এমন কোনো চুক্তিতে (যেমনটা মক্কা প্যাক্টের তত্ত্বে বলা হচ্ছে) সই করে যেখানে “একজনের ওপর আক্রমণ সবার ওপর আক্রমণ” হিসেবে বিবেচিত হবে, তবে ভারত সেই চুক্তি চূড়ান্ত বা কার্যকর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবে না। চুক্তি বাস্তবায়নের আগেই ভারত ‘প্রি-এমপটিভ’ সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করতে চাইবে, যাতে ওই জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ঠেকানো যায়।
৪. টু-ফ্রন্ট থেকে থ্রি-ফ্রন্ট ওয়ার থ্রেট
ভারতের সামরিক কৌশল মূলত পাকিস্তান (পশ্চিম ফ্রন্ট) এবং চীন (উত্তর-পূর্ব ফ্রন্ট)—এই ‘টু-ফ্রন্ট’ বা দ্বিমুখী যুদ্ধের সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। পূর্ব ফ্রন্ট, অর্থাৎ বাংলাদেশ সীমান্ত, ভারতের জন্য ঐতিহাসিকভাবেই সবচেয়ে নিরাপদ এবং শান্ত। কিন্তু বাংলাদেশ যদি পাকিস্তান বা তুরস্কের মতো সামরিক জোটের অংশ হয়, তবে ভারতকে রাতারাতি ‘থ্রি-ফ্রন্ট’ বা ত্রিমুখী যুদ্ধের প্রস্তুতির সম্মুখীন হতে হবে। কোনো সামরিক পরাশক্তিই নিজেদের ঘরের পেছনের দরজায় (Backyard) এমন কোনো ফ্রন্ট খুলতে দেবে না, যা তাদের মূল ফোকাস (চীন ও পাকিস্তান) থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়।
৫. আঞ্চলিক মনরো ডকট্রিন (Regional Monroe Doctrine)
উনিশ শতকে আমেরিকা যেমন ‘মনরো ডকট্রিন’ দিয়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলোকে তাদের অঞ্চলে নাক গলাতে নিষেধ করেছিল, ভারতও দক্ষিণ এশিয়ায় অনেকটা অঘোষিতভাবে সেই নীতি মেনে চলে। ভারত চায় না দক্ষিণ এশিয়ায় চীন, পাকিস্তান বা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সামরিক জোটের আধিপত্য তৈরি হোক। বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ যদি এই বলয়ের বাইরে গিয়ে বৈরী জোটে যুক্ত হয়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আঞ্চলিক আধিপত্যের (Regional Hegemony) কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেবে।
রাশিয়া-ইউক্রেন তত্ত্বটি দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে, ভৌগোলিক নৈকট্য যেকোনো পরাশক্তির জন্যই সবচেয়ে বড় সংবেদনশীলতার জায়গা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘রিয়ালিজম’ বা বাস্তববাদী তত্ত্ব অনুযায়ী, ভারত তার জাতীয় নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা (বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে যোগাযোগ) নিশ্চিত করতে যেকোনো চরম পদক্ষেপ নিতে পারে। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি ভারতের জন্য কোনো আগ্রাসন নয়, বরং নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার একটি প্রতিরোধমূলক কৌশল হিসেবেই বিবেচিত হবে।

