বঙ্গোপসাগরে পরাশক্তির ছায়াযুদ্ধ: মার্কিন উচ্চপর্যায়ের সফরের নেপথ্যে পেকুয়া ঘাঁটি ও বন্দর সমীকরণ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক | ঢাকা
ইউএস প্যাসিফিক ফ্লিটের কমান্ডার অ্যাডমিরাল স্টিফেন কোহলারের নেতৃত্বে ২৪ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের মার্কিন সামরিক প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং ওয়াশিংটনের বিশেষ প্রতিনিধির ধারাবাহিক সফরের পর এই সামরিক সফর এবং এর পরপরই সম্ভাব্য বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিনিধি দলের আগমনকে কেবল সাধারণ দ্বিপাক্ষিক কূটনীতি হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ করে চীনের সহায়তায় নির্মিত পেকুয়া সাবমেরিন ঘাঁটি এবং বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লড়াই এখন প্রকাশ্যে রূপ নিচ্ছে।
পেকুয়া সাবমেরিন ঘাঁটি ও পশ্চিমা উদ্বেগ

কক্সবাজারের পেকুয়ায় প্রায় ১.২১ বিলিয়ন ডলার (১২ হাজার কোটি টাকার বেশি) ব্যয়ে নির্মিত ‘বানৌজা শেখ হাসিনা’ সাবমেরিন ঘাঁটিটির সূচনা থেকেই গভীর নজর রাখছে ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লি। ২০১৭ সালে চীন থেকে সংগৃহীত দুটি পুরোনো মিং-ক্লাস (টাইপ ০৩৫জি) ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হলেও, এই ঘাঁটির অবকাঠামো অত্যন্ত আধুনিক।
১৩৫ মিটার দীর্ঘ ড্রাই ডক, সুরক্ষিত বেসিন এবং অত্যাধুনিক কমান্ড, কন্ট্রোল, কমিউনিকেশনস, কম্পিউটার্স, ইন্টেলিজেন্স, সার্ভেইল্যান্স অ্যান্ড রিকনাইস্যান্স (C4ISR) ব্যবস্থা থাকায় সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা, পানির নিচে বসানো সেন্সর, হাইড্রোফোন এবং উন্নত রাডার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগর তো বটেই, আন্দামান সাগর পর্যন্ত নৌ-চলাচলের সংকেত নজরদারি করা সম্ভব। ওয়াশিংটন ও ভারতের মূল আশঙ্কা—চীনা প্রযুক্তিতে নির্মিত এই অবকাঠামোর মাধ্যমে বেইজিং বঙ্গোপসাগরের লাইভ ট্র্যাকিং তথ্য পেতে পারে এবং সংকটকালীন সময়ে এটি চীনা নৌবাহিনীর সাবমেরিনের ‘লজিস্টিক বা ডকিং হাব’ হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ওয়াশিংটনের পাল্টা চাল: নজরদারি ও বন্দর পর্যবেক্ষণ
মার্কিন প্যাসিফিক ফ্লিটের এ সফরের মূল ফোকাস বঙ্গোপসাগরে মুক্ত নৌ-চলাচল নিশ্চিত করা এবং চীনা প্রভাবের ভারসাম্য তৈরি করা। এরই অংশ হিসেবে মার্কিন প্রতিনিধি দল মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর ও মোংলা বন্দরের কারিগরি সক্ষমতা পর্যালোচনা করছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবিষ্যৎ কৌশলগত প্রয়োজনে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজসমূহের রিফুয়েলিং, জরুরি মেরামত এবং লজিস্টিক সহায়তার সক্ষমতা যাচাই করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। এছাড়া বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে সরবরাহকৃত ‘আরকিউ-২১ ব্ল্যাকজ্যাক’ নজরদারি ড্রোনের কার্যকর ব্যবহার এবং বঙ্গোপসাগরের আকাশসীমায় মার্কিন নজরদারি সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়গুলোও আলোচনায় স্থান পাচ্ছে।
জিএসওএমআইএ ও আকসা চুক্তির চাপ
দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন এগ্রিমেন্ট (GSOMIA) এবং অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং এগ্রিমেন্ট (ACSA) স্বাক্ষরের বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
* জিএসওএমআইএ স্বাক্ষরিত হলে সামরিক তথ্য ও উন্নত প্রযুক্তির আদান-প্রদান যেমন সহজ হবে, তেমনি তা তৃতীয় কোনো দেশের কাছে ফাঁস না হওয়ার আইনি নিশ্চয়তা তৈরি হবে।
* অন্যদিকে আকসা কার্যকর হলে দুই দেশের সামরিক বাহিনী পরস্পরের বন্দর, রানওয়ে, জ্বালানি এবং রসদ সরবরাহের সুবিধা আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় ব্যবহার করতে পারবে।
কূটনৈতিক ভারসাম্যের কঠিন পরীক্ষা
সামরিক প্রতিনিধি দলের সফরের পর বড় বড় মার্কিন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক টিমের সফরের কথা রয়েছে, যা ওয়াশিংটনের বহুমুখী সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দেয়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা ও চীনের এই মুখোমুখি অবস্থানের মাঝে বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ রক্ষা করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়া যেভাবে মার্কিন অংশীদারিত্বকে নিজেদের জাতীয় উন্নয়ন ও প্রযুক্তির বিকাশে সফলভাবে রূপান্তর করেছিল, তা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হলেও বহু দেশের ক্ষেত্রে তা ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরির নজিরও রয়েছে। বেইজিং ও ওয়াশিংটনের এই তীব্র প্রতিযোগিতায় নিজস্ব বন্দর ও ঘাঁটির সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলাদেশ কীভাবে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

